জীবদ্দশায় ২০ সহস্রাধিক গান লিখেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার; যার অধিকাংশ আজও অনুরণন তুলে যাচ্ছে শ্রোতাদের মাঝে। এই গীতিকবির বয়ানে তেমনই ৫টি কালজয়ী গানের জন্মকথা তুলে ধরা হলো-

জয় বাংলা, বাংলার জয়

এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা- বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের এই ঘোষণার পর চারদিক থেকেই আন্দোলনের স্লোগান আসছিল এবং আন্দোলন আরও তীব্রতর হচ্ছিল। এমনকি সেই সময় 'জয় বাংলা' নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণাও এসেছিল। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে কীভাবে সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়; তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে থাকলাম। কিছু সময় পর আমি উপলব্ধি করলাম- বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক গানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পুরো বিষয়টি বিশ্নেষণ করে আমি 'জয় বাংলা বাংলার জয়' শিরোনামে গানটি কেমন হতে পারে, প্রাথমিক ধারণা করলাম।

এর পর রাজধানীর ফার্মগেটের একটি স্টুডিওতে বসে তৎক্ষণাৎ গানটি লিখে ফেলি। গানের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সবাইকে খবর দেওয়ার পর তাৎক্ষণিক সুর করার জন্য প্রখ্যাত সুরকার আনোয়ার পারভেজ সেখানে এলেন। সঙ্গে এলেন শহীদ আলতাফ মাহমুদ, সুরকার আলাউদ্দিন আলী, কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতউল্লাহ, আবদুল জব্বারসহ বেশ কয়েকজন। সুর তৈরি হওয়ার পর সেদিনই স্টুডিওতে গানটি রেকর্ড হলো। এর পর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনা সংগীত হিসেবে গানটি ব্যবহার করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পরও গানটি বিভিন্নভাবে রেকর্ড করার পাশাপাশি নানা আয়োজনে ব্যবহার করা হয়। বিবিসির জরিপে সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকাতেও এটি স্থান পায়।

একতারা তুই দেশের কথা
স্বাধীনতার বেশ কিছুদিন পর একদিন হঠাৎ ফোন এলো খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতউল্লাহর। বলল, 'গাজী ভাই, তোমার লেখা দেশের গানগুলো সবখানে ছড়িয়ে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধেও তোমার লেখা 'জয় বাংলা বাংলার জয়' গানটি আন্দোলিত করেছে; অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। এখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিশেষ অনুষ্ঠানে আমাকে একটি দেশের গান গাইতে হবে। আমি চাই, এই গানটি তুমি লিখে দাও এবং পারভেজ ভাই [সংগীত পরিচালক আনোয়ার পারভেজ] সুর করবেন। শাহনাজ রহমতউল্লাহ ছিল অতি আদরের ছোট বোন। তার আবদার ফেলতে না পেরেই রাজি হয়ে যাই। সেদিন রাতে একা একা বারান্দায় পায়চারি করছি আর ভাবছি, কী ধরনের গান লেখা যেতে পারে! সে সময় আমাদের সংস্কৃতির মধ্যে একটা বিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছিল।

আধুনিক হতে গিয়ে দিন দিন শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিলাম। সারারাত নির্ঘুম কাটানোর পর সকালবেলা হঠাৎ মাথায় এলো- 'একতারা তুই দেশের কথা বল রে এবার বল...'। কিছুক্ষণের মধ্যে গানটি লেখা শেষ করে শাহনাজকে খবর দিই। ওই দিনই বিকেলবেলা শাহনাজকে নিয়ে সুরকার আনোয়ার পারভেজ চলে আসেন আমার বাসায়। গানের কথা পড়ে দু'জনেই খুব উৎফুল্ল হয়ে পড়েন। এর পর আনোয়ার পারভেজ তখনই বসে যান সুর করতে। সুর তৈরি হতে না হতেই হঠাৎ বাসায় উপস্থিত আরেক সুরকার আলাউদ্দিন আলী। গানটি শুনে তিনি বললেন, 'গাজী ভাই, চমৎকার একটি গান সৃষ্টি হয়েছে। এই গানটি দেশের মানুষের অন্তরে গেঁথে থাকবে।' আলাউদ্দিন আলীর এই কথা পরবর্তী সময়ে সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছিল। বাংলাদেশ টেলিভিশনে গানটি প্রচারের পর দারুণ প্রশংসিত হয়।

সবাই তো ভালোবাসা চায়
একদিন বাবার সঙ্গে রিকশায় যাচ্ছি। হঠাৎ দেখি, মালিবাগ রেলক্রসিংয়ে লোকজন জটলা পাকিয়ে আছে। ঘটনা কী, তা জানতে কাছে গিয়ে দেখি, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে এক যুবক ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। এটা দেখে অনেকে বিষণ্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও আমার বাবা মোটেও বিচলিত হলেন না। আমাকে বললেন, 'আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়। এটা দুর্বল মানুষের কাজ। প্রেমে ব্যর্থ হলেই কেন আত্মহত্যা করতে হবে? সবাই তো ভালোবাসা চায়; কেউ পায় না, কেউ পায়- তাতে ভালোবাসার কোনো কমতি হয় না।' বাবার এই কথাগুলো নিয়ে পরে আর আলাদা করে ভাবিনি।

ভুলেও গিয়েছিলাম। তখন পরিচালক জহিরুল হক 'সারেন্ডার' নামে একটি ছবির কাজ করছিলেন। তিনি এ ছবির সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন প্রখ্যাত সুরকার আলম খানকে। আর আমার কাঁধে তুলে দিয়েছিলেন গান লেখার দায়িত্ব। একদিন পরিচালক আমাদের একটি দৃশ্য বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, সাগরপাড়ে ছবির পাত্র-পাত্রী তাদের ভালোবাসার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করবে। কিন্তু তাতে কোনো দুঃখবোধ থাকবে না। অনুভূতির এমন প্রকাশ নিয়েই একটা গান তৈরি করতে হবে। তখন হঠাৎ বাবার বলা কথাগুলো মনে পড়ে যায়। অনেক ভেবে সেই কথাগুলোই গানে তুলে আনি। আলম খান সেদিনই গানটি সুর করে ফেলেন। কণ্ঠ দেন এন্ড্রু কিশোর আর সাবিনা ইয়াসমিন। এই গানটি শুধু জনপ্রিয়তাই পায়নি, এর জন্য সাবিনা ইয়াসমিন ও এন্ড্রু কিশোর দু'জনেই কণ্ঠশিল্পী হিসেবে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম
সুরকার আলাউদ্দিন আলী আর আমি কলকাতায় গিয়েছিলাম সাবিনা ইয়াসমিনের একটি গান রেকর্ড করার জন্য। সেখানেই এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। যিনি একটি গানের কোম্পানি চালু করার পরিকল্পনা করছিলেন। তিনি আমাদের বললেন, 'আপনাদের কাজ দারুণ লেগেছে। আমি চাই, আমার গানের কোম্পানির জন্য আপনারা দু'জন গীতিকার ও সুরকার হিসেবে কাজ করবেন।

আপনাদের সংগীত বেশ সমাদৃত। আমি চাই সেই ধরনের গান তৈরি করে দিন।' তাঁর এই অনুরোধ ফেলা সম্ভব হয়নি। যে কারণে আমি আর আলাউদ্দিন আলী বসে যাই গান লেখা ও সুর করা নিয়ে। তখন কুমিল্লা আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কিছু আঞ্চলিক গানের কথা ভাবতে ভাবতে মাথায় আসে 'বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম'- এই লাইনগুলো। এর পর আর দেরি করিনি। গানটির সুরও শেষ করা ফেলা হয়। পরে গানের প্রযোজক ঢাকায় এলে রুনা লায়লার কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়। এর পরের ইতিহাস তো সবার জানা।

এই মন তোমাকে দিলাম
আশির দশকের শুরু। তখন গীতিকার হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তসংখ্যাও বেড়ে চলেছিল। চিঠিও পাচ্ছিলাম প্রচুর। চিঠি হাতে পেয়ে দেখলাম, আমার মেয়েভক্তের সংখ্যাও কম নয়। তাদের অনেকের অনুরোধ ছিল, তাকে নিয়ে যেন একটি গান লিখি। শুধু চিঠিতে নয়, সামনাসামনি অনেকে অনুরোধ করেছেন তাদের নিয়ে গান লেখার জন্য। এই অনুরোধ রক্ষা করা যতটা কঠিন ছিল; উপেক্ষা করাও ছিল ততটা কঠিন। সমস্যা ছিল একটাই, এত মানুষের জন্য আলাদা করে গান লেখা। চেষ্টা করলেও আদৌ সেটা সম্ভব হতো না। কী করা যায়- এ প্রশ্ন যখন মাথায় ভর করল, তখনই একটা লাইন হঠাৎ মনের মধ্যে ঢুকে গেল- 'এই মন তোমাকে দিলাম' লাইনটা।

ব্যস, এই লাইনের সূত্র ধরেই পুরো একটি গান লিখে ফেললাম। পরে গানটি আনোয়ার পারভেজকে দিয়ে সুর করার পর সাবিনা ইয়ামিনের কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়। ১৯৮২ সালে গানটি ব্যবহার করা হয় ফকরুল হাসান বৈরাগী পরিচালিত 'মানসী' ছবিতে। এর পর যারা আমাকে তাদের নিয়ে গান লেখার অনুরোধ করেছে, তাদের বলেছি, গান লেখা হয়ে গেছে। 'এই মন তোমাকে দিলাম' গানটি শুনে নিও।
তথ্যসূত্র: গীতিকবির সাক্ষাৎকার ও গ্রন্থ 'অল্প কথার গল্প গান'