ঝাঁ চকচকে পর্দার আড়ালে কত কী ঘটে! দর্শক যখন সংখ্যা হয়ে গেল, মান তখন কোথায় হারাল? টিকটক দোলানো, ফেসবুক মাতানো ফিগার ও ছলাকলার আড়ালে অভিনয়কলা কি মূল্য হারাল? তা কি সত্যিই হয়? জহুরি ঠিকই খুঁজে নিতে পারে তার আসল জহর। সে গুণেই এখনও সত্যিকার অভিনয়শিল্পীরা কাজ করে যেতে পারছেন গল্পের সঠিক নির্মাণের প্রয়োজনে। তবে, সেসব কাজ যে সংখ্যায় খুব নগণ্য! তা দিয়ে কি একজন পেশাদার অভিনয়শিল্পীর জীবিকার প্রয়োজন মেটে? এমন হতাশাই ঘিরে ধরেছিল অভিনেত্রী দীপান্বিতা মার্টিনকে। তবে নিজের চরিত্রকে এমনভাবে গড়ে তুলেছেন, যেখানে হেরে যাওয়া বলে কিছু নেই। দীপান্বিতা হারেননি বরং জিতেছেন বহুগুণে। এবারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে 'গোর' সিনেমার সেরা অভিনেত্রীর সম্মান অর্জনেরও আগে তিনি অর্জন করেছেন দেশের গুণী অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতাদের মন। কেননা, তিনি অটল ছিলেন তার আত্মবিশ্বাস, পারঙ্গমতা আর অভিনয়ের প্রতি দুর্দমনীয় ভালোবাসায়। নিয়মিত অভিনয় করতে না পারা, সঠিক চরিত্র খুঁজে না পাওয়ার বেদনা তাকে কুরে কুরে খেয়েছে। কিন্তু থেমে যাননি। গা ভাসাননি যে কোনো প্রবাহে, প্রলোভনে। অপেক্ষা করেছেন।

ছোট পর্দার হালফিল মন্দা। দীপান্বিতা চোখ ফেরালেন বড় পর্দায়। চোখ বেঁধে লক্ষ্য স্থির করে এগোলেন। পথে পথে চরিত্রও কুড়িয়ে পেলেন মনমতো বেশ কিছু। মাত্র পাঁচ বছরের চলচ্চিত্রের ক্যারিয়ারে দীপান্বিতার ঝুলিতে জমেছে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র।

তবে বড় পর্দায় তার মুক্তি পাওয়া প্রথম চলচ্চিত্র গাজী রাকায়েতের 'গোর'। দুঃখের বিষয়, অস্কারের মতো আসরে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করলেও দেশের পর্দায় সিনেপ্লেক্স ছাড়া জোটেনি প্রেক্ষাগৃহ। সর্বশেষ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সর্বাধিক পুরস্কার বিজয়ের মধ্য দিয়ে দেশীয় স্বীকৃতি অর্জন করল সিনেমাটি। এতে প্রমাণিত হলো- দীপান্বিতা বলে কেউ আছেন, যার অভিনয়শক্তি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিযোগ্য। দীপান্বিতা বলেন, 'সত্যিই অনেক বড় পাওয়া। কখনও ভাবিনি, পুরস্কার পাব বা পাওয়ার কথা ভেবে কাজও করিনি। এখন মনে হচ্ছে, দায়িত্বটা সত্যিই বেড়ে গেল। সবাই এখন হয়তো আরও বেশি মনোযোগী হয়ে আমার কাজগুলো দেখবেন। ভুল করার সুযোগ নেই।' দীপান্বিতা জানান, চলচ্চিত্রের নতুন যাত্রা শুরুর আগে তার প্রথম চলচ্চিত্র বেলাল আহমেদের 'মাটির জাহাজ'। ২০০৭-০৮ সালে নির্মিত চলচ্চিত্রটিও মুক্তির আলো দেখেনি। বিদেশের মাটিতে প্রশংসিত হলেও দেশের পর্দার জন্য সেন্সর ছাড়পত্র পায়নি আসাদ জামানের 'জলঘড়ি'। তবে আশার কথা এই, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানাভাবে আলোচিত ও স্বীকৃত চলচ্চিত্র রুবাইয়াত হোসেনের 'মেইড ইন বাংলাদেশ' মুক্তি পেতে যাচ্ছে শিগগির। এ চলচ্চিত্রে দীপান্বিতাকে দেখা যাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে। এ ছাড়া মুক্তির প্রতীক্ষায় আছে নুরুল আলম আতিকের 'মানুষের বাগান', নূর ইমরান মিঠুর 'পাতালঘর', অমিত আশরাফের 'কাঁঠাল', ফজলে রাব্বির 'পায়ের তলায় মাটি নাই', সেঁজুতি সুবর্ণা টুশির 'রিপলস', সাইফুল ইসলাম মান্নুর 'পায়ের ছাপ'।

দীপান্বিতার অভিনয়ের শুরু বিটিভির নাটকে শিশুশিল্পী হিসেবে। মঞ্চে হাতেখড়ি যখন তিনি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। শহীদুল আলম সাচ্চুর নির্দেশনায় থিয়েটার সেন্টারের একটি একক পরিবেশনায় প্রথম মঞ্চে ওঠেন দীপান্বিতা। এ ছাড়া নাগরিক নাট্যাঙ্গনের 'চাঁদবণিকের পালা', দেশ নাটকের 'নিত্যপুরাণ', মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাস অবলম্বনে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের গল্প নিয়ে 'বিরসা কাব্য' তার কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বলে মনে করেন তিনি। শতাধিক টেলিভিশন নাটকে কাজ করেছেন। নুরুল আলম আতিকের হাত ধরে ছোট পর্দায় আসা তার। ছোট পর্দা আর বড় পর্দার পাশাপাশি ওয়েবেও ঝুঁকেছেন। অভিনয় করেছেন তানিম নূরের হৈচৈয়ের ওয়েব সিরিজ 'একাত্তর' এবং রিহান রহমানের পরিচালনায় চরকির ওয়েব সিরিজ 'নিখোঁজ'-এ।

চরিত্রে কেমন ডুবে যান দীপান্বিতা? 'গোর' সিনেমায় অভিনয়ের জন্য জাতীয় স্বীকৃতি অর্জনের পর বললেন, 'আমি এখনও মা হতে পারিনি। কিন্তু চরিত্রটা ছিল মায়ের। খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। এমন স্বীকৃতি অর্জনের পর আজ মনে হচ্ছে, সত্যিই হয়তো মা হতে পেরেছি। জীবনে না হোক, পর্দায়; কিছু সময়ের জন্য।' নিত্যদিনের জীবনের বাইরেও প্রতিনিয়ত যেসব রূপ ধারণ করে পথ চলেছেন দীপান্বিতা, তার এখনও অনেকটাই আমাদের দেখার বাকি। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- 'আপন বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে একলা জ্বলো রে'। দীপান্বিতার সে আলোই যে আজ ঠিকরে পড়ছে আমাদের চোখে...। তাই তো বলতে হয়, এখন দীপান্বিতার দিন।