শিল্পের অশেষ পথের অক্লান্ত যাত্রী তিনি। অভিনয়, রাজনীতি ও ব্যক্তিজীবনের বর্ণাঢ্য ঘটনার রচয়িতা। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে রূপালি পর্দায় দর্শকদের রাঙিয়েছেন। তার হৃদয়ছোঁয়া অভিনয়ে মুগ্ধ সব বয়সী দর্শক। তিনি সারাহ বেগম কবরী। শুক্রবার রাত ১২টা ২০মিনিটে চির বিদায় নিলেন এ কিংবদন্তি। জীবদ্দশায় কবরীকে নিয়ে লেখা এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় সমকালের প্রিন্ট সংস্করণে। পাঠকদের জন্য আবার তা তুলে ধরা হলো- 

ষাটের দশকে চট্টগ্রামের স্কুলপড়ূয়া কিশোরী মিনা পালের বাংলা চলচ্চিত্রে 'কবরী' রূপে আত্মপ্রকাশ, উত্তাল একাত্তরে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে ভারতের বড় বড় শহরে জনমত সংঘটন, সেলুলয়েডের বাইরে রাজনীতি আর নিজের ব্যক্তিজীবনের টুকরো টুকরো স্মৃতিকথা মলাটে বেঁধে কিংবদন্তি অভিনেত্রী কবরী এবার লেখক পরিচয়ে আবির্ভূত হলেন। ঢাকার চলচ্চিত্রাঙ্গনের জননন্দিত অভিনয়শিল্পী কবরী তার কলমে তুলে এনেছেন তারই জীবনকথা 'স্মৃতিটুকু থাক' নামের বইতে। 'সুতরাং' ছবির সেটে প্রথম শটেই চড় খেয়ে কেঁদে ভাসানোর গল্প যেমন আছে, তেমনি আছে কিশোরী মিনা পালের মনে প্রথম কারও জন্য 'প্রেম প্রেম' অনুভূতির কথাও। বইতে কবরী নিজেও স্মৃতি হাতড়ে কেঁদেছেন, পাঠকদেরও কাঁদিয়েছেন।

কবরীর গুলশানের বাসা। দেখা হতেই হাসলেন। সেই সরল হাসি, যে হাসি তাকে আলাদা করেছে অন্যদের থেকে, মানুষের ভালোবাসায় পেয়েছেন 'মিষ্টি মেয়ে' উপাধি। বই লেখা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কবরী বলেন, "আমি পেশাদার লেখক নই। লিখতে বসে দেখি কত স্মৃতি, কত কথা, আনন্দ-বিষাদ। কোনটা বলব, কোনটা রাখব- সেও আরেক বিড়ম্বনা। আজও যখন চোখ রাখি স্মৃতির পাতায়, চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ওঠে 'সুতরাং' ছবির সেই দিনগুলো। মিনা পাল থেকে কবরী হয়ে ওঠা। এই অদ্ভুত জীবনের সব ঘটনা মনে থাকে, আবার লেখাও যায় না। জীবনের অনেক ঘটনা উজ্জ্বল হয়ে আছে, আবার অনেক ঘটনাই আউট অব ফোকাস।"

স্মৃতি যেন অমিয়সুধা

১৪ বছর বয়সে মিনা পাল নামের এক কিশোরী পেটে গামছা প্যাঁচানো পুঁটলি বেঁধে গর্ভবতী নারীর চরিত্রে অভিনয় করেন, সেই সূচনা। সুভাষ দত্ত পরিচালিত 'সুতরাং' ছবির মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে নায়িকা কবরীর আবির্ভাব। এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য রীতিমতো খুঁজে বের করা হয়েছিল তাকে। কবরী লিখেছেন, 'আলো ঝলমল ঢাকা শহর, মিনার চোখে স্বপ্ন। বাংলার মানুষের মনে এক চিলতে ঠাঁই করে নেওয়ার জন্য অনেক পরিশ্রম, অনেক সংগ্রাম। কত নতুন কিছু বুঝতে হবে, জানতে হবে, শিখতে হবে। নিজেকে তৈরি করতে হবে। এক হাজার ১১ টাকা পুঁজি নিয়ে বাংলার সাত কোটি মানুষের হৃদয় দখল নেওয়া ছিল অনেক কঠিন কাজ।' চলচ্চিত্রে কাজ শুরুর পর ফিরিঙ্গি বাজারের কিশোরী মিনার নাম বদলে সুভাষ দত্ত তার পর্দা নাম রাখলেন কবরী।

তিনি বলেন, "আমিও ধীরে ধীরে মিনার খোলস পাল্টে কবরী মোড়কে বন্দি হয়ে গেলাম। রূপালি পর্দার 'কবরী' হয়ে গেল জীবনের পরিচয়। কী ভেবে বা কী দেখে দত্তদা আমায় চলচ্চিত্রে নিয়েছিলেন, তা আজও ভেবে পাইনি। আমি কী রকম দেখতে ছিলাম, ফর্সা, না কালো, লম্বা না বেটে, সুন্দরী না পচা, আমার নাক বোঁচা নাকি খাড়া মনেও পড়ে না। এটুকু শুধু মনে পড়ে, ছোটবেলায় ছিলাম দুরন্ত। মা বলতেন, 'পাড়া চরনি'। সেই পাড়া চরনি যখন 'সুতরাং' ছবির নায়িকার জন্য ইন্টারভিউ দিতে এসেছে, তখন দত্তদা (সুভাষ দত্ত) বললেন, 'সংলাপ বলো, 'অ্যাই ছাড়ো, কেউ দেখে ফেলবে।' দেখি তুমি অভিনয় করতে পারবে কি-না?' আমি সাহস পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে, বুকের ভেতর কেউ যেন হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে। মনে মনে বাবাকে অভিশাপ দিচ্ছি- এত লম্বা কথা আমি কী করে বলব! আর এই লোকটা তো আচ্ছা পাজি! নিষ্ঠুর। দত্তদা বললেন, চুপ করে আছো কেন? তারপর কী ভেবে বললেন, বল প্লিজ, বল। স্বস্তি পেয়ে আস্তে আস্তে বললাম। সংলাপ শুনে তিনি বললেন, 'এ তো দেখি চাটগাঁইয়া গলার সুর। উহু চলবে না। কথা ঠিক করে বলতে হবে।' এভাবেই ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম। এখনও মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা।''

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কবরী

কবরীকে বলা হয় বাংলা চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে। তার ভুবন ভোলানো হাসি আর হৃদয়ছোঁয়া অভিনয়ে মুগ্ধ সব বয়সী দর্শক। তিনি যখন রূপালি পর্দায় অপরিহার্য, সে সময়ে একটি কথা প্রচলিত ছিল- 'কবরী হাসলেও লাখ টাকা, কাঁদলেও লাখ টাকা। অর্থাৎ তার অভিনয় এতটাই নিখুঁত যে, তিনি বাংলার সব শ্রেণির দর্শকের কাছে পাশের বাড়ির সেই মেয়েটি হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। পাশের বাড়ির মেয়েটির সুখ-দুঃখ যে কারও মনে রেখাপাত করতে পারে, যে কারণে তার হাসি বা কান্না দুয়েরই অর্থমূল্য ছিল। নির্মাতারা ছবিতে তাকে অন্তর্ভুক্ত করে নিশ্চিত থাকতে পারতেন।

কবরী বলেন, 'অনেক গুণী মানুষের সাহচর্য পেয়েছি আমি। চলচ্চিত্রে ব্যস্ত হয়ে পড়ার কারণে পড়াশোনাও শেষ করার সুযোগ পাইনি। তবে জ্ঞানী-গুণী মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা, বই পড়ে, মানুষ দেখে দেখে আমি অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা কত কিছুই তো বুঝতাম না!' অভিনেত্রী কবরী অকপটে বললেন, অনেকটা না বুঝেই অভিনয় শুরু করেছিলাম। কিছুই জানতাম না। এখনও যখন 'সুতরাং' দেখি, ছবিটি প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী মনে হয়। আমি কোনো পরিকল্পনা নিয়ে এগোইনি ঠিক, কিন্তু মনের মধ্যে একটা আকুতি ছিল। সবসময় সঠিকভাবে কাজটি করতে চেয়েছি। ভালো লাগাকে প্রাধান্য দিয়েছি। ভালো লাগা থেকে অভিনয়ে নিবেদিত হওয়া। সত্যি বলতে, দত্তদা আমাকে অভিনয় শিখিয়েছেন, সত্যদা এবং জিএম মান্নান সাহেব গান শিখিয়েছেন, আশু কাকা (রূপসজ্জাকর) সাজসজ্জা শিখিয়েছেন। এভাবে একটু একটু করে পা ফেলেছি। দিনে দিনে অনেক গুণী মানুষের ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছি। জ্ঞানী-গুণী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের অনেক ভালোবাসা পেয়েছি। এসবই আমার সম্বল।'

কবরী বলেন, তার প্রথম নায়ক সুভাষ দত্ত তাকে ঠিক উচ্চারণে সংলাপ বলা শিখিয়েছেন। কবরী জহির রায়হানের 'বাহানা' ছবিতে শুধু কাজ করেছেন। জহির রায়হান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'তিনি বলতেন, বিবিসি দেখো, ইংরেজি বই পড়ো।' আর খান আতা যেন হাতে ধরে শিখিয়েছেন সব কাজ। ধমক দিতেন যেমন, আদরও করতেন তেমনি। চলচ্চিত্রের অনেক খুঁটিনাটি খান আতার কাছ থেকেই শেখা।

তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী ...

জীবনের অনেক ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে পার করে আসা এই অভিনেত্রী বলেন, 'আমার কপালে প্রেমের সুখ কোনো দিন হয়নি। যাক আপদ চুকেছে। প্রেমে পড়ে কার না কার ঘরনি হতাম। তবে যা হওয়ার তা তো হয়েছে। সবার জীবন কি এক রকম হয়? এই পৃথিবী একটা যুদ্ধক্ষেত্র। যে যুদ্ধে কেউ জেতে, কেউ হারে- মেনে নিতেই হয়। এভাবেই বুঝি জীবন কেটে যায়।'

ফিরিঙ্গি বাজারের কিশোরী মিনা পালের স্বপ্ন ছিল- 'বড় হয়ে সাদা শাড়ি পরে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে মাস্টারি করবেন।' কিন্তু 'লাইট, ক্যামেরা-অ্যাকশন-কাটের' পর ব্যক্তিজীবনে রাজনীতিতে নেমে জীবনের আরেক চলচ্চিত্রের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে।

রাজনীতি নিয়ে কবরী বলেন, 'আমি রাজনীতিতে কখনও অভিনয় করিনি, আবার অভিনয়জীবনেও কখনও রাজনীতিকে স্থান দিইনি। দুটি কাজই করেছি মানুষকে ভালোবেসে আর মানুষের ভালোবাসার জন্য। মানুষের পাশে থাকার জন্য।' কবরীর এই মন্তব্যই বলে দেয়, কর্মে যতখানি নিপুণ, গুছিয়ে বলতেও পারেন ততখানি। 'স্মৃতিটুকু থাক' বইতে তিনি লিখেছেন, ভোটের মাঠে নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা- এক সময় যে পরিবারের বধূ ছিলেন তিনি। সব জয় করেই কবরী নবম সংসদে আওয়ামী লীগের এমপি হয়েছিলেন।

কবরীর নায়কেরা ...

ষাট আর সত্তরের দশকে রাজ্জাক-কবরী জুটি ছিল দারুণ জনপ্রিয়। এ জুটির 'নীল আকাশের নিচে', 'যে আগুনে পুড়ি', 'দর্পচূর্ণ', 'স্মৃতিটুকু থাক', 'রংবাজ', 'বেঈমান', 'কাঁচকাটা হীরে'সহ অসংখ্য ছবি আছে, যা দর্শক-মন ছুঁয়েছে। একটি দারুণ ব্যাপার হলো নায়ক উজ্জ্বল, সোহেল রানা, আলমগীর, ফারুক ও জাফর ইকবালের প্রথম ছবির নায়িকাও কবরী। ফারুকের সঙ্গে জুটি বেঁধে 'সুজন সখী' ও 'সারেং বৌ' ছবি দুটো করেও নাম কুড়িয়েছেন তিনি। দ্বিতীয় ছবিটির জন্য তিনি পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার।

নায়করাজ নিয়ে কবরী লিখেছেন, 'একসঙ্গে কাজ করেছি অনেক ছবিতে। বন্ধুত্ব হওয়ারই কথা, হয়েছেও। কিন্তু রাজ্জাক সাহেব বরাবরই আমাকে হিংসে করেন। আমি করতাম কি-না জানি না। আমি তাকে বন্ধুর পরও আরও এক ধাপ এগিয়েই রেখেছিলাম।' অন্য নায়কদের নিয়ে তিনি লিখেছেন, 'সারা পৃথিবীতে যেখানে নায়ক শাসিত। সেখানে আমার ক্যারিয়ারে ডেব্যু হয়েছিল ৬ নায়কের।'

মন্তব্য করুন