'এটা কেমন কথা! আমাদের গান যে কেউ গাইবে, আবার তা বাণিজ্যিকভাবে প্রকাশ করবে; অথচ গানের মূল স্রষ্টা যারা, সেইসব গীতিকার, সুরকার, শিল্পী কারও অনুমতি নেবে না- এটা মেনে নেওয়া যায় না।' জীবদ্দশায় সিনেমার গানের রিমেক নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে এ কথাই বলেছিলেন বরেণ্য সংগীতস্রষ্টা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। একই বিষয় নিয়ে নব্বইয়ের দশকে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন শিল্পী আবদুল জব্বার, এন্ড্রু কিশোর, সুবীর নন্দী, খুরশীদ আলমসহ বরেণ্য গীতিকবি, সুরকারসহ অনেকেই। তারপরও সিনেমার গানের রিমেক ও রিমিক্স করা থেমে থাকেনি। বরং ধারাবাহিকভাবে রিমিক্স ও রিমেক গানের প্রকাশ চলছেই।

জনপ্রিয় গান রিমেক করার কেন এই প্রবণতা? সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে, তাহলো- কিছু গানের আবেদন যুগ যুগ ধরে রয়ে গেছে। যার সুর-মূর্ছনা অনুরণন তুলে যাচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। সিনেমার গান তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সময়ের পালাবদলে সংগীতায়োজনেও এসেছে নতুনত্ব। যে জন্য পুরোনো গান নতুন সংগীতায়োজনে আবার শ্রোতার কাছে তুলে ধরার এই প্রচেষ্টা। মূল গানের সঙ্গে নতুন সংগীতের মিশ্রণ অর্থাৎ রিমিক্স করা হচ্ছে, নয়তো নতুন রেকর্ড রিমেক করা হচ্ছে জনপ্রিয় সব সিনেমার গান। বিশ্বজুড়ে এই প্রবণতা শুরু হয়েছিল আশির দশকের শেষ প্রান্তে। নব্বইয়ের দশকে তা জোয়ার বয়ে এনেছিল বিশ্বের নানা দেশে। এদেশেও সিনেমার গানের রিমিক্স ও রিমেক করা শুরু হয় নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি। পার্থ বড়ূয়ার সংগীতায়োজনে 'বায়োস্কোপ' নামের মিশ্র অ্যালবাম দিয়ে এর সূচনা।

'আমার গরুর গাড়িতে', 'চঞ্চলা মেঘ', 'সাগরের তীর থেকে'সহ এই অ্যালবামের প্রতিটি রিমিক্স গান শ্রোতার মাঝে দারুণ সাড়া জাগিয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় পরে 'বায়োস্কোপ-২' নামে আরেকটি অ্যালবাম প্রকাশ করা হয়। এর পরপরই মূলত জোয়ার শুরু হয় রিমিক্স ও রিমেক গানের অ্যালবাম প্রকাশের। 'সিনেমা', 'সিনেমা-২', 'চুমকী চলেছে একা', 'চুমকী-২', 'মিস লংকা', 'বাঁশিওয়ালা'সহ শতাধিক অ্যালবাম প্রকাশ করা হয় স্বল্প সময়ের ব্যবধানে। ক্যাসেট-সিডির যুগে শুধু অ্যালবাম নয়; বিভিন্ন বিজ্ঞাপন এমনকি নাটকেও সিনেমার গানের রিমেক করতে দেখা গেছে। গানের মূল শিল্পীদের অনেকে বিষয়টা মেনে নিতে না পারায়, পরবর্তীকালে নিজেরাই তাদের জনপ্রিয় গানগুলো রিমেক করেছেন। এর মধ্যে আবদুল জব্বারের 'ওরে নীল দরিয়া', সৈয়দ আবদুল হাদীর 'একবার যদি কেউ', এন্ড্রু কিশোরের 'ফিরে ফিরে আসি', 'আবার ফিরে এলাম', সাবিনা ইয়াসমিনের 'এই মন তোমাকে দিলাম', 'অশ্রু দিয়ে লেখা', সুবীর নন্দীর 'প্রেম বলে কিছু নেই', 'বন্ধু হতে চেয়ে তোমার', শাম্মী আখতারের 'ঢাকার শহর আইসা', খুরশীদ আলমের 'চুরি করেছ আমার মনটা'সহ বেশ কিছু রিমেক অ্যালবাম শ্রোতার কাছে নতুন করে আলোড়ন তুলেছিল। তারপরও তরুণ শিল্পী ও সংগীতায়োজকরা থেমে থাকেননি। একের পর এক রিমেক গানের আয়োজন ধারাবাহিকভাবে চলে এসেছে।


সাম্প্রতিক সময়ে রিমেক গান একক ও দ্বৈত কণ্ঠে রেকর্ড করে ভিডিও হিসেবে প্রকাশ করার প্রবণতা বেড়ে গেছে। পাশাপাশি নাটক, সিনেমাতেও পুরোনো গানের রিমেক করা হচ্ছে। সিনেমার গানের বেশ কিছু রিমেকে কণ্ঠ দিয়ে শ্রোতার প্রশংসা কুড়িয়েছেন শিল্পী ইমরান। তার গাওয়া ও নতুন সংগীতায়োজনের 'তুমি আমার জীবন', 'হৃদয়ের আয়না', 'তুমি চাঁদের জোছনা নও', 'আমার মনের আকাশে আজ জ্বলে শুকতারা', 'অনেক সাধনার পরে', 'পৃথিবীতে সুখ বলে যদি'সহ অন্যান্য গান শ্রোতার মনে ছাপ ফেলেছে। একইভাবে তরুণ দুই শিল্পী হাসান এস ইকবাল ও দৃষ্টি আনামের গাওয়া বাংলা সিনেমার বেশ কিছু রিমেক গান শ্রোতার মাঝে সাড়া ফেলেছে। সম্প্রতি নন্দিত কণ্ঠশিল্পী ন্যান্সি সিনেমার বেশ কিছু জনপ্রিয় গানের রিমেকে কণ্ঠ দিয়েছেন। শুধু একক গান হিসেবে প্রকাশ নয়; সিনেমাতেও রিমেক গানের ব্যবহার চোখে পড়ছে। ১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া 'অবুঝ হৃদয়' ছবির 'তুমি আমার জীবন' জনপ্রিয় গানটি রিমেক করা হয়েছে 'বীর'-এর জন্য। ১৯৯৯ সালের 'ভালোবাসি তোমাকে' ছবির 'অনেক সাধনার পরে' গানের রিমেক রাখা হয়েছে 'নিয়তি' ছবিতে।

অন্যদিকে 'গ্যাংস্টার' ছবিতে ব্যবহূত হয়েছে 'হৃদয়ের আয়না' ছবির জনপ্রিয় গানের রিমেক। নাটকেও এ বিষয়টি থেমে থাকেনি। এর মধ্যে 'শিল্পী' নাটকের জন্য রিমেক করা 'বাস্তব' ছবির 'বুক চিন চিন করছে' হায় গানটি রীতিমতো আলোড়ন তুলেছে। এমন আরও অনেক গান আছে যেগুলো রিমিক্স বা রিমেক করে নাটক, সিনেমায় রাখা হয়েছে। এতে গানের মূল শিল্পী ও স্রষ্টারা বিভিন্ন সময় প্রশ্ন তুললেও রিমেক থেমে থাকেনি। এর কারণ কী? সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনুপম রেকর্ড, সাউন্ডটেক, সংগীতা, জি-সিরিজ, লেজার ভিশন, সিএমভিসহ বেশ কিছু অডিও-ভিডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়। তাদের কথা থেকে জানা যায়, 'সিনেমার গানের স্বত্বাধিকারী মূলত সিনেমার প্রযোজক। তারাই নির্ধারণ করেন, গান কীভাবে প্রকাশ করা হবে। আর জনপ্রিয় গান যখন রিমেক করা হয়, তখন গানের মূল শিল্পী, গীতিকার, সুরকার বা সংগীত পরিচালক কোনো স্বত্ব দাবি করতে পারেন না। তাদের এই কথা থেকে বোঝা যায়, মূলত স্বত্বাধিকারী না হওয়ার কারণেই মূল গানের শিল্পী, গীতিকার ও সুরকাররা তাদের গান রিমেক হওয়া নিয়ে কোনো প্রকার আইনি বাধা দিতে পারছেন না।

তারপরও যে বিষয়টি চোখে পড়ে সেটা হলো, সিনেমার গানের মূল শিল্পী ও সুরকারদের অনুমতি না নিয়ে একের পর এক গান রিমেক করা। অনেক শিল্পী ও সুরকার দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, তাদের গান অনেকে রিমেক করছেন। কিন্তু তারা গানের মূল শিল্পী, গীতিকার, সুরকারদের অনুমতি নিচ্ছেন না। আবার কেউ কেউ গানের মূল স্রষ্টাদের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করেননি। কেউ ভালো লাগা থেকে কোনো গান গাইলে তা নিয়ে শিল্পী বা সংগীত স্রষ্টাদের আপত্তি নেই। কিন্তু যখন তা বাণিজ্যিকভাবে প্রকাশ পাচ্ছে, তখন এ বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করা দরকার।

সিনেমার জনপ্রিয় গানের মূল শিল্পী ও সুরকারদের এই দাবি অযৌক্তিক নয় বলে অনেকে মনে করেন। তবে যারা নিয়মিত রিমেক গান গাইছেন, তারাও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশকদের দৃষ্টি দেওয়ার কথা বলেছেন। তবে রিমেক নিয়ে তরুণ শিল্পীদের কথা হলো- এটা সময়ের দাবি। কিছু গানের আবেদন যুগ যুগ ধরেই ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যখন সংগীতের ধরন বদলে গেছে, তখন তা নতুন সংগীতায়োজনে গাওয়া দোষের নয়। দুই প্রজন্মের শিল্পী ও সংগীতায়োজকদের সঙ্গে কথা বলার পর, যে বিষয়টা স্পষ্ট, তাহলো- রিমেক করতে গিয়ে কোনো গানের মূল কথা ও সুর যেন বিকৃত না হয় সেদিকে সবারই খেয়াল রাখা উচিত। কারণ, সেই গানই রিমেক বা রিমিক্স করা হয়, যা দীর্ঘদিন ধরে শ্রোতার মনে অনুরণন তুলে আসছে। তাই রিমেক গানেও থাকতে হবে শৈল্পিক ছোঁয়া।