নাসির উদ্দিন খান। অভিনেতা। সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে তাঁর অভিনীত সিনেমা ‘হাওয়া’। মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত এ সিনেমা ও অন্যান্য প্রসঙ্গে কথা হলো এ অভিনেতার সঙ্গে।

‘হাওয়া’ সিনেমায় ‘নাগু’ চরিত্রটি নিয়ে দর্শকের প্রতিক্রিয়া কী?

নাগু চরিত্রটিতে খুবই ভালো সাড়া পাচ্ছি। যাঁরা সিনেমা দেখেছেন, প্রত্যেকেই তাঁদের ভালো লাগার কথা জানিয়েছেন। চরিত্রটির জন্য প্রস্তুতিও ছিল অনেক। ২০১৯ সালের শেষের দিকে ‘হাওয়া’র শুটিং শুরু হয়। আমার কল আসে আরও বছর দুয়েক আগে। আমি মানুষটা কেমন, তার সঙ্গে নির্মাতা নাগু চরিত্রটির মিশ্রণ ঘটিয়েছেন বলে মনে হয়। শুটিংয়ের ৪৫ দিন এবং তার আগে পরে অনেকদিন আমি অন্য কোনো কাজ করিনি। গভীর সমুদ্রে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও টিমের সহযোগিতায় দৃশ্যধারণে অংশ নিয়েছি। দর্শক সিনেমাটি গ্রহণ করেছেন বলে সব কষ্টই এখন সার্থক মনে হচ্ছে। 

বাস্তবে কখনও কি জাল ফেলে মাছ ধরেছেন?

না, কখনোই মাছ ধরিনি। শুটিংয়ের আগে নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন দেখিয়েছিলেন গভীর সমুদ্রে কি ভাবে জাল টানে। সে ভাবে অফিসের মধ্যেও আমরা জাল টানার প্র্যাকটিস করেছিলাম। আট জেলের মধ্যে নাগু একজন। সে মাছ ধরে, জাল ফেলে; জাল যদি পেঁচিয়ে যায় ওটাকে সে ছাড়িয়ে দেয়, এমন চরিত্রে অভিনয়ের জন্য জাল দিয়ে মাছ ধরা শিখতে হয়েছে। পুকুরে মাছ ধরা আর গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা এক বিষয় নয়। অনেক পার্থক্য। গভীর সমুদ্রের জালের মধ্যে বড় বড় ছিদ্র থাকে, তা ধরে ধরে টেনে ওপরে তুলতে হয়।

শুটিং দিনের কোন বিষয় এখন মিস করছেন?

সহকর্মীদের সঙ্গ খুব মিস করি। শুটিং চলাকালে আমার রুমে থাকতেন অভিনেতা মাহমুদ আলম। তিনি মরা চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সেই সময়গুলো ভীষণ মনে পড়ে। চঞ্চল ভাইয়ের রুমে আড্ডা হতো; হাসি-আনন্দে কাটত মধুর সময়। বোটের সিঁড়ি দিয়ে বেয়ে নিচে নামতাম। শুট শেষ হলে পেছনে দিয়ে বিচের পেছনে চলে যেতাম। অন্ধকারে চাঁদ দেখে দেখে মুগ্ধতায় সময় কাটিয়েছি। অনেকের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে। কাজের স্বার্থে ঝগড়া করেছি। সবকিছুই চোখের সামনে ভাসছে।

এমন কোনো চরিত্র আছে, যে চরিত্রে অভিনয়ের আকাংক্ষা রয়েছে?

না। যখন যে কাজটি করছি, সেটাই আমার কাছে স্বপ্নের চরিত্র বলে মনে হয়। কারণ ওই চরিত্রে তো আমি আগে অভিনয় করিনি। 

দেশের বাইরে হাওয়া সিনেমাটির প্রদর্শনী হচ্ছে। কেমন লাগছে?

এত ভালো লাগছে যে বলে বোঝাতে পারব না। আমাকে দেশের ভিতর যাঁরা পছন্দ করেন, তাঁরা দেশে বসে আমার সিনেমা দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু এখন বিদেশে সিনেমা প্রদর্শনীর সুবাদে ওখানকার বন্ধু বান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা আমার অভিনীত সিনেমাগুলো দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। আমার স্কুল জীবনের এক বন্ধু শাহেদের সঙ্গে দেখা হয় না ৩৫ বছর। সে অস্ট্রেলিয়ায় বসে ‘হাওয়া’ ছবি দেখে আমাকে মেসেজ করেছে। দেশের সিনেমা দেশের বাইরের দর্শকরাও দেখছেন এটাই গর্বের। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁরা আমাদের কৃষ্টি-কালচার সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছেন। আর দেশের চলচ্চিত্রের বাজারও আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। 

মঞ্চে আর ফিরবেন না?

মঞ্চ আমার প্রথম ভালোবাসার। ওটিটি ও সিনেমার কাজেই বেশি ব্যস্ত আছি এখন। যেজন্য এখন সেভাবে থিয়েটারে সময় দিতে পারছি না। পাঁচ দিন রিহার্সাল করব আর দুই দিন করব না এভাবে সময় দিয়ে মঞ্চের কাজ করতে চাই না। মঞ্চে কীভাবে কাজ করা যায়, সেটাই চিন্তা করছি। মঞ্চ নাটকের জন্য যখন টানা প্রস্তুতির সময় দিতে পারব তখনই মঞ্চে ফেরার ইচ্ছা রয়েছে।

রাস্তায় বের হলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আপনার অভিনীত কোন চরিত্রের কথা সবচেয়ে বেশি শোনেন? 

শিহাব শাহীনের ওয়েব সিরিজ ‘সিন্ডিকেট’-এ রসিক মন্দ লোক অ্যালেন স্বপন চরিত্রটিতে এখনও দর্শক বুঁদ হয়ে আছেন। রাস্তা ঘাটে অনেকে ওই চরিত্রটির নাম ধরে ডাকেন। এ ছাড়া ‘হাওয়া’র নাগু মাঝি বলেও আমাকে এখন অনেকেই ডাকেন। সত্যিই আমি তৃপ্ত। এমন এমন কিছু চরিত্রে কাজ করতে পেরেছি, যার জন্য মানুষ আমাকে ভালোবাসছেন।

পেছন ফিরে তাকালে দিনগুলো কেমন মনে হয়?

পেছনের দিনগুলো স্বপ্নের মতো লাগে। জীবনে ছিল নানা চড়াই-উতরাই। স্কুলজীবন থেকে অভিনয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছি। ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রামে তির্যক নাট্যগোষ্ঠীতে যোগ দিই। পিতৃতুল্য বড় ভাই আমান উল্লাহ খানের ইচ্ছে ছিল আমি যেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হই। তাঁর সে ইচ্ছা পূরণ করতে পারিনি। চাকরি করেছি এক যুগেরও বেশি সময়। চট্টগ্রামে থাকাকালীন ২০১৪ সালে ওয়াহিদ তারেকের ‘আলগা নোঙর’ সিনেমাসহ তিনটি নাটক ও কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি। চাকরি, অভিনয় এই দুুটি কাজ একসঙ্গে করতে পারছিলাম না, ভালোও লাগছিল না। মন পড়ে থাকত মহড়া কক্ষে।তো এভাবে ভালো লাগা না লাগার দোলাচালে থাকতে থাকতে মাস খানেকের প্রিপারেশানে চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ২০১৬ সালে ঢাকায় চলে আসি। এর পরের গল্প তো সবারই কম-বেশি জানা।