প্রতিটি চ্যানেলে একই রকম অনুষ্ঠান প্রচার। টেলিভিশনে অধিকাংশ অনুষ্ঠানের পুনঃপ্রচার ও স্বল্প বাজেটে নির্মিত নাটকের মান নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। অন্যদিকে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো নির্মাণে বৈচিত্র্য নিয়ে আসায় ক্রমাগত কোণঠাসা হয়ে পড়ছে টিভি চ্যানেলগুলো। আর ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। 

অনেক দিন ধরেই আমরা শুনছি, টেলিভিশন দিনদিন দর্শক হারাচ্ছে। সেই দর্শকের সিংহভাগ এখন ওটিটি [ওভার দ্য টপ] প্ল্যাটফর্মগুলোর দখলে, যার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা একটি সমীক্ষা চালালাম। জানার চেষ্টা করলাম, টিভি ও ওটিটি- এই দুই মাধ্যমের কোনটি দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করছে। দেখা গেল, দর্শক ও চ্যানেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে বড় রকমের মতভেদ রয়েছে। দর্শকের মতামত দিয়েই শুরু করি; তারা কী বলেন? কথার শুরুতেই দর্শকরা ছুড়ে দিয়েছেন বেশ কিছু প্রশ্ন। টিভি কেন দেখব? কী আছে দেখার? পর্ব বাড়ানো ছাড়া ধারাবাহিক নাটক গল্পে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারছে কি? এক চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলের আয়োজনে কি কোনো তফাত খুঁজে পাওয়া যায়? সমীক্ষার শুরুতেই টেলিভিশন আয়োজন নিয়ে দর্শকের এমন অসংখ্য প্রশ্ন। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে একটু পেছনে তাকাতে হয়।

আমরা দেখি, দু-তিন বছর ধরেই দর্শক টেলিভিশন থেকে অনলাইনের দিকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছেন। যে কারণে টিভি চ্যানেলগুলো আলাদা করে নিজেদের ইউটিউব চ্যানেল খুলে সেখানে নাটক ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান আপলোড করছে। এরপরও সাবস্ট্ক্রাইব করে ওটিটির বিভিন্ন সিরিজ ও ওয়েব ছবি দেখছেন দর্শক। এর কারণ হিসেবে অনেকের মন্তব্য, টিভি ধারাবাহিক দেখতে গেলে দেখা যায় গল্পের ধারাবাহিকতা নেই। একক নাটক ও টেলিছবি নির্মিত হচ্ছে হাতে গোনা কিছু চরিত্র নিয়ে। নায়ক, নায়িকা এবং তাদের বাবা, মা থাকবে- এর বাইরে অন্যান্য চরিত্র থাকাটা উচিত নয়- এমন ভাবনা থেকেই গল্প লেখা হয়। যেজন্য দর্শকও গুটিকয় চরিত্রের নাটক, টেলিছবি দেখার খুব একটা আগ্রহ পান না। এর কারণ হিসেবে নির্মাতারা জানান, যে বাজেটে টিভি নাটক, টেলিছবি নির্মাণ করা হয়- তা সত্যি অবাক করার মতো। দেখা যায়, বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি খরচ হয়, পাত্র-পাত্রীর পারিশ্রমিকে। এরপর বাজেটের যেটুকু অংশ হাতে থাকে- তা দিয়ে আর যা-ই হোক, মানসম্পন্ন কাজ প্রত্যাশা করা কঠিন। এর পরও অনেক নাটক ও টেলিছবি দর্শকের মনোযোগ কাড়তে পারছে।

এর কারণ শিল্পীদের অনবদ্য অভিনয়, নয়তো ভালো গল্পের কারণে মাঝে মাঝে কিছু নাটক দর্শকের মাঝে আলোড়ন তুলছে। আরেকটি বিষয় হলো, নিজেদের কাজ কিছুটা মানসম্পন্ন করার জন্য অনেকে চ্যানেলের দ্বারস্থ না হয়ে অডিও-ভিডিও প্রযোজকদের কাছে ছুটছেন। তাদের ইউটিউব চ্যানেলের জন্যই আলাদা করে নাটক নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাতাদের এ কথা থেকে বোঝা যায়, বাজেটের অভাবেই নাটকের মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু দর্শক তো নাটক, টেলিছবির বাইরে অন্যান্য আয়োজনও টিভিতে দেখার সুযোগ পান- এর পরও চ্যানেল দর্শক হারাচ্ছে কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় সব চ্যানেলই একই ধরনের অনুষ্ঠান নির্মাণে উঠেপড়ে লেগেছে। কোনো চ্যানেলের একটি অনুষ্ঠান যদি দর্শকপ্রিয় হয়ে ওঠে, তাহলে বাকি চ্যানেলগুলোও মেতে ওঠে সে ধরনের আয়োজনে। বিশেষ করে সেলিব্রেটি আড্ডা, রিয়েলিটি শো, রান্নার অনুষ্ঠান- সবাই যেন একে অপরের দেখাদেখি নির্মাণ করছে। যেখানে নতুনত্ব খুব একটা চোখে পড়ছে না। তা থেকেই স্পষ্ট হয়, কেন দর্শক টিভি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

একদিকে টেলিভিশন যখন দর্শক হারাচ্ছে, অন্যদিকে তখন ওটিটির সাবস্ট্ক্রাইবার বেড়েই চলেছে। যদিও ওটিটির দর্শক একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির, টিভি দর্শকের সঙ্গে তাদের মেলানো ঠিক হবে না বলেই মনে করেন চ্যানেল কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে টিভি ও ওটিটির তুলনা করাও যৌক্তিক নয় বলে উল্লেখ করেন এনটিভির অনুষ্ঠান প্রধান আলফ্রেড খোকন। তিনি বলেন, 'ওটিটি আর টেলিভিশন দুটো ভিন্ন মাধ্যম। তাই তুলনায় যাওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। তা করলে অনেকটা তালগাছের সঙ্গে বেলগাছের তুলনার মতো হয়ে যাবে। দেখুন, ওটিটিতে দর্শক কী পাচ্ছে- ওয়েব ছবি, সিরিজ ও ফিকশন। এর বাইরে কিছু আছে কী? নেই। কিন্তু টিভিতে আপনারা কী পাচ্ছেন- নাটক, টেলিছবি, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, রিয়েলিটি শো, সংগীতানুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান থেকে শুরু করে টক শো, সংবাদসহ অনেক কিছু। সংস্কৃতির প্রতিটি সম্পর্ক ধরে রেখে এবং সরকারি নীতিমালা মেনে টিভি চ্যানেলগুলো আয়োজন করে।

কিন্তু ওটিটির জন্য কোনো নীতিমালা বেঁধে দেওয়া হয়নি। যে কারণে ওয়েব সিরিজ ও ছবিগুলোয় খুন, রাহাজানি, যৌনতা- এমন অনেক বিষয় উঠে আসছে, যা টিভি নাটকে চাইলেই তুলে ধরা সম্ভব নয়।' তাঁর এই কথার সঙ্গে একমত পোষণ করে বাংলাভিশন চ্যানেলের অনুষ্ঠান প্রধান তারেক আখন্দ বলেন, 'দেশের যে মাধ্যমগুলোতে দর্শক বেশি বিনোদিত হন টিভি এর অন্যতম। ওটিটির কারণে টিভি কোণঠাসা হয়ে পড়ছে- এ কথা যাঁরা বলেন, তাঁরা আসলে নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির। মূলত আরবান শ্রেণির দর্শক, যাঁরা টাকা খরচ করে ওটিটির আয়োজনগুলো দেখেন। এটি ঠিক যে, সময়ের সঙ্গে বিনোদনের মাধ্যম অনেকটা বদলে গেছে। যখন টিভি ছিল না, সেই সময়ের মানুষ বিনোদনের জন্য যাত্রা, পালাগানের আসরে যেত।

মঞ্চে নাটক হতো। এর পর সিনেমা এলো, টিভি এলো, দর্শক বিনোদনের নতুন মাধ্যম খুঁজে পেল। একইভাবে এখন দর্শক ওটিটির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কিন্তু টেলিভিশন দর্শক এখনও হারিয়ে যায়নি। যাঁরা ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত টিভি দেখার সুযোগ পান না, তাঁরা কিন্তু ঠিকই টেলিভিশনের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলগুলোয় চোখ রাখছেন। বাংলাভিশনের কথা যদি বলি, তাহলে দেখবেন আমার সাবস্ট্ক্রাইবারের সংখ্যা ত্রিশ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এ থেকে এটাই স্পষ্ট নয় যে, টেলিভিশন দর্শক এখনও কোনো অংশে কম নয়।' মাছরাঙা টিভির অনুষ্ঠান প্রধান আরিফুর রহমানের কথায়- 'এখন দর্শক যেমন বেড়েছে, তেমনি মাধ্যমও বেড়েছে। এ কারণে মনে হচ্ছে টেলিভিশন পিছিয়ে পড়েছে। আসলে তা নয়, টেলিভিশনের দর্শক এখনও আছে। ইউটিউব বা ওটিটিতে আমরা ভিউ হিসেবে জানতে পারি কতজন দর্শক দেখেছেন। কিন্তু টেলিভিশনে সেই সুযোগ এখনও তৈরি হয়নি। কিন্তু সেটি না জানা গেলেও টেলিভিশন দর্শক দিনদিন কমছে- এ কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না।'

কোন মাধ্যম কতটা জনপ্রিয় তা নিয়ে তর্কবিতর্ক হতেই পারে। তবে এটাও বাস্তব যে, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দর্শকসংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলেছে। নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, হইচই, আড্ডা টাইমস, জি ফাইভের পথ ধরে দেশেও আলাদা করে চরকি, সিনেমাটিক, বিঞ্জসহ আরও কিছু ওটিটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। এর চেয়ে বড় বিষয় গত তিন বছরে টিভি নাটকগুলো নিয়ে যতটা আলোচনা শোনা গেছে, এর চেয়ে বেশি প্রশংসা শোনা গেছে ওয়েব সিরিজ ও ওয়েব ছবিগুলো নিয়ে। 'মহানগর', 'তাকদীর', 'লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান', 'সাবরিনা', 'বলি', 'কারাগার', 'শাটিকাপ', 'ঊনলৌকিক', 'ষ', 'আগস্ট ১৪', 'সিন্ডিকেট'সহ আরও বেশ কিছু ওয়েব সিরিজ ও ছবি স্বল্প সময়ের মধ্যে দর্শক মনোযোগ কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। সেই সুবাদে আলোচনায় এসেছেন একাধিক তরুণ নির্মাতা। একই সঙ্গে ওটিটির কারণে টেলিভিশনের অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীও নতুনভাবে দর্শক আলোচনায় এসেছেন।

ওটিটিতে বড় বাজেটে সিরিজ ও ছবি নির্মাণ হওয়ায় অভিনয় ও পরিচালনা পেশা হিসেবে নেওয়ার নতুন পথ তৈরি হয়েছে। বরেণ্য অভিনেতা ও নির্দেশক মামুনুর রশীদ বলেন, 'টিভি নাটকে বাজেট স্বল্পতা থাকলেও ওয়েবে সেই সমস্যা নেই। যে জন্য কিছুটা ভালো মানের কাজ উপহার পাচ্ছেন দর্শক।' নন্দিত অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম বলেন, 'ওয়েব সিরিজ ও ছবির দৃশ্য সেন্সরের কাঁচিতে বাদ পড়ে না। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর বিভিন্ন আয়োজনের জনপ্রিয়তা বেড়ে যাওয়ার পেছনে এটিও একটি কারণ।' নির্মাতা ও অভিনেতা সালাহউদ্দিন লাভলুর মতে, ওটিটির মতো টিভি নাটক দর্শক আলোচিত হবে- যদি বাজেট বাড়িয়ে এর নির্মাণে নান্দনিকতা তুলে ধরা যায়। তাই দর্শক চাহিদা পূরণে দুই মাধ্যমে যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে, তা দূর করতে হবে। যাতে করে দর্শক ভালো কিছু উপহার পায়।