প্রবণতাটি পুরোনো। ঝাঁ চকচকে ঝলমলে বিনোদন দুনিয়ায়, আরও স্পষ্ট করে বলা চলে সিনে ভুবনে আকছার ঘটে মনবিনিময়। থাকে লুকোচুরি! তারপর অবাক প্রকাশ। পূর্বাভাস সত্য প্রমাণ করে জানা যায় ঘটেছে পরিণয়! তারকা সন্তানের জন্মের সংবাদও মেলে। তারপর মেয়ে অথবা ছেলে নিয়ে দৃশ্যত সুখের সংসার। কিন্তু কখন যেন অগোচরে ঘুণ ধরে সেলিব্রেটি ঘরদোরে! ঘুণ কি একে বলা যায়? বরং বলা চলে তারকাজীবনে মনের রং দ্রুত বদলায়। কারণ একসঙ্গে কাটে অনেকটা সময়। মেকি ঘনিষ্ঠতা অথবা রাগ-অনুরাগের অভিনয় হলেও প্রজাপতি মন নতুন ফুলের রেণুতে মজে যেতে পারে- অস্বাভাবিক নয়। তখনই তা অস্বাভাবিক, যখন দুই ফুল আর এক মালির গল্প থেকে রুচিহীনতা আর মন পচনের তীব্র গন্ধ বের হয়। সেই দুর্গন্ধের ঝাপটা যখন পুরো পরিবেশ আক্রান্ত করে, তখন তার সামাজিক প্রতিবিধান জরুরি।

এই তালিকায় ঢালিউডে অনেকে আছেন। নায়ক-নায়িকা অথবা খল অভিনেতা- সব দশকেই। তবে এমন 'শিকারি' ক্যাসানোভা কম ছিলেন। সম্ভবত আর নেইও। ২০০৮ সালের এপ্রিল থেকে চলতে থাকা গোপন যৌথ জীবনের আভাস অনেকবারই দিয়েছে গণমাধ্যমের পেজ থ্রি। ২০১৭ সালের এপ্রিলে 'কাল সকালে' অভিষিক্তা স্বয়ং বেসরকারি টেলিভিশনে জানান দেন সন্তানসহ এক দশকের সংসারজীবনের। যদিও সেই সময় 'কোটি টাকার কাবিন'-এ মোড়ানো যুগল জীবনের 'পাসওয়ার্ড' ছিল তখন অন্য কারও কাছে। প্রথাগত ভাষায়, তিনি প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। ক্যাসানোভায় মজে যান তিনিও। তাতে কতটা ছিল হৃদয়ের টান, কতটা হিসাবনিকাশ আর কতটা অলীক মোহ- তার জবাব সাবেক সংবাদপাঠিকা ভালো বলতে পারবেন! হয়তো তিনি লিখবেন কোনো একদিন ২০১৮-তে বিয়ে, ২০২২-এ লুকানো সংসারজীবনের সন্তানসহ প্রকাশের বয়ান।

১৯৯৯ সালে সোহানুর রহমান সোহানের 'অনন্ত ভালোবাসা'র পথ পেরিয়ে অবশ্যই তিনি নিজ যোগ্যতাবলে দেশসেরা নায়ক বলে পরিচিতি আদায় করেছেন। অনেকের মনে মানের প্রশ্ন থাকতে পারে, তবে সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ তাঁর 'হিরোগিরি' পছন্দ করে- এটি মানতেই হবে। সেই পছন্দে জোয়ার-ভাটা থাকতে পারে, তবে তার বহমানতা এখনও আছে- এটিই সত্য। প্রায় দুই যুগের চলচ্চিত্রজীবনে তাঁর নিজস্ব উপলব্ধি কম হওয়ার কথা নয়।

অন্যদিকে আমজাদ হোসেনের হাত ধরে বগুড়ার মেয়েটি যখন বড় পর্দায় যাত্রা শুরু করেন ২০০৫ সালে দ্বিতীয় নায়িকা হিসেবে, তখন তাঁর সম্ভাবনাকে দৈনিক সমকালের সংস্কৃতি সাময়িকী 'নন্দন' প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছিল এই লেখকেরই এক চলচ্চিত্র পর্যালোচনায়। ১৭ বছরে ৭২টির বেশি সিনেমায় কাজ করার অভিজ্ঞতা কিন্তু কম নয়। এই অঙ্গন বোঝার জন্য, এর সামাজিক প্রভাব উপলব্ধির জন্য খুব অল্প সময়ও নয়। আর ২০১৬ সালে সংবাদপাঠিকা থেকে নায়িকায় রূপান্তর হয়ে ওঠা 'তালাশ' কন্যার এই ভুবনে অবস্থান অল্প সময় হলেও বুঝে ওঠার জন্য বোধ কিন্তু কম থাকার কথা নয়।

ত্রিভুজ দ্বন্দ্বের মাঝে পড়তেই পারে তারকার জীবনযাপন। সামলাতে হবে তাঁদেরই। সংবাদমাধ্যমের চাপ থাকবে। এটি মেনেই তো তাঁরা তারকা খ্যাতি উপভোগ করেন। বিশ্বজুড়ে তা-ই হয়। সাধারণ মানুষ তারকার সবটুকুই দেখে। সবকিছুই জানতে চায়। পুঁজি তারকা তৈরি করে নিজের স্বার্থে। তারকার জীবন বিপণন করে পুঁজি ফুলে ওঠে। তারকা তাঁর বিলাসবহুল জীবন যাপন করেন। তাই গণমাধ্যমকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বিষয়টি প্রসঙ্গে বরেণ্য অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, 'বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র বাণিজ্যের স্বার্থেই তারকা প্রথাকে উৎসাহিত করে, যার প্রয়োজনও আছে। সেই তারকার অনেক দায়িত্ব। কারণ তাঁর অনেক কাজের প্রভাব সমাজে পড়ে। তারকার জীবনে জটিলতা থাকবে, সেটি তাঁকেই সামলাতে হবে। গণমাধ্যম তার কাজ করবে। তারকাকে সব মিলিয়েই চলতে হবে। সব মিলেই যেহেতু তারকাপ্রথা, সবকিছু মেনেই তারকাকে তাঁর জীবনধারা বজায় রাখতে হবে।' অন্যদিকে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির বর্তমান সভাপতি সোহানুর রহমান সোহান বলেন, 'তারকাজীবনে দাম্পত্য সাফল্যের উদাহরণ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেই আছে। নায়করাজ রাজ্জাক এর দারুণ উদাহরণ।' প্রতিবেশী দেশের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে প্রসেনজিৎ কিংবা বলিউডে অমিতাভ বচ্চনের উদাহরণও তুলে ধরেন।

এখন ক্যাসানোভার ভাষ্য, 'স্ত্রীর মর্যাদা' তাঁর কাছ থেকে কেউ পাবেন না। তাঁর দুই স্বীকৃত সন্তানের সব দায়িত্ব নেবেন ঠিকই কিন্তু 'গলুই' গল্পকে মান্যতা দেবেন না। কাউকে অশ্রু দেবেন, নিজে ফুলে ফুলে ঘুরবেন। অথচ দীর্ঘ পথ চলায় লব্ধ অভিজ্ঞতাকে চলচ্চিত্র শিল্পীর স্বার্থে ব্যবহার করবেন- এটাই কাম্য ছিল। হীরার নাকফুলের গল্পকে অস্বীকার, পাল্টাপাল্টি দুই অতীতের কটুকথার লড়াই, সংবাদ সম্মেলনের হুমকি অথবা ব্যক্তিজীবনের জটিলতার আবর্তে চলচ্চিত্র দুনিয়াও যে ভুলভাবে চিত্রিত হয় সাধারণের কাছে, সেটি আর কবে বুঝবেন ক্যাসানোভা ও তাঁর দুই অতীত-বর্তমান ফুল!

নেতিবাচকতার বাণিজ্যিক প্রভাব আছে বটে সিনে দুনিয়ায়, তবে ইতিহাস বলে, তার স্থায়িত্ব সাময়িক। ইতিবাচকতায় লক্ষ্মীলাভ সবসময় বেশি। পরিসংখ্যান তা-ই বলে। হয়তো এটি হবে অতিকথন, তবে ভাবতে দোষ কী- কোনো এক প্রযোজক সহসা করবেন তিনজনকে নিয়ে একটি গল্পের সেলুলয়েডে চলচ্চিত্রায়ণ।