মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় অর্জনের ইতিহাস। পৃথিবীর হাতেগোনা কয়েকটি দেশ রয়েছে, যারা রক্তের বিনিময়ে মা-মাটি ও দেশ পেয়েছে। আমরা সেদিক থেকে ভাগ্যবান ও গর্বিত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় চেতনার মহান অংশ। আমাদের একাত্তর, আমাদের ভাষা আন্দোলন নিয়ে খুবই মর্মবেদনার গল্প রয়েছে। আছে সিনেমা নির্মাণের প্রচুর উপাদান, যা থেকে খণ্ড খণ্ড কিছু অংশ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এই প্রজন্মের তরুণ নির্মাতারাও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি বানানোর চেষ্টা করছেন। তবে সেটা অপ্রতুল। এ কথা সবাই স্বীকার করবেন, ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করাও কঠিন। তবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র কিন্তু কম নয়। মুক্তিযুদ্ধের আগের সংগ্রামী দিনগুলোকেও অনেক নির্মাতা সেলুলয়েডে বন্দি করেছেন। জহির রায়হান ১৯৭০ সালে নির্মাণ করেন 'জীবন থেকে নেয়া'। এ চলচ্চিত্রে আমাদের প্রকৃত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আর সংগ্রামকে সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি করেন এই সাহসী চলচ্চিত্রকার।

আমজাদ হোসেনের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত এ চলচ্চিত্র নির্মাণশৈলীতে কিছু দুর্বলতা সত্ত্বেও জীবন-ঘনিষ্ঠতায়, মহাকাব্যিক গভীরতায়, সর্বোপরি বিষয়ের মহত্ত্বে এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টিতে পরিণত হয়েছে। কী ছিল না সেই চলচ্চিত্রে। রাষ্ট্রীয় রাজনীতি, দমন-পীড়ন, পারিবারিক শাসন, বিনোদন- সবকিছুর সমন্বয়ে জহির রায়হান এ মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন আমাদের। 'জীবন থেকে নেয়া' হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের এক প্রামাণ্য দলিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে মুক্তি পায় চারটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। চাষী নজরুল ইসলামের 'ওরা ১১ জন' ছবিতে দেখানো হয় ১১ বন্ধুর মুক্তিযুদ্ধের গল্প, যা দেখে আজও কেঁপে ওঠে বাংলার দর্শক। একই বছর মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাস উঠে এসেছে সুভাষ দত্তের 'অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী', মমতাজ আলীর 'রক্তাক্ত বাংলা' ও আনন্দের 'বাঘা বাঙ্গালী' ছবিতে। ১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় আলমগীর কবিরের 'ধীরে বহে মেঘনা', আলমগীর কুমকুমের 'আমার জন্মভূমি', খান আতাউর রহমানের 'আবার তোরা মানুষ হ'। ১৯৭৪ সালে চাষী নজরুল ইসলামের 'সংগ্রাম', নারায়ণ ঘোষ মিতার 'আলোর মিছিল'। এ ছাড়া ১৯৭৬ সালে মুক্তি পায় হারুন অর রশীদের 'মেঘের অনেক রং'।

এ ছাড়া হুমায়ূন আহমেদের 'আগুনের পরশমণি', ফখরুল আলমের 'জয় বাংলা', তৌকীর আহমেদের 'জয়যাত্রা', হুমায়ূন আহমেদের 'শ্যামলছায়া', তারেক মাসুদের 'মাটির ময়না', খান আতাউর রহমানের 'এখনো অনেক রাত', চাষী নজরুল ইসলামের 'ধ্রুবতারা', 'মেঘের পর মেঘ', মোরশেদুল ইসলামের 'খেলাঘর', 'আমার বন্ধু রাশেদ', 'অনিল বাগচীর একদিন', তানভীর মোকাম্মেলের 'রাবেয়া', 'জীবন ঢুলী', নাসির উদ্দীন ইউসুফের 'গেরিলা', জাহিদুর রহিম অঞ্জনের 'মেঘমল্লার', ফাখরুল আরেফিনের 'ভুবন মাঝি', শাহ আলম কিরণের 'একাত্তরের মা জননী', সোহেল আরমানের 'এই তো প্রেম', মানিক মানবিকের 'শোভনের স্বাধীনতা'সহ আরও অনেক ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উঠে এসেছে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছি আমরা। অথচ যতই দিন যাচ্ছে স্বাধীনতার ছবি নির্মাণ কমে আসছে। কমার্শিয়াল নির্মাতারা তো এখন মুক্তিযুদ্ধের সিনেমার কথা ভাবতেই পারছেন না। অথচ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শুরুর সিনেমাগুলো কিন্তু সব কমার্শিয়াল নির্মাতার হাতেই নির্মিত। চেতনা আর ঐতিহাসিক ঘটনা বলার পাশাপাশি সেগুলো দারুণ ব্যবসাও করেছে। অল্প পরিশ্রমে সিনেমা বানানোর একটা কালচার লক্ষ্য করা যায় আজকাল। কিন্তু স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে সিনেমা নির্মাণ অল্প পরিশ্রমে সম্ভব নয়। এখন সত্য ঘটনা অবলম্বনে যদি একটি গল্প নির্মাণ করতে যান, তাহলে এটা নিয়ে যে পরিমাণ গবেষণা বা জানাশোনা কিংবা এর পেছনে সময় দিতে হবে, হয়তো বাণিজ্যিক নির্মাতারা সেই পরিশ্রম বা গবেষণার ইচ্ছা রাখেন না। তাই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সিনেমা নির্মাণে সবার এক ধরনের অনীহা তৈরি হচ্ছে এখন। কিন্তু ভালো গল্প থাকলেই যে সিনেমা নির্মাণ করা যায়, তা কিন্তু নয়। সিনেমায় অর্থশক্তি বলে একটা কথা আছে, এটা ছাড়া আপনি কিছু চিন্তা করতে পারবেন না।

এই অর্থশক্তির জোগান দেন প্রযোজকরা, সেখানে বাংলাদেশের পেক্ষাপটে স্বাধীনতা নিয়ে তাদের উৎসাহ তৈরি করা খুব কঠিন। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, একাত্তরের সেই সময়ের ঢাকা, সেই সময়র যে প্রেক্ষাপট, পথঘাট, এমনকি কস্টিউম থেকে শুরু করে সবই খুব কঠিন। কারণ, এর জন্য প্রয়োজন বিশাল ফান্ডের। বিরাট আয়োজন ছাড়া সেই সময়কে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তার মানে পিরিয়ডিক্যাল বা ওই সময়কার প্রেক্ষাপটে পৃথিবীতে কি সিনেমা হচ্ছে না? অবশ্যই হচ্ছে। প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার গল্পগুলো নিয়ে বিশাল আয়োজনে এখনও সিনেমা হচ্ছে। আমরা দেখছি তারা বিশাল এলাকায় সেট নির্মাণ করে ছবি করছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সিনেমা বানাতে হলে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।

লেখক: বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক