লতা মঙ্গেশকর প্রথম প্লেব্যাকে গেয়েছিলেন ১৯৪২ সালে। ২০১৭ সালে প্লেব্যাকে সিংগিং ইতিহাসে অবিশ্বাস্য ৭৫ বছর পূর্ণ হয় তার। সেই উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সংবাদমাধ্যম 'সংবাদ প্রতিদিন' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার বিশেষ সাক্ষাৎকার। গানের কোকিলের সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ...

পঁচাত্তর বছর একটানা... কী করে সম্ভব?
[মৃদু হাসি] সবই ঈশ্বরের কৃপা। যা পেয়েছি সব তারই দান।

কী বলছেন? ঈশ্বর বর দিলেও কেউ পঁচাত্তর বছর ধরে একই কণ্ঠে একই বিষয়ের ওপর এমন আপ্রাণ আবদ্ধ থাকতে পারে নাকি? সে তো বিরক্ত হতে হতে পাগল হয়ে যাবে...
আমার কখনও হয়নি। সংগীতের প্রথম দিন থেকে আজও পুরোটাই উপভোগ করেছি। গান গাওয়া আমার কাছে এমন আনন্দের ঝরনা, যা কখনও বিরক্তি এনে দেয়নি। আমি গান ছাড়া কোনো কিছু শিখিওনি। বছরের তিনশ পঁয়ষট্টি দিনের চব্বিশ ঘণ্টা গান নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকি। সারাক্ষণ ভাবি, কী করে আরও ভালো গাইতে পারি?

একটা বিষয়ের ওপর মানুষ ২০ থেকে ২৫ বছর মনোসংযোগ ধরে রাখতে পারে না। সেখানে ৭৫ বছর ধরে একভাবে ধরে রেখেছেন...
এটা সত্যি যে, আমি যখন গাইতে শুরু করি, তখন অন্য কিছুর খেয়াল থাকে না। যখন শুরু করেছিলাম তখন আর কিছুই খেয়াল করিনি। পয়সা পাব কিনা ভাবিনি। তখন প্লেব্যাক করে বেশি টাকাও পাওয়া যেত না। তিনশ থেকে চারশ টাকা গানপ্রতি পেতাম।

আপনার গান মানে অদ্ভুত ভালো লাগা। অদ্ভুত ফ্রেশনেস। লতা মঙ্গেশকরের যে কোনো গান মানে যেন তাজা!
ঠিক কথা বলেছেন। ফ্রেশনেস। গলায় সবসময় ফ্রেশনেস থাকতেই হবে। সবসময় থাকতে হবে। আমার জীবনে এমন হয়েছে যে, ভর্তি রেকর্ডিংয়ের শিডিউল। অথচ হঠাৎ করে আমার সাইনাসের প্রবলেম। আমি দ্রুত বলেছি, সব ক্যানসেল করেছি। প্লিজ কিছু মনে করবেন না। আপনারা অন্য কাউকে দিয়ে প্লেব্যাক করিয়ে নিন। তারা অবাক হয়ে বলেছেন, আপনার তো সাইনাসের প্রবলেম। তার জন্য সব ক্যানসেল করছেন কি? আমি অনড় থেকেছি, কোয়ালিটির সঙ্গে কখনও কম্প্রোমাইজ করতে চাইনি। সাইনাসের সামান্য সমস্যাও গলাকে আক্রান্ত করতে পারে। তাজা ভাবটা তখন থাকবে না। সেই ঝুঁকি আমি নেব না। ঈশ্বর জানেন, কোনোদিন নিইনি।

পঁচাত্তর বছর দৌড়ে যাওয়ার জন্য কী পরিমাণ শৃঙ্খলা লাগে আন্দাজ করাই যায়। একটু বলবেন গলার শৃঙ্খলায় কী লাগে? মানে কী কী খেতে হয়?
সত্যি বলতে কি, আমি যে খাবার-দাবারের ব্যাপারে দারুণ ডিসিপ্লিন দেখিয়েছি, তা কিন্তু নয়। মারাঠি মেয়ে আমি, আচার খেতাম। টক চাটনি খেতাম, তারপর হরি মির্চি খেতে ভালোবাসি। বাংলায় যাকে বলে কাঁচামরিচ। তেতো খেতাম। তারপর একটা সময় মনে হলো বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। তখন তেতো খাওয়া ছেড়ে দিলাম। খাবার নিয়ে আমি অনেক এক্সপেরিমেন্ট করেছি। আমি বলব ঈশ্বর খুব দয়ালু। তিনি আমাকে কৃপা করেছেন। রেওয়াজ না করলে গাইতেই পারবে না, আমি এমন কিছু অনুভব করিনি।

অবিশ্বাস্য। খাওয়া-দাওয়ার নিয়ম মানেননি। তারপরও এত লম্বা সময় ধরে নিজেকে ঠিক রেখেছেন কী করে?
আগেই বলেছি। সব ঈশ্বরের কৃপায়। নইলে অনিয়ম কি আর কম হয়েছে? হেমন্তদার [হেমন্ত মুখোপাধ্যায়] বাড়িতে গেলে তিনি দারুণ সুস্বাদু সব খাবার খাওয়াতেন। কিন্তু আমার লোভের মাছটাই থাকত সরষেতে। কখনও সরষে ইলিশ, কখনও সরষে তেলাপিয়া। আমি ইতস্তত করতাম- সব খাওয়া ঠিক হবে কিনা। হেমন্তদা এক ধমক লাগিয়ে বলতেন 'লতা খাও খাও'।

সলিল চৌধুরীও আপনাকে খুব পছন্দ করতেন?
খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু একটাই সমস্যা ছিল। সলিলদা আমার সঙ্গে শুধু পরিস্কার বাংলা বলতেন না। তিনি চাইতেন আমি যাতে বাংলাতেই উত্তর দিই। সলিলদা অনড় থেকে বলতেন- 'তুমি বাংলা বলতে থাক। ও ঠিক এসে যাবে' [হাসি]।

তখন তো আপনাকে ঘিরে রয়েছে বাঙালিরা। কিশোর কুমার, মান্না দে...
মান্নাদাও মজা করতেন। মান্নাদার একটা ক্লাসিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল বলে তার সঙ্গে প্লেব্যাক প্রিপারেশনটা ছিল অন্যরকমের। তিনি নোটেশন করে আনতেন। মান্নাদার পুরো বিষয়টার মধ্যে অদ্ভুত রকমের শুদ্ধতা ছিল। আমার সঙ্গে তার খুব জমত।

আর কিশোর কুমার...
কিশোরদা! উব্বিশ। কিশোরদা ছিলেন লাইভ এন্টারটেইমেন্ট। কী হুল্লোড়ে মানুষ ছিলেন ভাবাই যায় না। সারাক্ষণ হাসাতেন। তার সঙ্গে প্লেব্যাক করতে গেলে গান গাইব কী, হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যেত।

মোহাম্মদ রফিও এরকম ছিলেন?
না। রফিভাই খুব শান্ত মানুষ ছিলেন। রেকর্ডিংয়ের আগে বেশি কথা বলতেন না। চুপচাপ থাকতেন। আমি দেখতাম গানের ওপর থেকে তার নজর কখনও সরছে না। কিন্তু আড্ডা হলে সবাই বেশ মাস্তি করতাম।

আপনার গানের লিপসিং অনেক অভিনেত্রী করছেন। এদের মধ্য থেকে সেরা কারা?
আমার গানে লিপ ভালো দিয়েছে অনেকেই। নার্গিস খুব ভালো ছিল। মধুবালা, ওয়াহিদা, রেখা, কাজল, রানী। কিন্তু তাদের চেয়ে ভালো মীনা কুমারী, নূতন আর মাধুরী। কারণ তারা প্রত্যেকেই নিজেরা ভালো গাইতে পারে। নূতন নিজে ছবিতে গেয়েছে। মাধুরী ছবিতে না গাইলেও ওর গলা মঞ্চে গাইবার মতো। তাই তো মাধুরী যখন দিদি তেরা দেবর দিওয়ানা গানে লিপ দেয়, তখন তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।