মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
এ কী সংবাদ পেলাম! গাজী মাজহারুল আনোয়ার আর নেই। এ ক্ষতি আর কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। বাংলা গানের জগৎ জানে, কখনও তাঁর নাম বিস্মরণযোগ্য নয়। 'জয় বাংলা বাংলার জয়'- এই একটি গানের কবিতা লেখার পর দেশের কিংবদন্তি এই গীতিকবি যদি আর একটি গানের কবিতাও না লিখেছেন, তবু তিনি অমর হয়ে থাকতেন। কিন্তু তাঁর মতো সৃজনের অবিরাম ধারা যার মধ্যে প্রবাহিত, তিনি কি তৃপ্ত হয়ে কৃতিত্বের একমাত্রায় থেমে যেতে পারেন? পারেন না। যে জন্য আমৃত্যু বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্রে অকৃপণ হাতে দিয়ে গেছেন অজস্র মণিমুক্তা।

দেশীয় আধুনিক বাংলা গানকে নিছক পদ্যের অবস্থা থেকে আধুনিক কিন্তু সুবোধ্য কবিতার মর্যাদায় উন্নীত করতে যে ক'জন উদ্যোগী হয়েছিলেন, গাজী মাজহারুল আনোয়ার তাঁদের একজন। যাঁর ভেতরটা ভিজে ছিল গীতিকবিতার অমৃত রসে। হয়তো সে কারণেই চিকিৎসাশাস্ত্রের কাঠিন্য তাঁকে বেঁধে রাখতে পারেনি। চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়নের ইতি টেনে তাই শুরু করেছিলেন গীতিকবিতার সাম্রাজ্যে পথচলা। তখন ঢাকা বেতার ছিল একমাত্র প্রচারমাধ্যম, যেখানে গীতিকবির যোগ্যতা নির্ধারণ করা হতো। কোনো কোনো গীতিকবির রচনা সুরের মাধ্যমে গানে রূপান্তরযোগ্য, তার বিচারের ভার ছিল বেতারের কর্মকর্তাদের হাতে। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের গীতিকবিতায় তাঁরা মুগ্ধ হন এবং বেতারের তালিকাভুক্ত 'গীতিকার' হিসেবে স্বীকৃতি দেন অবলীলায়। এরপর আর থেমে থাকার অবকাশ ছিল না। দশকের পর দশক তাঁর কলম থেকে ঝরে পড়েছে কালজয়ী সব গীতিকবিতা। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে সম্ভবত এমন কোনো মেধাসম্পন্ন সুরস্রষ্টা নেই, যিনি তাঁর গানে সুরারোপ করেননি। তাঁর গানের সংখ্যাও বিপুল; বিশ সহস্রাধিক।

গাজী মাজহারুল আনোয়ার ছিলেন ছন্দজ্ঞানসম্পন্ন কবি। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, চলচ্চিত্রের অনেক গানে, অবস্থা কৌশলে তিনি ছন্দ ও অন্তমিলের কঠিন অনুশাসন এড়িয়ে গেছেন। রেখেছেন মুনশিয়ানার ছাপ।

গাজী মাজহারুল আনোয়ার চলচ্চিত্রের প্রায় সব সংগীত পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন। সত্য সাহা, আনোয়ার পারভেজ, সুবল দাস, সমর দাস, আলতাভ মাহমুদ, রবিন ঘোষ, আলম খান, আলাউদ্দিন আলী, খোন্দকার নুরুল আলম, আবদুল আহাদ, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলসহ অনেক বয়োকনিষ্ঠদের কাজও তাঁকে করতে হয়েছে, অনেক সময় নিরুপায় হয়ে।

সবশেষে বলতে হয়, জনপ্রিয়তার বিচারে তিনি যে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত, সেখানে আর কেউ কখনও পৌঁছাতে পারবে কিনা সন্দেহ। এই জনপ্রিয়তা সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বোদ্ধাজন যাঁদের গণ্য করা হয়, তাঁদের অন্তরেও।

রুনা লায়লা


আকাশের অন্যান্য নক্ষত্রের সঙ্গে যোগ দিতে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে আরেকটি নক্ষত্র- গাজী মাজহারুল আনোয়ার। কিছু শিল্পীর জন্ম হয় অন্যদের অনুপ্রাণিত করার জন্য; গাজী ভাই তাঁদেরই একজন। তিনি আমাদের জন্য রেখে গেছেন অসংখ্য গান, যা যুগের পর যুগ সবার মনে থাকবে। আগামী প্রজন্মের শিল্পীরাও গাইবে তাঁর গান। আমাদের বাংলা গানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। তাঁর গানের কথায় থাকত কখনও আনন্দ, কখনও বেদনা; প্রেমসহ নানা বিষয়। গানের কথায় কত প্রজন্মকে তিনি মানসিক শান্তি দিয়েছেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা এক গুণী মানুষকে হারিয়েছি, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি চিরকাল বেঁচে থাকবে। স্রষ্টা যেন শোকসন্তপ্ত পরিবার ও স্বজনদের এই শোক সইবার শক্তি দেন। তাঁর আত্মাকে চিরশান্তিতে রাখুন।


রফিকুল আলম


গাজী ভাইয়ের তো অনেক পরিচয়। কিন্তু তিনি আমাদেরই মানুষ; গানের মানুষ। তাঁর অবদান সম্পর্কে অনেক দীর্ঘ কথা বলতে হবে। সেটা এখন বলতে চাই না। বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ববঙ্গে কবিতা ও আধুনিক গীতিকবিতা লেখার মানুষ খুব কম ছিলেন। তিনি এক জীবনে যত গান লিখেছেন; তার একটিও বিফলে যায়নি। এটা খুব বিরল। বাংলা সাহিত্য ও গানে কোথাও এত বড় গীতিকবি নেই, যাঁর প্রতিটি গান মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। কয়েক যুগ ধরে প্রায় সব শিল্পীই কোনো না কোনো সময় তাঁর গান কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন। তাঁর গানের মাধ্যমে কয়েক প্রজন্মের শিল্পীরা বেড়ে উঠেছে। তাঁর মৃত্যু আমাদের জন্য অনেক বড় ক্ষতি। তাঁর লেখা ও সুরে আমি অনেক গান গেয়েছি। ফলে তাঁর চলে যাওয়ার ব্যথা নিয়েই পথ চলতে হবে; কাজ করতে হবে।

কনকচাঁপা


আমাদের সব বাতিঘর একে একে নিভে যাচ্ছে। সকাল থেকে মুছি আর লিখি; মুছি আর লিখি। কিন্তু কিছুই লেখা হয়ে ওঠে না। গাজী মাজহারুল আনোয়ার ভাইয়ের মৃত্যু নিয়ে কিছু লেখা হাতে উঠছে না। আল্লাহ তাঁকে বেহেশতের সর্বোচ্চ সুন্দর স্থানের স্থায়ী বাসিন্দা করে নেওয়ার অনুগ্রহ করুন। তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার যেন এত বড় শোক বহন করার শক্তি অর্জন করে- এই দোয়া রইল।


কুমার বিশ্বজিৎ


গীতিকবি আসলে সবাই হয় না। আমাদের যতজন সত্যিকারের গীতিকবি জন্মেছেন, তাঁদের মধ্যে গাজী মাজহারুল আনোয়ার অন্যতম। তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক আমার ৪০ বছর। আমি তাঁর লেখা গান তো অনেক গেয়েছি। এ ছাড়া তাঁর ছবিতেও গান করেছি। এই দীর্ঘ সময় আমি যা দেখেছি তা হলো, তাঁর মধ্যে পিতৃত্ববোধ ছিল গভীর। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি সামনে এলেই অটোমেটিক অনেক সাহস লাগত।

গাজী ভাইয়ের লেখার ব্যাপারে আমার বলার ধৃষ্টতা নেই। আমি শুধু বলব, আমাদের বাংলা গানের ক্ষেত্রে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার যেমন; গাজী ভাই আমাদের দেশে বাংলা গানের ক্ষেত্রে ওই মানেরই একজন। তাঁর লেখার মধ্যে প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি, আনন্দ-বেদনা, প্রতিবাদ, দেশপ্রেম- সব বিষয় উঠে এসেছে। তিনি বাংলা গানকে যেভাবে সমৃদ্ধ করেছেন, এটা আমাদের জন্য পরম পাওয়া। আমরা তো তাঁর আত্মার শান্তি কামনা ছাড়া কিছু করতে পারব না। যাঁরা গান লেখেন বা লিখছেন; এসব মানুষ কর্ম করতে গিয়ে জীবনে কত সংযম, ত্যাগ ও সংগ্রাম করেছেন, তা বলে বোঝানো যাবে না। গাজী ভাইয়ের কাছে আমরা সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।


বাপ্পা মজুমদার


গাজী মাজহারুল আনোয়ার সংগীতের এক মহিরুহ। গুণী মানুষটি নেই- ভাবতে পারছি না। এই কিংবদন্তির প্রয়াণে আমরা স্তব্ধ এবং গভীরভাবে শোকাহত। বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি তাঁকে। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর অমর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।


শাকিব খান


বর্ণিল কর্মময় জীবনে গাজী আঙ্কেল গানের বাইরে বিকশিত হয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণ, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক হিসেবেও। শিল্প-সংস্কৃৃতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি রেখেছেন বিস্ময়কর সব সাফল্য। দেশের মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় আজীবন খুবই প্রিয় হয়ে থাকবেন তিনি।