এটা ভাবলে মন আনন্দের ভরে ওঠে- আজকে যেসব বেতার টেলিস্কোপ বহির্জগতের চেতন-অচেতন পদার্থের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে, সেখানে মিলিমিটার ওয়েভ বা তরঙ্গ কাজ করছে। কেননা, ভূমিভিত্তিক বেতার জ্যোতির্বিদ্যায় অনেক উচ্চ অবস্থানে অবস্থিত কিট পিক এবং আটকামা লার্জ মিলিমিটার অ্যারেতে (এএলএমএ) মিলিমিটার তরঙ্গের চেয়ে বেশি বা কম হলে আবহশোষণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই ১ সেন্টিমিটার থেকে ১ মিলিমিটারের মধ্যকার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ব্যবহার করা হয়। তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের এই ব্যাপ্তিকে মিলিমিটার ওয়েভ বলে। যদি কখনও বহির্জাগতিক বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়, তাহলে কি ওই বুদ্ধিমত্তারা বুঝতে পারবে- এই মিলিমিটার ওয়েভের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আপনভোলা সরল সাদাসিধে পৃথিবীর একজন মানুষ, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, যিনি জড় ও জীবনকে এক অখণ্ডতায় অনুভব করতে চেয়েছিলেন।
মানুষের কল্যাণে অসাধারণ সব কর্মকাণ্ডের জন্য জগদীশচন্দ্র বসুর সম্মানে চাঁদে একটি ক্রাটার বা খাদের নাম রাখা হয়েছে :বোস ক্রাটার। জগদীশচন্দ্র বসু মনে করতেন, 'কোনো বিজ্ঞানীর অর্জন পুরো মানব জাতির অর্জন।' ফরাসি কথাশিল্পী রোঁমা রোলাঁ (১৮৬৬-১৯৪৪) এই বিজ্ঞানী সম্পর্কে বলেন, 'বয়সের তুলনায় এ এক অবিশ্বাস্য তারুণ্য এবং কথা বলার, বেঁচে থাকার এক আনন্দ আমায় মনে করিয়ে দেয় ১৯১৫ সালের গৌরবময় আবিস্কারে উদ্দীপ্ত আইনস্টাইনকে।'
জগদীশচন্দ্র বসুর জন্ম ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর। তার পৈতৃক নিবাস মুন্সীগঞ্জের রাঢ়ীখাল গ্রামে। ১৮৬৩ সালে ফরিদপুরে বাংলা স্কুলে তার প্রাথমিক শিক্ষা আরম্ভ। প্রকৃতিবিজ্ঞান সম্বন্ধে শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে কেমব্রিজের ক্রাইস্ট কলেজে ভর্তি হন এবং ট্রাইপস পাস করেন। ১৮৮৪ সালে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি পাঠ সম্পন্ন করেন। কেমব্রিজে ছাত্র থাকাকালীন এডিনবরার ছাত্র প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সঙ্গে দেখা ও গভীর বন্ধুত্ব হয়েছিল, যিনি ভারতে রসায়নশিল্পের গতি-প্রকৃতিই পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের মাত্র ২৪ বর্গফুট ক্ষেত্রফলের একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে তিনি তার গবেষণাগারের কাজ শুরু করেছিলেন, ১৮৮৮ সালে। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর প্রথিতযশা ছাত্রবৃন্দের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- পদার্থবিদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু, পদার্থবিদ মেঘনাদ সাহা, পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবীশ, পদার্থবিদ শিশির কুমার মিত্র, পদার্থবিদ দেবেন্দ্র মোহন বসু। ১৯২০ সালে রয়্যাল সোসাইটির ফেলো, ১৯২৮ সালে ভিয়েনা একাডেমি অব সায়েন্সের সদস্য, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স একাডেমির ফেলো হয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু।
শৈশবেই জগদীশ মা, মাটি, নদী, জল আর মাটির মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন। বাবা বলতেন, 'নিজের ভাষা শেখো, নিজের ভাবে উদ্বুদ্ধ হও, নিজের ভাষার সাহিত্যের মাধ্যমে স্বদেশের সংস্কার ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হও। হৃদয়ঙ্গম করো, তুমি ওদেরই একজন। বিচ্ছিন্ন নও, শ্রেষ্ঠ নও।'
জগদীশচন্দ্র বসু হার্টজের পরীক্ষায় পাওয়া বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গের বেতার অংশটির বিশেষত্ব দেখিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে যাত্রা করলেন, যা শুধু তুলনা করা যায় আইজ্যাক আসিমভের সৃষ্টি ফাউন্ডেশন কাহিনির গায়া উপলব্ধির সঙ্গে। জগদীশচন্দ্র বসুও বোঝানোর চেষ্টা করলেন প্রাণী, উদ্ভিদজগৎ এবং জড়জগতের মধ্যে এক অন্তর্নিহিত সম্পর্ক বিদ্যমান। তিনি তার ভাবনাগুলো বলেই শেষ করলেন না; নিজের তৈরি যন্ত্রপাতি দিয়ে জীবজগৎ ও জড়জগতের মতো ভিন্ন ভিন্ন অস্তিত্বের সাড়াগুলো তরঙ্গতত্ত্ব দিয়ে বোঝারও চেষ্টা করলেন। এমন সব বিষয়কে তিনি পর্যবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্যপ্রমাণের ওপর প্রচেষ্টায় ত্রিশ বছর কাটিয়ে দিলেন।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্য সরকার দেশটির ৫০ পাউন্ডের নতুন নোটে বিখ্যাত কোনো বিজ্ঞানী কিংবা ব্যক্তিত্বের মুখচ্ছবি জলছাপ হিসেবে ব্যবহার করতে চাচ্ছে। তবে কাকে বেছে নেবে, সে ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী জনসাধারণের কাছ থেকে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ উন্মুক্ত মনোনয়ন চেয়েছিল। অবশ্য বিজ্ঞানীদের নাম প্রস্তাবের একটা শর্ত ছিল- ব্রিটেনের বিজ্ঞানচর্চায় সেই বিজ্ঞানীর অবদান থাকতে হবে। ব্রিটেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এরই মধ্যে প্রাথমিক যে তালিকা প্রকাশ করেছে, এতে জগদীশচন্দ্রের নামও রয়েছে। রয়েছেন আরও প্রথিতযশা বিজ্ঞানী- স্টিফেন হকিং, গ্রাহাম বেল, অ্যালান টিউরিং, অ্যাডা লাভলেসসহ অনেক খ্যাতনামা। নিজ জন্মভূমিতেই এখন পর্যন্ত এমন সম্মাননা তিনি পাননি। আমরা মনে করি, 'ব্রিটেনের নোটে তার ছবি এলে এটা হবে গর্বের বিষয়। তবে এমন সম্মাননা প্রদান আমাদের দেশ থেকেই সূচিত হতে পারে, যা হবে সত্যিকারের গর্ব। শ্রেষ্ঠ নয়, সবার একজন হয়ে ওঠা এই বিজ্ঞানীর প্রতি রইল অসীম শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা।
বিজ্ঞান বক্তা