কিংবদন্তি গীতিকার, চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক গাজী মাজহারুল আনোয়ারকে রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা 'গার্ড অব অনার' দেওয়া হয়েছে। সোমবার বেলা ১১ টায় রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তার মরদেহ আনা হলে রাষ্ট্রীয় এই সম্মান জানানো হয়।

এরপর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ রাখা হয়। শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট।

বাংলাদেশ শিল্প কলা একাডেমি, কবিতা পরিষদ, গান বাংলা, বিটিভি, ছাত্র ফেডারেশন, যুব মৈত্রী আন্দোলন, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, সম্মেলিত সাংস্কৃতিক জোট, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ, আওয়ামী লীগের অসিম কুমার উকিলসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

ব্যাক্তি পর্যায়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন কণ্ঠশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ, সাবিনা ইয়াসমিন, মনির খান, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস, চলচ্চিত্র নির্মাতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, তারিক সুজাত, জিএম মোরশেদ, ডা. শাহাদাত হোসেন নিপুসহ আরো অনেকে।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে কন্ঠশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, বিগত দশ বছর ধরে বাংলা গান অভিভাবক শূন্য হয়ে যাচ্ছে। বাংলা গানের কালপুরুষ ছিলেন গাজী মাজহারুল ইসলাম। জন্ম যখন নিয়েছি সবাইকে মরতে হবে। তবুও কিছু মৃত্যু মেনে নেয়া কষ্টের।

সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, গাজী মাজহারুল আনোয়ার ও তার পরিবারের সাথে আমার অর্ধশতকের সম্পর্ক। তার বিশ হাজারের মতো গান, তার মধ্যে আমি পাঁচ ছয় হাজারের মতো গান গেয়েছি। এতো স্মৃতি গাজী ভাইয়ের সাথে বলে শেষ করা সম্ভব নয়।

মনির খান বলেন, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের একেকটি সৃষ্টি বাংলাদেশের সংকটময় সময়ে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় একেকটি গান মেশিনগানের মতো অবদান রেখেছে, সেই তিনি চলে গেছেন। আসলে তার দৈহিক মৃত্যু হয়ে ,কিন্তু তার কর্মের মৃত্যু কখনও হবে না, বাংলাদেশের মানুষ তাকে আজীবন মনে রাখবেন।

চলচ্চিত্র নির্মাতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, গাজী মাজহারুল আনোয়ার এমন এক সৃষ্টিশীল ব্যাক্তি, যার সৃষ্টিতে আমরা বিদ্রোহী হয়েছি আবার প্রেমিক হয়েছি। এই মহান ব্যক্তি সারাজীবন তার গান সৃষ্টিতে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। আমি যদি ভুল না করি তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গান রচনাকারী।

তার বড় মেয়ে দিঠি আনোয়ার বলেন, মানুষের উপস্থিতি আমার বাবার সফলতার প্রমাণ। আমাদের পুরো পরিবার আপনাদের সকলের তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কৃতজ্ঞ। এসময় তিনি তার ও পরিবারের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

সম্মলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস বলেন, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের মত ব্যক্তিরা দৈহিকভাবে মৃত্যু বরণ করেন।  কিন্তু আত্মীকভাবে তারা সব সময় মানুষের মাঝে বেঁচে থাকেন। তার জয় বাংলা, বাংলার জয় বাংলার মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তে উজ্জীবিত করেছে। এখন যে গান হয় তার বেশির ভাগ গানই বাণিজ্যিক গান। কিন্তু গাজী মাজহারুল আনোয়ারের গানে আমরা প্রেরণা পেয়েছি।

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তাঁর মরদেহ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য এফডিসিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর বিকালে গুলশান আজাদ মসজিদে জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হবে।

গাজী মাজহারুল আনোয়ার ছিলেন একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, রচয়িতা, গীতিকার ও সুরকার। স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম নিয়ে তিনি অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গান লিখেছেন। সংগীতে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি ২০০২ সালে একুশে পদক এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ৫ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন।

তার কালজয়ী গানের তালিকায় রয়েছে—'জয় বাংলা বাংলার জয়', 'আছেন আমার মোক্তার', 'এক তারা তুই দেশের কথা', 'গানের কথায় স্বরলিপি লিখে', 'শুধু গান গেয়ে পরিচয়', 'এই মন তোমাকে দিলাম', ইত্যাদি।

গাজী মাজহারুল আনোয়ার কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার তালেশ্বর গ্রামে ১৯৪৩ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৬৪ সালে রেডিও পাকিস্তানে গান লেখার মধ্য দিয়ে তিনি পেশাগত জীবন শুরু করেন।