বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর ভূমিকা ছিল পক্ষে-বিপক্ষে, বিভিন্ন সরকারের বিভিন্ন রকম। কিন্তু সব দেশের সাধারণ মানুষের, বিশ্বমানবতার সহানুভূতি-সমর্থন ছিল বাংলাদেশের নিপীড়িত যোদ্ধা মানুষের পক্ষে। আমাদের জন্য আরও গৌরবের যে, নানা দেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সংগীতবিজ্ঞান ও সমাজ-সংশ্নিষ্ট সেরা প্রতিভাবান মানুষরা আমাদের সমর্থনে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে এসেছিলেন। তারা পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস গণহত্যার বিরুদ্ধে ঘৃণা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন, বাঙালি উদ্বাস্তুদের জন্য সাহায্য সংগ্রহ করে পাঠিয়েছেন।

এই ধারায় মুক্তিযুদ্ধকালের সবচেয়ে চমকপ্রদ অবিস্মরণীয় ও বিশ্বজনমতের ওপর প্রভাব সৃষ্টিকারী ঘটনা হচ্ছে, আজ থেকে ৫০ বছর আগে, ১৯৭১ সালের ঠিক এই দিনটিতে, ১ আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'- বাংলাদেশের জন্য সংগীতায়োজন। এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ভারতীয় বাঙালি বিশ্ববিশ্রুত সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর, আধুনিক রক সংগীত গ্রুপ বিটলস-এর লিড গায়ক ও বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় সংগীতকার ইংরেজ জর্জ হ্যারিসন এবং আমেরিকার কবি, গায়ক, চিত্রী, অভিনেতা, সংগীতকার, ২০১৬ সালে নোবেল বিজয়ী জনগণের শিল্পী বব ডিলান। অংশ নিয়েছিলেন সেরা জনপ্রিয় শিল্পীরা।

কোনো যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মানব সহায়তার উদ্দেশ্যে এটি ছিল বৃহৎ পরিসরে আয়োজিত প্রথম দাতব্য কনসার্ট। প্রায় ৪০ হাজার মানুষ সেদিন টিকিট কেটে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল।

পণ্ডিত রবিশঙ্করের পৈতৃক নিবাস ছিল বাংলাদেশে। একাত্তরে পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা শুরু হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে সোচ্চার হন। রবিশঙ্কর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে বাংলাদেশে গণহত্যা সম্পর্কে জানেন। তিনি তার সংগীতশিষ্য ও বন্ধু জর্জ হ্যারিসনকে সংগ্রহ করা পত্র-পত্রিকার প্রতিবেদনগুলো দেখান, যা হ্যারিসনকে বাংলাদেশের সংকট নিয়ে গভীরভাবে ব্যথিত করে। হ্যারিসন ১৯৬৫ সালে রবিশঙ্করের কাছে সেতারবাদন শিখেছিলেন। রবিশঙ্কর বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে বড় আকারের দাতব্য কনসার্ট করার প্রস্তাব দেন, যাতে এর মাধ্যমে অন্তত ২৫ হাজার ডলার সংগ্রহ করা যায়। হ্যারিসন রবির ডাকে সাড়া দিয়ে কাজ শুরু করেন। তখন হ্যারিসনের মূল ব্যান্ড বিটলস ভেঙে গিয়েছিল এবং অন্য সদস্যদের সঙ্গেও তার আগের মতো সম্পর্ক ছিল না। তবে হ্যারিসনের আমন্ত্রণে কনসার্টে বব ডিলানসহ খ্যাতনামা তারকারা যোগ দিয়েছিলেন। প্রস্তুতির বিভিন্ন পর্ব শেষে ২৭ জুলাই হ্যারিসন তার 'বাংলাদেশ' গানটি মুক্তি দিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের সংকটের কথা তুলে ধরেন। ওই দিন এক সংবাদ সম্মেলনে হ্যারিসন ও রবিশঙ্কর কনসার্ট ফর বাংলাদেশের ঘোষণা দেন।

ম্যাডিসন স্কয়ারে ১ আগস্ট দুটি ঐতিহাসিক কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমটি দুপুর আড়াইটায় এবং দ্বিতীয়টি রাত ৮টায়। অংশগ্রহণকারীরা ছিলেন সবাই খ্যাতনামা তারকাশিল্পী। প্রথমে আগত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে কনসার্টের সূচনা করেন হ্যারিসন। পরে পি ত রবিশঙ্কর তার দলসহ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত পরিবেশন করেন। যার মধ্যে ছিল কনসার্টের জন্য বিশেষভাবে তৈরি 'বাংলা ধুন' ও অন্যান্য পরিবেশনা। এটি পরিবেশনার পর সংক্ষিপ্ত বিরতি দেওয়া হয়। তখন নেদারল্যান্ডসের এক টিভি চ্যানেলের ধারণ করা বাংলাদেশে সংঘটিত নৃশংসতা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফুটেজ দেখানো হয়। এরপর ছিল হ্যারিসনের পরিবেশনা; তার সঙ্গে ছিলেন রিঙ্গো স্টার, এরিক ক্ল্যাপটন (যিনি অসুস্থ ছিলেন), বিলি প্রিস্টন, লিয়ন রাসেল, ক্লাউস ভোরম্যান, জিম কেল্টনারসহ ১৮ মিউজিশিয়ান। এটি হ্যারিসন ও ক্ল্যাপটনের বেশ কয়েক বছর বিরতির পর প্রথম কোনো কনসার্ট পরিবেশনা। ডিলানের উপস্থিতি শুধু হ্যারিসনের জন্য নয়, দর্শকের জন্যও চমক ছিল। হ্যারিসনের 'বাংলাদেশ' গানটি দিয়ে প্রথম কনসার্টটি শেষ হয়।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রথম কনসার্টের টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ায় হ্যারিসন, ডিলানসহ অনেক উৎসাহের সঙ্গে দ্বিতীয় কনসার্টটি করেন। তখন পরিবেশনায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়। এবারও কনসার্টের সব টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম বড় কনসার্ট। বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষ সেদিন প্রথম বাংলাদেশের নাম শুনেছিল। তারা জেনেছিল মুক্তিযুদ্ধের কথা, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলার কথা। জর্জ হ্যারিসন আটটি, বব ডিলান পাঁচটি এবং রিঙ্গো স্টার ও বিলি প্রিস্টন একটি করে গান গেয়েছিলেন। লিয়ন রাসেল একটি একক এবং ডন প্রিস্টনের সঙ্গে একটি গান করেছিলেন।

অনুষ্ঠানের শেষে জর্জ হ্যারিসন গেয়েছিলেন তার সেই অবিস্মরণীয় গান 'বাংলাদেশ, বাংলাদেশ'। গানটির রচনা ও সুর তারই করা। গানের মূল কথা ছিল বিশ্বের মানুষের কাছে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান। গানের কথা ও সুরে বিমোহিত দর্শক-শ্রোতা আবেগে অশ্রুসিক্ত হন। বাংলাদেশ পাকিস্তান বাহিনীকে পরাজিত করার আগেই এই কনসার্টের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী স্বতন্ত্র দেশ হিসেবে পরিচিতি পায়। যুক্তরাষ্ট্র মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করলেও দেশটির স্থানীয় জনসাধারণ বিভিন্ন সময়ে হাজারো বাঙালির সঙ্গে একাত্ম হয়ে হ্যারিসনের কণ্ঠে গাওয়া 'বাংলাদেশ, বাংলাদেশ' গানটির মাধ্যমে রাজপথ প্রকম্পিত করেন, যা তখন যুক্তরাষ্ট্র সরকারকেও বিচলিত করেছিল।