দুই দিন পরে খবর এল, আমাকে ফরিদপুর জেলে নিয়ে যেতে। আমি ফরিদপুর জেলে ফিরে এলাম। এবার আমাকে রাখা হল রাজবন্দিদের ওয়ার্ডে। এই ওয়ার্ডে দুইটা কামরা; এক কামরায় পাঁচজন ছিল। আরেক কামরায় গোপালগঞ্জের বাবু চন্দ্র ঘোষ, মাদারীপুরের বাবু ফণি মজুমদার ও আমি। এই দুইজনকে আমি পূর্ব থেকেই জানতাম। ফণি মজুমদার পূর্বে ফরোওয়ার্ড ব্লকের নেতা ছিলেন। ইংরেজ আমলে আট-নয় বৎসর জেল খেটেছেন। দেশ স্বাধীন হবার পরেও রেহাই পান নাই। বিবাহ করেন নাই। তার বাবা আছেন পাকিস্তানে, পেনশন পান। ফণি বাবু দেশ ছাড়তে রাজি হন নাই বলে তিনিও দেশ ছাড়েন নাই। হিন্দু-মুসলমান জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে তাকে ভালবাসত। কেউ কোন বিপদে পড়লে ফণি মজুমদার হাজির হতেন। কারো বাড়িতে কেউ অসুস্থ হলে ফণি মজুমদারকে পাওয়া যেত। আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। সরকার যাদের কমিউনিস্ট ভাবতেন, তারা আছে এক কামরায়। আমরা তিনজন কমিউনিস্ট নই, তাই আমরা আছি অন্য কামরায়।
চন্দ্র ঘোষ ছিলেন একজন সমাজকর্মী। জীবনে রাজনীতি করেন নাই। মহাত্মা গান্ধীর মত একখানা কাপড় পরতেন, একখানা কাপড় গায়ে দিতেন। শীতের সময়ও তার কোনো ব্যতিক্রম হত না। জুতা পরতেন না, খড়ম পায়ে দিতেন। গোপালগঞ্জ মহকুমায় তিনি অনেক স্কুল করেছেন। কাশিয়ানী থানার রামদিয়া গ্রামে একটা ডিগ্রি কলেজ করেছেন। অনেক খাল কেটেছেন, রাস্তা করেছেন। এই সমস্ত কাজই তিনি করতেন। পাকিস্তান হওয়ার পরে একজন সরকারি কর্মচারী অতি উৎসাহ দেখাবার জন্য সরকারকে মিথ্যা খবর দিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করায় এবং তার শাস্তি হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেব গোপালগঞ্জে এসে ১৯৪৮ সালে সেই কর্মচারীকে বলেছিলেন, চন্দ্র ঘোষের মত মানুষকে গ্রেফতার করে ও মিথ্যা মামলা দিয়ে পাকিস্তানের বদনামই করা হচ্ছে।
চন্দ্র ঘোষ শাস্তি ভোগ করে আবার নিরাপত্তা বন্দি হয়েছেন। আমি গোপালগঞ্জের লোক, আমি সকল খবরই রাখতাম। মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানের আন্দোলন আমি বেশি করেছি এই সমস্ত এলাকায়। দেশের মুসলমান, হিন্দু সকলেই ভালবাসত চন্দ্র ঘোষকে। তাঁর অনেক মুসলমান ভক্তও ছিল। তফসিলী সম্প্রদায়ের হিন্দুরাই তার বেশি ভক্ত ছিল। গোপালগঞ্জের কিছু সংখ্যক তফসিলী সম্প্রদায়ের হিন্দু পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করেছিল, এমনকি কিছু সংখ্যক নমশূদ্র হিন্দু কর্মী আমাদের সাথে সিলেটে গণভোটে কাজ করেছিল। চন্দ্র ঘোষ একটা মেয়েদের হাইস্কুলও করেছিলেন। আমিও অনেক সরকারি কর্মচারীকে বলেছিলাম, এ ভদ্রলোককে অত্যাচার না করতে। কারণ, তিনি কোনোদিন রাজনীতি করেন নাই। সমাজের অনেক কাজ হবে তাঁর মত নিঃস্বার্থ ত্যাগী সমাজসেবক দিয়ে। দেশ স্বাধীন হয়েছে, এদের ব্যবহার করা দরকার। কে কার কথা শোনে! সরকারকে খবর দেওয়া হয়েছিল, হিন্দুরা আইন মানছে না। হিন্দুস্থানের পতাকা তুলেছে। চন্দ্র ঘোষ এদের নেতা। শীঘ্রই আরও আর্মড পুলিশ পাঠাও, আরও কত কি, খোদা জানে! কিন্তু আমি জানি, সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। গোপালগঞ্জে মুসলমানদেরও শক্তি কম ছিল না। সে রকম হলে মুসলমানরা নিশ্চয়ই বাধা দিত। যদি এ সমস্ত অন্যায় করত, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও বেধে যেত। তেমন কোনো কিছুই হয় নাই। চন্দ্র ঘোষের গ্রেফতারে হিন্দুরা ভয় পেয়েছিল। বর্ণ হিন্দুরা পশ্চিমবঙ্গের দিকে রওয়ানা করতে শুরু করেছে। যা সামান্য কিছু আছে, তাও যাবার জন্য প্রস্তুত। তাকে গ্রেফতারের একমাত্র কারণ ছিল সরকারকে দেখান, দেখ আমি কিভাবে রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ দমন করলাম। পাকিস্তানকে রক্ষা করলাম, ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমি ফরিদপুর জেলে আসলাম, স্বাস্থ্য খারাপ নিয়ে। এসেই আমার ভীষণ জ্বর; মাথার যন্ত্রণা, বুকে ব্যথা অনুভব করতে লাগলাম। চিকিৎসার ত্রুটি করছেন না জেল কর্তৃপক্ষ, তবুও কয়েকদিন খুব ভুগলাম। রাতভর চন্দ্র বাবু আমার মাথার কাছে বসে পানি ঢেলেছেন। যখনই আমার হুঁশ হয়েছে দেখি চন্দ্র বাবু বসে আছেন। ফণি বাবুও অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকতেন আমার জন্য। তিন দিনের মধ্যে আমি চন্দ্র বাবুকে বিছানায় শুতে দেখি নাই। আমার মাথা টিপে দিয়েছেন। কখনও পানি ঢালছেন, কখনও ওষুধ খাওয়াচ্ছেন। কখনও পথ্য খেতে অনুরোধ করছেন। না খেতে চাইলে ধমক দিয়ে খাওয়াতেন। আমি অনুরোধ করতাম, এত কষ্ট না করতে। তিনি বলতেন, "জীবনভরই তো এই কাজ করে এসেছি, এখন বুড়াকালে কষ্ট হয় না।" ডাক্তার সাহেব আমাকে হাসপাতালে নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু চন্দ্র বাবু ও ফণি বাবু দেন নাই, কারণ সেখানে কে দেখবে? অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দিরাও আমার জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। কয়েকদিন পরেই আমি আরোগ্য লাভ করলাম। কিন্তু খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম বলে গোপালগঞ্জে মামলার দিনে যেতে পারি নাই। বাড়ির সকলে এসে ফিরে গিয়েছিল। বাড়ি থেকে নৌকায় আসতে হয় ও গোপালগঞ্জে থাকতে হয়, নানা অসুবিধা। আমি গোপালগঞ্জ না যাওয়ায় আব্বা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। টেলিগ্রাম করেছিলেন।
**
ফরিদপুর জেলে ফিরে এলাম। দেখি চন্দ্র বাবু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, অবস্থা খুবই খারাপ। তাঁর হার্নিয়ার ব্যারাম ছিল। পেটে চাপ দিয়েছিল, হঠাৎ নাড়ি উল্টে গেছে। ফলে গলা দিয়ে মল পড়তে শুরু করেছে। যে কোন সময় মারা যেতে পারেন। সিভিল সার্জন সাহেব খুব ভাল ডাক্তার। তিনি অপারেশন করতে চাইলেন, কারণ মারা যখন যাবেনই তখন শেষ চেষ্টা করে দেখতে চান। আত্মীয়স্বজন কেউ নাই যে, তার পক্ষ থেকে অনুমতিপত্র লিখে দিবে। চন্দ্র ঘোষ নিজেই লিখে দিতে রাজি হলেন। বললেন, "কেউ যখন নাই তখন আর কি করা যাবে!" সিভিল সার্জন সাহেব বাইরের হাসপাতালে নিতে হুকুম দিলেন। চন্দ্র ঘোষ তাঁকে বললেন, "আমাকে বাইরের হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন। আমার তো কেউ নাই। আমি শেখ মুজিবুর রহমানকে একবার দেখতে চাই, সে আমার ভাইয়ের মত। জীবনে তো আর দেখা হবে না।" সিভিল সার্জন এবং জেলের সুপারিনটেনডেন্ট, তাদের নির্দেশে আমাকে জেলগেটে নিয়ে যাওয়া হল। চন্দ্র ঘোষ স্ট্রেচারে শুয়ে আছেন। দেখে মনে হল, আর বাঁচবেন না, আমাকে দেখে কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, "ভাই, এরা আমাকে সাম্প্রদায়িক বলে বদনাম দিল; শুধু এই আমার দুঃখ মরার সময়। কোনোদিন হিন্দু মুসলমানকে দুই চোখে দেখি নাই। সকলকে আমায় ক্ষমা করে দিতে বোলো। আর তোমার কাছে আমার অনুরোধ রইল, মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখ। মানুষে মানুষে কোন পার্থক্য ভগবানও করেন নাই। আমার তো কেউ নাই, আপন ভেবে তোমাকেই শেষ দেখা দেখে নিলাম। ভগবান তোমার মঙ্গল করুক।" এমনভাবে কথাগুলো বললেন যে সুপারিনটেনডেন্ট, জেলার সাহেব, ডেপুটি জেলার, ডাক্তার ও গোয়েন্দা কর্মচারী সকলের চোখেই পানি এসে গিয়েছিল। আর আমার চোখেও পানি এসে গিয়েছিল। বললাম, "চিন্তা করবেন না, আমি মানুষকে মানুষ হিসাবেই দেখি। রাজনীতিতে আমার কাছে মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিষ্টান বলে কিছু নাই। সকলেই মানুষ।" আর কথা বলার শক্তি আমার ছিল না। শেষ বারের মত বললাম, "আল্লাহ করলে আপনি ভাল হয়ে যেতে পারেন। তাঁকে নিয়ে গেল। সিভিল সার্জন সাহেব বললেন, "আশা খুব কম, তবে শেষ চেষ্টা করছি, অপারেশন করে।"
'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'
শেখ মুজিবুর রহমান
ইউ পি এল, ২০১২