বিপাশা হায়াত। নন্দিত অভিনেত্রী, চিত্রশিল্পী ও নাট্যকার। এই গুণী শিল্পীর জন্মদিন আজ। এই শুভ দিনটির উদযাপন ও অন্যান্য প্রসঙ্গে কথা হয় তার সঙ্গে-

  • জন্মদিনে সমকাল পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে শুভেচ্ছা। এবার জানতে চাই, দিনটি কীভাবে কাটছে?

শুভেচ্ছা জানানোর জন্য সমকাল পরিবারের সবাইকে ধন্যবাদ। জন্মদিন নিয়ে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা নেই। করোনার কারণে পৃথিবীর অবস্থা আজ করুণ। প্রতি ঘরে ভীতিকর অবস্থা, অজানা আশঙ্কা- এই অবস্থায় জন্মদিন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছি না। এমন দুঃসময়ে সবাই ভালো থাকুক- এটাই প্রার্থনা। তবে '৭১ সালের ২৩ মার্চ আমার জন্ম। বাংলাদেশের জন্ম ২৬ মার্চ। বাংলাদেশ ও আমি একসঙ্গে বড় হই। এটি চমৎকার অনুভূতি।

  • জন্মদিনে শৈশবের দিনগুলো কেমন ছিল?

আর সবার মতোই মা-বাবা, বোন-বন্ধু সবাইকে নিয়ে দিনটি আনন্দে কাটত। প্রচুর বই জমা হতো সেই দিনগুলোতে। তবে শুধু জন্মদিন নয়; প্রতিদিনই মানুষের জন্য গুরত্বপূর্ণ ও মূল্যবান। জন্মদিনে মা-বাবাকে সম্মান জানাতে চাই। আমি মনে করি, দিনটি তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন। তাদের কারণেই এই পৃথিবীতে আমার অস্তিত্ব। আর যারা আমাকে শুভেচ্ছা জানান, তাদের জন্য আমার ভালোবাসা।

  • এই দিনে আপনার কাছে সেরা উপহার কোনটি?

এক কথায়, 'প্রিয় মানুষদের হাসিমুখ'।

  • জীবনকে আপনি কীভাবে দেখেন?

জীবনকে প্রতি মুহূর্তেই তো আমরা নতুনভাবে দেখি। প্রতি মূহূর্তই জীবনে নতুন উপলব্ধি দেয়। এখন জীবনকে একভাবে দেখছি, আবার মৃত্যুর পূর্বক্ষণে দাঁড়িয়ে জীবনকে অন্যভাবে দেখব। অনেক কিছু তখন অর্থহীন মনে হবে- আজকে যা অর্থপূর্ণ। জীবনের সংজ্ঞা প্রতিক্ষণে পাল্টায়। তবে যাদের পৃথিবীতে আমরা এনেছি, তাদের পৃথিবীর জন্য যোগ্য করে রেখে যাওয়া একজন মানুষের প্রধান দায়িত্ব বলে মনে করি। মৃত্যুর আগে আমার সবকিছু অর্থপূর্ণ মনে হবে যখন দেখব, সন্তানরা ভালোভাবে মানুষ হয়েছে। আর যতদিন বেঁচে আছি ততদিন কারও ক্ষতি ও বেদনার কারণ যেন না হই। বরং আমার কাজের ভেতর দিয়ে যেন সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি আমার যতটুকু করণীয়- সে দায়িত্ব পালন করে চলি। মানুষ হিসেবে এটাই চাওয়া। এসবই জীবনকে সুন্দর করে।

  • দর্শক-ভক্ত আপনার অভিনয় মিস করছেন। এ নিয়ে কী বলবেন?

দর্শকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তারা যেমন আমার অভিনয় ভালোবাসেন, আমার ভালোবাসার জায়গাও কিন্তু নাটক। এমন ভাবার কোনো কারণ নেই যে, আমি আর অভিনয় করব না। নিশ্চয়ই ভালো কাজ হলে অভিনয় করব।

  • স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন করছি আমরা। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন কতটুকু?

আমরা অনেকখানি পিছিয়েছি। আপনি অনেক দূর হেঁটে এলেন, তারপর একটা জায়গায় থামলেন। তাহলে পিছিয়ে গেলেন। নিজে পেছাচ্ছেন না কিন্তু সময় এগিয়ে যাচ্ছে, চারপাশের সবাই এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সংস্কৃতি চর্চা একটা পর্যায়ে আসার পরে চেতনাগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। শিল্পীদের ভেতরে সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টিও আর আগের মতো কাজ করে না। ফলে আমাদের বহুকালের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং ভাষা নানাভাবে আজ ধ্বংসের মুখে। অথচ মানুষের মনন ও চিন্তার বিকাশে যা দরকার, সেই খাদ্যই হচ্ছে সংস্কৃতি। একটি জাতির সার্বিক উন্নয়ন সংস্কৃতিবান মানুষ ছাড়া সম্ভব নয়। সংস্কৃতিচর্চা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। একটু খেয়াল করে দেখবেন, দেশে যেভাবে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, সেভাবে কি সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র গড়ে উঠছে? স্কুলগুলো কি শিশুদের মানস গঠনে শিল্পচর্চার গুরুত্ব দিচ্ছে? দিচ্ছে না। স্কুলে শিল্প-সংস্কৃতিচর্চা আবশ্যক করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। দর্শনকেও গুরুত্ব সহকারে শিক্ষা ক্ষেত্রে সংযুক্ত করা প্রয়োজন; যা ভীষণভাবে অবহেলিত। আমাদের মঞ্চের বড় অভাব। আগে মঞ্চ নাটকের অনেক দর্শক ছিল। এখন মঞ্চ নাটক একশ্রেণির মানুষই দেখছেন। সংখ্যায়ও তারা কম। অথচ মঞ্চ নাটক কিন্তু শিল্পবোদ্ধা ও শিল্পানুরাগী তৈরি করে। তারাই আবার শিল্পচর্চার প্রসারে হাত বাড়ায়। প্রায়ই মনে হয়, যারা শুদ্ধ শিল্পচর্চার সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত, তারা এখন মাইনরিটিতে পরিণত হচ্ছেন। তারা যদি সংখ্যালঘু হন, তাহলে জাতি হিসেবে আমাদের পরিণতি কী হতে পারে- সেটি অবশ্যই দ্রুত বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।

বিষয় : বিপাশা হায়াত অভিনেত্রী চিত্রশিল্পী ও নাট্যকার

মন্তব্য করুন