রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট আইনজীবী ও লেখক ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের স্মরণ সভায় বক্তারা বলেছেন, তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী ও উদার রাজনীতিবিদ। লেখনীর মাধ্যমে ইতিহাসের কাছে তিনি সত্য হয়ে বেঁচে থাকবেন। তারা বলেন, যতদিন দেশ থাকবে, বিচার বিভাগ থাকবে, ততদিন মানুষ মওদুদ আহমদকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণ সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। মওদুদ আহমদ স্মৃতি পরিষদ এ স্মরণ সভার আয়োজন করে। আগামী ১৬ মার্চ মওদুদ আহমদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্যে রাখেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এমএ মতিন, প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, সঙ্গীত শিল্পী ও গবেষক মুস্তাফা জামান আব্বাসী, মওদুদ আহমদের সহধর্মিণী সাবেক এমপি হাসনা মওদুদ, বিএনপি নেতা জয়নুল আবদীন ফারুক, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন প্রমুখ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সাংবাদিক সালেহউদ্দিন।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, কোনো জাতি এক ব্যক্তি দ্বারা সৃষ্টি হয়নি। মুক্তিযুদ্ধকে আমরা এক ব্যক্তির ইতিহাসে পরিণত করেছি। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পেছনে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যারা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন সবার অবদান রয়েছে। মাওলানা ভাসানী, তাজউদ্দীন আহমেদ, মুজাফফর আহমেদসহ সবারই অবদান রয়েছে।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে মওদুদ আহমদের অবদান ছিল অবিস্মরনীয়। রাজনীতি করতে গেলে ভুলভ্রান্তি হতেই পারে। কিন্তু তার অবদানকে অস্বীকার করা যাবে না। লেখনী ও কর্মদক্ষতার মধ্যে তাকে স্মরণ করতে হবে। দেশের বর্তমান দুরাবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্রব্যেমূল্যের বাজর স্থিতিশীল করতে হলে রেশন প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙ্গতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মানুষের মস্তিষ্কসবসময় সব কিছু মনে রাখতে পারে না, অনেক কিছুই ভুলে যায়। তাই দেশের ইতিহাস নিয়ে বার বার বলতে হবে। ১৯৭৪ সালে দু:শাসনের কারণে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। অমর্ত্য সেন তার বইয়ে লিখেছেন। সে বছর সবচেয়ে বেশি খাদ্য উৎপাদন হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভিক্ষ হওয়ায় সেখানে তিন লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। সেই দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি আবারও শোনা যাচ্ছে।
বিচারপতি এমএ মতিন বলেন, মওদুদ আহমদ ছিলেন একজন প্রথিতযথা আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও লেখক। স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট বাতিলের জন্য তিনি প্রথম আদালতে আইনী লড়াই করেছিলেন। আইনের জগতে তিনি একজন উজ্বল নক্ষত্র। এ পেশায় তার অবদান অন্যান্য। যতদিন বাংলাদেশ ও বিচার বিভাগ থাকবে ততদিন মানুষ তাকে স্মরণ করবে।
ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম বলেন, জনগণকে আইনী সহায়তা ও সত্য লেখনীর মাধ্যমে তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ আইনজ্ঞ। আইন পেশায় তাঁর পরিধি ছিল ব্যাপক।
আ স ম আবদুর রব বলেন, মওদুদ আহমদ ছিলেন একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান। আমরা তাকে সম্মান দিতে পারিনি। তিনি বাংলা ও ইংরেজীতে মোট ১২টি বই লিখেছেন। তার মৃত্যুর পর জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে অপমান করা হয়েছে। তিনি তার স্বমহিমায় বেঁচে থাকবেন। তিনি বলেন, এই সরকার তাঁর মুক্তিযুদ্ধের অবদান স্বীকার করে না। মানুষকে গুম ও হত্যা করা যায়, কিন্তু ইতিহাসকে হত্যা করা যায় না। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার ও ভাষা আন্দোলনের সমস্ত ইতিহাস বিলিন করা হচ্ছে।
মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, মওদুদ আহমদ ব্যতিক্রমী রাজনীতিবিদ ছিলেন। স্পষ্ঠবাদী ও চমৎকার লেখকও ছিলেন। বড়মাপের মানুষ কখনই নির্ভেজাল পাওয়া যায় না। রাজনীতি করে তিনি দলের বিপক্ষেও কথা বলেছেন। তিনি যেমন গুনী ছিলেন, রাজনীতিতে তার সমালোচনাও ছিল। জ্ঞানের চর্চা ও নিজের বিশ্বাসকে স্বীকার করে কথা বলতেন তিনি। হাসনা মওদূদ বলেন, আমি তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চাই। তার নির্বাচনী এলাকার মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছি।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, মওদুদ আহমদের তিনটি গুণ ছিল। রাজনীতিবিদ, আইনজীবী ও লেখক। মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী সরকার গঠনে তার ভুমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি যে দলের রাজনীতি করেন না কেন তার ছিল উদার গণতান্ত্রিক চেতনা। কথা বলার ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করা ছিল তার বড় গুণ। লেখনীর মাধ্যমে তিনি ইতিহাসের সত্যকে তুলে ধরার কারণেই আগামী প্রজন্ম তাকে স্মরণ করবে। জয়নুল আবদীন ফারুক বলেন, দেশের এই ক্রান্তিকালে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষার জন্য মওদুদ আহমদের মতো ব্যক্তিকে খুবই প্রয়োজন ছিল।