লোকায়ত সংস্কৃতিই হাজার বছরের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। লোকসংস্কৃতির স্পর্শে মানুষের মনের অন্ধকার দূর হয়। দূর হয় ক্ষুদ্র স্বার্থচিন্তা। লোকায়ত সংস্কৃতি মানুষকে করে অসাম্প্রদায়িক। লোকসংস্কৃতি মানুষের অন্তর্গত একাকিত্ব দূর করে; মানুষের পরস্পর মৈত্রীর বন্ধন দৃঢ় করে; সংস্কৃতির স্পর্শে মানুষ পরিশুদ্ধ হয়। লোকসংস্কৃতি মানুষকে মানবপ্রেমিক করে তোলে। লোকসংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য উপাদান লোকসংগীত। আর পল্লিনির্ভর বাংলাদেশের লোকসংগীতের প্রধান পৃষ্ঠপোষক গ্রামের লাখো কোটি মানুষ। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের লোকশিল্পীরা এ কাজটি যুগের পর যুগ নিষ্ঠার সঙ্গে করে চলেছেন। আবহমান বাংলার লোকসংস্কৃতি এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অনুষঙ্গ। বাংলার লোকসংগীত ও বাংলার লোকসংগীত শিল্পীদের নিয়ে অনেক লেখক-গবেষক নানামাত্রিক কাজ করেছেন। এ ধারায় লোকসংগীত শিল্পী, গবেষক, সুরকার, সংগীত পরিচালক ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। গ্রামীণ সংস্কৃতির কথা তিনিই আবহমান বাংলাদেশের লোকসংগীতের ভুবনে নিষ্ঠার সঙ্গে তুলে ধরেছেন।

ইন্দ্রমোহন রাজবংশী ছিলেন মরমি শিল্পী আব্দুল আলীমের যোগ্য উত্তরসূরি। লোকসংগীতের ক্ষেত্রে আব্দুল আলীমের পর তাকেই গণ্য করা হয়। তিনি শুধু কণ্ঠশিল্পীই ছিলেন না; একই সঙ্গে গবেষণা ও শিক্ষকতার মাধ্যমে লোকসংগীতের উন্নয়নে অবদান রেখে গেছেন। অনেক খ্যাতিমান শিল্পী আছেন আমাদের দেশে। কিন্তু তাদের জ্ঞান শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সে ক্ষেত্রে ইন্দ্রমোহন রাজবংশী ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি তার মেধা, জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন। গড়ে তুলেছিলেন বাংলাদেশ লোকসংগীত পরিষদ। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি দেশব্যাপী লোকসংগীতের প্রতিভা বিকাশে দারুণ অবদান রাখেন। সংগঠিত করেন লোকসংগীত শিল্পীদের। লোকসংগীত চর্চার মধ্য দিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন নতুন নতুন গান, নতুন নতুন শিল্পী। পল্লীকবি জসীম উদ্‌দীন, দোতারার জাদুকর কানাই লাল শীলের স্নেহধন্য ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর কণ্ঠে তাদের গান প্রাণ পেত। এ ছাড়া আবদুল লতিফ, মোমতাজ আলী খান, কুটি মনসুর প্রমুখের গান গেয়ে তিনি লোকসংগীতের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। ইন্দ্রমোহন রাজবংশী ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, জারি-সারি, মুর্শিদি, মারফতিসহ বিভিন্ন ধরনের গান গেয়ে এ অঙ্গনকে মাতিয়ে রেখেছিলেন। তিনি সরকারি সংগীত কলেজের লোকসংগীত বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। বেতার, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে ব্যস্ততম শিল্পী হিসেবে অবতীর্ণ হন ইন্দ্রমোহন।

১৯৬৭ সালে 'চেনা অচেনা' চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে প্লেব্যাক শুরু করেন। এর পর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। অসংখ্য চলচ্চিত্রে তিনি জনপ্রিয় লোকসংগীত গেয়েছেন। ব্যস্ত থেকেছেন দেশ-বিদেশের মঞ্চে। লোকসংগীত পরিবেশনায় তার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ইন্দ্রমোহন রাজবংশী সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তিনি পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়ার পর নানা কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে চলে যান ভারতে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করতে যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। গান গাওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকগান সংগ্রহ করতেন। এক হাজারেরও বেশি কবির লেখা অসংখ্য গান তিনি সংগ্রহ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর ১০১তম জন্মদিনে তিনি ১০১টি গান লিখে সুর করে বাংলা একাডেমিতে জমা দিয়েছিলেন প্রকাশনার জন্য। এখনও তা প্রকাশ পায়নি। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য বিলম্বে হলেও ২০১৮ সালে তাকে বাংলাদেশ সরকার একুশে পদকে ভূষিত করে।

সেই কণ্ঠযোদ্ধা, একুশে পদকপ্রাপ্ত কণ্ঠশিল্পীকে করেনাভাইরাস ছিনিয়ে নিল ৭ এপ্রিল। তার স্ত্রী লোকসংগীতশিল্পী দীপ্তি রাজবংশী বর্তমানে অসুস্থ। এক ছেলে দীপংকর থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়, আর মেয়ে সংগীতা থাকেন জাপানে। সুচিকিৎসার অভাবে হারাতে হলো লোকসংগীতের এই সাধক-গবেষককে। শুনেছি, এই গুণী শিল্পীকে আইসিইউর জন্য হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটতে হয়েছে। মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রী শোকবার্তা দিয়েছেন, অথচ তার সুচিকিৎসার জন্য আমরা তদারকিতে ব্যর্থ হয়েছি। তার স্ত্রীকে সুচিকিৎসাদানের দাবি জানাচ্ছি। গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি ইন্দ্রমোহন রাজবংশীকে।

লোকসংগীত শিল্পী