৬ ফেব্রুয়ারি, রোববার প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী লতা মঙ্গেশকর মহাসিন্ধুর ওপারে চিরঅনন্তের পথে যাত্রা করলেন। বাংলা ও হিন্দি গানের গৌরবময় ইতিহাসের স্বর্ণালি অধ্যায় অনেক গায়ক-গায়িকার আগমনে উজ্জ্বল হয়েছে। অনেকের ভিড়ে লতা মঙ্গেশকর একেবারেই স্বতন্ত্র। বাংলা, হিন্দি, মারাঠিসহ ছত্রিশটিরও বেশি ভাষায় গেয়েছেন তিনি। সাত দশকের বেশি সময়জুড়ে তার গাওয়া অগণিত ক্ল্যাসিকাল, গজল, ভজন, আধুনিক ও সিনেমার গান আজও সমান জনপ্রিয়। তার গান কয়েক প্রজন্মের বেড়ে ওঠার সঙ্গী। লতা মঙ্গেশকর সংগীতের ইতিহাসে অমোচনীয় এক নাম। বরেণ্য সংগীত ব্যক্তিত্ব্বের প্রতি নন্দনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

লতা মঙ্গেশকর এমন একটি নাম, যেটি চিরচেনা এক অবয়ব ধরে রেখেছে। এই নাম বললেই এক সুরসম্রাজ্ঞীর অনেক কিছু বলা হয়ে যায়। লতা ও সংগীত- একটি যোগ, যা কখনও আলাদা করা যায় না। উপমহাদেশের সংগীত বললেই যে শিল্পীর নাম সবার আগে চলে আসে, তিনি লতা মঙ্গেশকর। এমন ক্ষণজন্মা শিল্পী শতবর্ষে একজনের বেশি জন্ম নেয় না। যার অনিন্দ্য কণ্ঠ আর অনবদ্য গায়কি বিশ্বের অগণিত মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল। তার মহাপ্রয়াণ মনে আঁচড় কাটবে- এটাই স্বাভাবিক। মনে বিষাদ ভর করার আরেকটি কারণ নতুন আর কোনো আয়োজনে শতাব্দীর প্রিয় স্বর শোনার সুযোগ হবে না।
গত কয়েক দশকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম লতা মঙ্গেশকরের গান শুনে বেড়ে উঠেছে। তার গান যুগ যুগ ধরে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে সংগীতভুবনে পথচলার। কৈশোর-তারুণ্যে তার গান আমাদের মুখে মুখে থাকত। ঘরে কিংবা বাইরে, পথে-প্রান্তরে আমরা তার গান গুন গুন করে গাইতাম। অবাক হয়েছি, তার বাংলা গানের অনবদ্য পরিবেশনায়। বাঙালি না হয়েও কেউ এমন অনবদ্যভাবে বাংলা গান গাইতে পারে- তা ছিল ভাবনার অতীত। এ শুধু লতা মঙ্গেশকর বলেই সম্ভব হয়েছে। শুধু বাংলা বা হিন্দি নয়, মারাঠি, গুজরাটি, মালায়ালামসহ ৩৬টি ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি। যা শুনলে মনে হয়, প্রতিটি ভাষা তিনি দারুণভাবে রপ্ত করেছেন। গান গাওয়ার জন্য ভাষা কোনো বাধা হতে পারে না- এটাই তিনি প্রমাণ করে গেছেন। এমন একজন শিল্পীর সঙ্গে সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা অনেক দিন থেকেই ছিল। বোম্বে [মুম্বাই] গিয়ে অনুষ্ঠান করার সুযোগও হয়েছে আমার। কিন্তু দুর্ভাগ্য লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। এই আফসোস থেকেই গেছে।

লতা মঙ্গেশকরের গান যেমন মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে, তেমনি একটি কৌতূহলী প্রশ্ন তুলে আনে সামনে- একজন মানুষ কীভাবে সংগীতের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যেতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, তার জীবনও কম ঘটনাবহুল নয়, যার প্রতিটি ধাপে কিছু না কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে তার। লতার বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন মারাঠি নাট্যসংগীতের একজন শিল্পী। যিনি মারাঠি মঞ্চের সুপারস্টার বাল গান্ধর্বের সুযোগ্য উত্তরসূরি। সেই ধ্রুপদি গান আর নাট্যসংগীতের ছায়ায় লতার বেড়ে ওঠা। তার মা সেবন্তী ছিলেন গুজরাটি। যে কারণে মারাঠি ও গুজরাটি ভাষা ও সংস্কৃতি শৈশবেই আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন লতা। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই ধ্রুপদি সংগীতের তালিম নেওয়া শুরু হয়েছিল লতার। মূলত তখন থেকেই তার শিল্পীজীবনের ভিত গড়ে উঠতে শুরু করে। দীননাথের পর আমানত খান, আমান আলি খানের মতো খ্যাতিমান সংগীত গুরুর স্নেহছায়ায় সংগীতের তালিম নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল লতার। কিন্তু এই গানের সূত্র ধরেই জীবনের বাকি অধ্যায় রচিত হবে- সেটা হয়তো লতা নিজেও কল্পনা করেননি। নিয়তি হয়তো তাকে টেনে এনেছে সুরের এই পথে। নইলে কেন মাত্র তেরো বছর বয়সে বাবাকে হারাবেন লতা, কেনই বা এত অল্প বয়সে পরিবারের দায়দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে তাকে? এমন প্রশ্ন সামনে এসেই যায়। কিন্তু লতা মঙ্গেশকর যে কোনোভাবেই ভেঙে পড়ার মানুষ নন- তার প্রমাণ কৈশোরেই দিয়েছেন। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে ছোট চার ভাইবোন মীনা, আশা, ঊষা আর হৃদয়নাথকে নিয়ে জীবন সংগ্রামে নেমে পড়তে পিছপা হননি তিনি। নিজ নিবাস পুনে ছেড়ে সবাইকে নিয়ে চলে এসেছেন বোম্বে শহরে। এই বোম্বে শহরকে ঘিরেই রচিত হয়েছে তার শিল্পীজীবনের বড় অধ্যায়।

একজন শিল্পী সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মহিরুহ হয়ে ওঠে, তা স্পষ্ট হয় লতা মঙ্গেশকরের জীবনের অধ্যায়গুলোয় নজর দিলে। বাবা দীননাথ মঙ্গেশকরের মৃত্যুর পর অর্থনৈতিক সংকটে পড়া, পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া, পুনে ছেড়ে বোম্বে আসা- সবই ঘটেছে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে। এর পরের ঘটনা আরও বিস্ময়কর। যে লতার অভিনয় করতে ভালো লাগত না, সেই লতাকেই জীবিকার জন্য অভিনয় করতে হয়েছে। লতা মঙ্গেশকর এক সাক্ষাৎকারে সে কথাও জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, 'পরিবারের কারণে অভিনয় দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম। কিন্তু অভিনয় করা আমার পছন্দ ছিল না। মুখে মেকআপ করা, ক্যামেরার সামনে হাসি, কান্না, এগুলোর কোনোটাই আমি পছন্দ করতাম না। একমাত্র গানেই আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম।' তবে সেই গান গাওয়ার সুযোগ পেতেও খুব একটা সময় লাগেনি। তখন টকিজে অভিনয় করতে গেলে অভিনয়ের পাশাপাশি গানও গাইতে হতো। সেটা করতে গিয়েই আবিস্কার হয়, তার অনিন্দ্য কণ্ঠস্বরের। তাই চল্লিশের দশকেই লতার অভিজ্ঞতা মারাঠি সিনেমায় গান গাওয়ার। সেই যে শুরু, তারপর আর থেমে থাকার সুযোগ হয়নি। গানের ভুবনে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ পথ।

লতা মঙ্গেশকরের জীবনের প্রথম ভাগে যে সংগ্রামের চিত্র আমরা দেখি, সেখান থেকেই একটা বিষয় স্পষ্ট হয়, তিনি যে কাজটি করেছেন, সেখানে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার চেষ্টা ছিল। ছিল শেখার একটা তাগিদ। যদিও তিনি অভিনয় করা পছন্দ করতেন না; কিন্তু সেই অভিনয়ের সূত্র ধরেই তার গানের ভুবনে আসা। কাজের সূত্রেই বহু জাতির দেশ ভারতের নানা ভাষাভাষীর মানুষের কাছাকাছি যাওয়া, তাদের ভাষা-সংস্কৃতি আয়ত্তে আনার চেষ্টা। এমন চেষ্টা অনেকের হয়তো থাকে; কিন্তু সবাই সফল হতে পারে না। কারণ কিছু গুণ থাকে ঈশ্বরপ্রদত্ত, যা ছিল লতা মঙ্গেশকরের। তার কণ্ঠ, অনবদ্য গায়কি, সংগীতপ্রেম, কাজের প্রতি নিষ্ঠা আর মানের বিচার-বিশ্নেষণ তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে দিয়েছে।

সংগীতজীবনে কঠোর শৃঙ্খলা মেনে চলতেন লতা মঙ্গেশকর। এমনকি জনপ্রিয়তা পুঁজি করে যে কোনো গান গাওয়ার বিষয়েও তার আপত্তি ছিল। অনেক বড় মাপের সুরকারকে তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন গানের কথা-সুর মনকে নাড়া দেয়নি বলে। নিজে যেমন সেরা গায়কি তুলে ধরার বিষয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন, তেমনি এমন কিছু গাইতেন না যেটা করতে তার মন সায় দিত না। সবসময় নিখুঁত কিছু করার প্রচেষ্টা ছিল তার মধ্যে। তাই তো কখনও তার সুরে বিচ্যুতি ঘটেনি। ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলি খানও তার গান শুনে বলেছিলেন, 'এই কী গায়, এতটুকু বেসুরো হয় না কখনও, এও সম্ভব! বড়ে গুলাম আলির মতো খ্যাতিমান ওস্তাদও যখন লতা মঙ্গেশকর সম্পর্কে এমন কথা বলেন, তখন লতার মতো শিল্পীকে নিয়ে আর কোনো মন্তব্য চলে না। একই সঙ্গে অবাক হওয়ার কিছু থাকে না যখন আমরা শুনি সাড়ে সাত হাজারের বেশি ছবির গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। ৩৬টি ভাষায় গান গেয়ে মুগ্ধ করেছেন বিশ্বের অগণিত সংগীতপিপাসুকে।

পুরুষশাষিত সমাজে একাই লড়াই চালিয়ে গেছেন লতা মঙ্গেশকর। ঘর-সংসার সাজানো তার হয়ে ওঠেনি। তাই অবাক হয়ে ভাবি, একাকী কীভাবে ৯ দশকের দীর্ঘ জীবন বয়ে নিয়ে গেছেন তিনি? অবশ্য আমরা যারা গানের ভুবনের মানুষ, তারা জানি সংগীত যখন শোনিত ধারায় মিশে যায়- তখন বেঁচে থাকার জন্য বাড়তি রসদের প্রয়োজন পড়ে না। লতাও হয়তো সংগীতের মাঝে বেঁচে থাকার সব রসদ খুঁজে নিয়েছিলেন। তাই দীর্ঘ জীবন গান ছাড়া আর কোনো বিষয় নিয়ে ধ্যানমগ্ন হননি। সংগীতের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর নিষ্ঠায় তিনি হয়ে উঠেছেন সর্বকালের সেরা শিল্পীর একজন। তাই লতা মঙ্গেশকরকে হারিয়ে বিশ্বসংগীত আজ অনেকটাই নিঃস্ব।