উপকূলীয় ভোলার ভেলুমিয়া গ্রামে জন্ম সানজিদা আক্তারের। শৈশব থেকে অভাবী সংসারে বেড়ে ওঠা। জন্মের কয়েক বছর পরই হারান বাবাকে। তারপর মাকে নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে কাটছিল জীবন। সেই ছোট্ট সানজিদার বয়স এখন ২৮ ছুঁই ছুঁই। দিন যত যাচ্ছে সানজিদার বিয়ে নিয়ে মায়ের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। স্বপ্ন ছিল সুখের একটা সংসার হবে। অবশেষে সেই স্বপ্ন ধরা দিয়েছে বাস্তবে। শৈশব-কৈশরের আঙ্গিনা ছেড়ে নতুন জীবন শুরু করেছেন সানজিদা।

শুধু সানজিদা নয় স্বপ্নের উঠোনে রঙ্গিন ক্যাম্পাসে পা দিয়েছে ৩৪টি এতিম জীবন। জীবনের নতুন মোড় ঘুরে গেছে তাদের। সানজিদাদের বিয়ে উপলক্ষে শনিবার দুপুরে রঙ্গিন সাজে সাজানো হয়েছে রাজধানীর পান্থপথের কমিউনিটি সেন্টার। ঢাকাস্থ ভোলা সমিতি এতিম মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করেছে।

কারও বাবা নেই, কারও মা নেই। আবার কারও মা-বাবা দুজনই নেই। আবার থাকলেও তাদের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে, এই সমাজে একটি মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য নেই। ঘটা করে বিয়ে দেওয়া তো স্বপ্নের মতো। ভোলা সমিতি এমন মেয়েদের জন্য নাকফুল, গয়না, শাড়ি, জুতা, হাতের ব্যাগ থেকে শুরু করে সবকিছুই কিনেছে। বরদের জন্য শেরোয়ানি, পায়জামাসহ যা কিছু লেগেছে, তা-ও কেনা হয়েছে। সে এক এলাহী কাণ্ড। ফুল, লাল ও হলুদ রংয়ের কাপড় দিয়ে মঞ্চ সাজানো হয়। বিয়ে উপলক্ষে সকাল থেকে ভোলা সমিতির সদস্যদের দম ফেলারও ফুরসত নেই। দুপুর দুইটার দিকে ৩৪ জন বর-কনে সানাই-বাধ্য বাজিয়ে এলেন ঘোড়ায় ছড়ে। বর-কনে আসার সঙ্গে সঙ্গে ফুল ছিটানোসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার পালা শুরু হয়।

কমিউনিট সেন্টারে প্রবেশ করেই একই মঞ্চে ১৭ জন কনে, ১৭ জন বর বসলেন। একই রকম সাজ। এ সময় বিয়ে বাড়িতে ছবি তোলা, হৈচৈ, খাওয়া-দাওয়া, আড্ডার কোনো কমতি ছিল না। বর-কনেদের জন্য উপহারের ঢালি সাজিয়েছেন অনেকে। মেহমান এসেছেন, তাও ৫ শতাধিক। দাওয়াত দিয়ে খাওয়া হয়েছে পান্থপথের একটি এতিম খানার শিশুদেরও। খাবারের আয়োজনের মধ্যে ছিল পোলাও, রোস্ট, রেজালা, সবজি, বোরহানি, জর্দা। খাবার টেবিলগুলোতে ভোলা সমিতির কর্মকর্তারা নিজেরা তদারকি করছিলেন।

এরপর বিকেল ৩টার দিকে কাবিন শেষে করে মেয়েদের স্বামীর হাতে তুলে দেন ঢাকাস্থ ভোলা সমিতির নেতারা। পড়ন্ত বিকেলে বর-কনেদের চোখেমুখে নতুন জীবনের স্বপ্ন। একই সঙ্গে পরিবার ছেড়ে চলে যাচ্ছে বলে কনের চোখ ছিল ছলছল। ভেজা চোখেই কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি আয়োজকদের প্রতি, চেয়েছেন দোয়া। এ সময় সবার প্রার্থনাজুড়ে ছিলে ৩৪ বর-কনের সোনালী আগামীর প্রত্যাশা।

ঢাকাস্থ ভোলা সমিতির সভাপতি মো. মাকসুদ হেলালী সমকালকে বলেন, ২০১৯ সালেও তারা ২৪ জন ছেলে-মেয়েকে একসঙ্গে যৌতুকবিহীন বিয়ে দিয়েছেন। বিয়ের পর কর্মসংস্থানের জন্য তাদের অর্থনৈতিক সহায়তাও দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের কল্যাণ তহবিল ও বিভিন্ন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের অনুদান দিয়েই মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হয়। অনেকে এই মেয়েদের জন্য খরচ করার বিষয়টিকে ভালো কাজ হিসেবেই দেখেন। বিয়ের পরও এই মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়।

ভোলা সমতির সাধারণ সম্পাদক মো. সহিদুল হক মুকুল বলেন, আমরা নিজের ছেলে-মেয়ের মতোই ওদের মহা ধুমধামে বিয়ে দিয়েছি। তাদের যেন মনে না হয়, এতিম বলে যেনতেনভাবে ওদের বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। যাদের বিয়ে দিয়েছি, তারা আমদের ছেলে-মেয়ে। তাই কেনাকাটাসহ সবকিছু যাতে নিখুঁত হয়, তা দেখা হয়েছে। তিনি বলেন, গ্রামে কন্যাদায়গ্রস্ত বাবা-মায়ের কষ্টের শেষ নেই। এতিম হলে তো বিয়েই হয় না। আবার যৌতুকের কারণেও অনেকের বিয়ে হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এমন কন্যাদের বিয়ে দিতে সবার সহায়তার হাত বাড়ানো উচিত।