মাসুদ সেজান। লেখক ও নির্মাতা। দীর্ঘ সময় নিজের জনপ্রিয়তাকে ধরে রেখে তিনি একের পর এক নির্মাণ করে চলেছেন অসাধারণ সব গল্পচিত্র। দেশের টিভি নাটক, সিনেমা ও অনলাইন মাধ্যম নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে 

কেমন আছেন?

ব্যক্তিগতভাবে আমি সুস্থ আছি। যদিও প্রতিদিন অনেক আপনজন, পরিচিতজনের দুঃসংবাদ পাচ্ছি, এ কারণেই মনটা ভারাক্রান্ত। মহামারির সার্বিক অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন আছি।

একটা সময় আমাদের দেশের টিভি নাটকের মান এবং দর্শক ছিল। এখন নাটকের সেই মান কোথায়? আর দর্শকরা কেন টিভি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন?

এ নিয়ে কথা বলতে বলতে আমি ক্লান্ত। সবার ভালোর জন্য কথা বলতে গিয়ে অনেকের শত্রুতে পরিণত হয়েছি। নতুন করে আবার শত্রু বাড়াতে বলছেন?

কয়েকদিন ধরে 'বর্তমানে নাটকের পতিত দশা' নিয়ে আপনার একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে... বিষয়টি পরিস্কার করে বলবেন?

হ্যাঁ। আমি সেখানে কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে কিছু বলিনি। সমকালীন নাটকে যে অসুস্থ প্রবণতাগুলো ঢুকে গেছে, তা নিয়ে ডয়চে ভেলের এক সাক্ষাৎকারে কিছু বাস্তব সত্য উপস্থাপন করেছি মাত্র। অবশ্য আমার এই বক্তব্যের পক্ষে দেশের অসংখ্য পরিচালক-অভিনেতা-অভিনেত্রী আমাকে সমর্থন করে সাধুবাদ জানিয়েছেন। আবার বিপরীত চিত্রটি হচ্ছে, এমনও দুই-একজনকে পেয়েছি, তারা বলেছেন- আমি নাকি ব্যক্তিগত চরম হতাশা থেকে কথাগুলো বলেছি, যার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই। তারা আমাকে পরাজিত সৈনিক বলেও উল্লেখ করেছেন। তাহলে তো ডয়চে ভেলের সেই একই সংবাদে নাট্যজন মামুনুর রশীদ, তারিক আনাম খান, ডা. আব্দুন নূর তুষারও আমার সমার্থক কথাগুলোই বলেছেন। তারাও কি পরাজিত সৈনিক?

আপনার সেই বক্তব্যের মূল বিষয়গুলো কী ছিল?

আপনার আগের প্রশ্নে যা ছিল, কেন দর্শক টিভি নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন? আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক মেধাবী মুখ থাকা সত্ত্বেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও এজেন্সির অনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ধ্বংস করে দিচ্ছে নাটকের মতো একটি মহান শিল্পকে। নাটকের গুণগত মান নিয়ে যাদের বিন্দুমাত্র ধারণাও নেই, তারাও নাক গলাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, শিল্পী নামের আড়ালে আমাদের অশিল্পীসুলভ মানসিকতা। যার মধ্যে আছে টাকার লোভ, সস্তা বিনোদন দিয়ে ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা, নিজের তারকাখ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে একধরনের স্বেচ্ছাচারিতা। ফলে নাটক তার শিল্পমান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। টিভিকে বরাবরই ফ্যামিলি বিনোদনমাধ্যম বলা হয়। সমসাময়িক অনেক কনটেন্ট পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে দেখার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

যে কোনো কারণেই হোক দর্শক এখন অনলাইনের দিকে বেশি ঝুঁকছে। বলা হচ্ছে, যে নাটক বা যে শিল্পীর যত ভিউ, সে তত জনপ্রিয়। ভিউ বেশি মানেই কি জনপ্রিয়তা?

লজিক তো তা-ই বলে। তা না হলে হিরো আলম, মাহফুজুর রহমান, অনন্ত জলিল, সেফুদা কোথা থেকে এলো? আপনি বলতে পারেন, জনপ্রিয়তার সঙ্গে শিল্পী বা শিল্পের সম্পর্ক কী? এখানেই একটি বিশাল পার্থক্য বিদ্যমান। বেদের মেয়ে জোসনা আর পদ্মা নদীর মাঝি সিনেমার মধ্যে যে পার্থক্য।

দর্শক রুচি তৈরি করতে হলে একজন নির্মাতা এবং শিল্পীর ভূমিকা কি হওয়া উচিত?

সভ্যতার শুরু থেকেই শিল্পীকে সমাজের অগ্রগণ্য মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। প্রায় সব শিল্পমাধ্যমই সভ্যতাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কাজ করেছে। বিশেষ করে নাটক কিংবা চলচ্চিত্রকে সরাসরি সমাজের দর্পণ বলা হয়েছে। এটুকুর মধ্য দিয়েই আমরা বুঝতে পারি, একজন শিল্পীর দায়বদ্ধতা। তাকে অন্য দশজন মানুষের আইডল হিসেবে তৈরি করতে হয়। একজন শিল্পীর কাছ থেকে মানুষ যেন প্রকৃত মানুষ হওয়ার পাঠটুকু নিতে পারে। সেক্ষেত্রে শিল্পী যদি নিজেই অসৎ হয়, তাহলে সমাজ-সংস্কৃতি বেহাল দশার মধ্যে পতিত হবে, এটাই স্বাভাবিক।

নাটকের নাম এবং ভাষার ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কেন এমনটা হলো?

ওই যে বলেছি, সস্তা ভিউয়ের প্রতিযোগিতায় নেমে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়েছি। একটা চটকদারি নাম দিয়ে প্রথমেই দর্শককে আকৃষ্ট করার একটা স্থূল প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আর নাটকের মধ্যে নানান চরিত্রের নানান ভাষা উঠে আসতেই পারে, কিন্তু মুশকিলটা হয়েছে- না প্রমিত, না আঞ্চলিক এমন একটা জগাখিচুড়ি ভাষার সঙ্গে সম্প্রতি কেউ কেউ নোংরা কিছু শব্দকে সংযুক্ত করে একটা স্মার্ট রূপ দেওয়ার দাবি করছে, এটা খুবই পীড়াদায়ক। বিদেশের উদাহরণ দিয়ে অনেকেই এটাকে জায়েজ করারও চেষ্টা করছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আমার দেশের সংস্কৃতির জন্য এটা শোভনীয় নয়।

বাংলাদেশের দুটি প্রধান শিল্প চলচ্চিত্র ও নাটক ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে কি কোনো রাজনৈতিক কারণ আছে?

অবশ্যই আছে। সব নীতির রাজা হচ্ছে রাজনীতি। একটি দেশের রাজনৈতিক মতাদর্শই বলে দেয় সে দেশের কৃষ্টি-কালচার কী হবে, কোন পথে ধাবিত হবে। চলচ্চিত্র ও নাটক উভয় বিষয়েই সরকারি নীতিমালায় বিভ্রান্তি আছে। এ ছাড়া এই শিল্পের বিকাশে যেটুকু নীতিমালা আছে, তার মধ্যেও আবার অপপ্রয়োগের অভিযোগ বিস্তর। হুমায়ুন আজাদের একটি কবিতার লাইন আজকাল খুব মনে পড়ে, সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে। আমি যে মাধ্যমে কাজ করছি, চারপাশে যা দেখছি, আমি তীব্রভাবে অনুভব করছি, সবকিছু নষ্টদের অধিকারে চলে যাচ্ছে।

পার্বণ টিভি ফিকশনের জন্য নতুন কোনো কাজ?

কাজের পরিকল্পনা করছি, কিন্তু আমি খুবই চিন্তিত এখন যেসব কনটেন্ট দর্শক 'খাচ্ছে', তাদের মতো করে কতটা পরিবেশন করতে পারব। ভিউ না হলে তো ইনভেস্টমেন্টটাই উঠে আসবে না। কিছু সস্তা নাম, সস্তা কনটেন্ট মাথায় আনার চেষ্টা করছি, কিন্তু আসছে না। আমাকে দিয়ে হবে কিনা এ নিয়ে আমি চিন্তিত।

টিভিতে আপনার প্রায় সবক'টি দীর্ঘ ধারাবাহিক জনপ্রিয়তা পেয়েছে, নতুন কাজ কবে আসবে?

প্রথমত, আমি সব চ্যানেলে কাজ করি না। নাটকের জন্য ভালো চ্যানেলগুলোও এখন এজেন্সির চাপে নাজেহাল অবস্থার মধ্যে পড়েছে, তারা বিজ্ঞাপনসমেত কনটেন্ট সাপ্লাই দিয়ে চ্যানেলগুলোকে একপ্রকার বন্দি করে ফেলেছে। ফলে, নাটক কিনে চালানোর মতো সাধ্য তারা হারিয়ে ফেলেছে। এ অবস্থা থেকে যদি চ্যানেলগুলো বের হয়ে আসতে পারে, আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, নিশ্চয় নতুন কাজ নিয়ে দর্শকের সামনে আসব।

আপনার দর্শকপ্রিয়তার প্রধান কারণ আপনি কী মনে করেন?

আমি যখন যে কাজটি করি সে কাজটির প্রতি শতভাগ মনোযোগ দিই। সততার সঙ্গে করার চেষ্টা করি। সমাজের নানান অসঙ্গতি তুলে ধরি। সম্ভবত দর্শক আমার কাজ দেখে একটা ভালো মেসেজ পান, বিনোদিত হওয়ার পাশাপাশি অনুপ্রাণিত হন। বাকিটা দর্শক ভালো বলতে পারবেন।