অদৃশ্য করোনাভাইরাস ২০২০ সালের শুরুতেই বিশ্বকে থমকে দেয়। মানুষ হয়ে পড়ে ঘরবন্দি; করতে থাকে হাঁসফাঁস। শব বহনে দিশেহারা স্বজনরা। যন্ত্রণার বিপরীতে মুক্ত বাতাসে প্রাণভরে শ্বাস নেওয়ার ব্যাকুলতার এমন চিত্র এঁকেছেন ক্রিস্টন বেনফিল্ড তাঁর 'দ্য ড্রিভে' শিরোনামে।

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালার ৮ নম্বর গ্যালারিতে চিত্রশিল্পী ক্রিস্টনের তুলির আঁচড় বিবেককে নাড়া দিতে বাধ্য। প্রতিদিন দলে দলে নানা বয়সীরা এসে অপার মুগ্ধতা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন এমন হাজারো চিত্রকর্ম দেখে।

গত ৮ ডিসেম্বর থেকে চলছে বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, পর্তুগালসহ ১১৪টি দেশের ৪৯৩ শিল্পীর মাসব্যাপী প্রদর্শনী। ক্রিস্টন বেনফিল্ড স্ব-প্রতিকৃতির সিরিজটি আঁকেন করোনা মহামারির প্রথম ঢেউয়ে। এতে জীবনের ধীরগতি ও আত্মদর্শনের মুহূর্তগুলো নিবিড় রূপে ধরা পড়েছে। দীর্ঘ যুদ্ধের স্মৃতি প্রত্যেক আফগানের শরীর ও মনে তৈরি করেছে স্থায়ী ক্ষত। বিপুল ধ্বংসযজ্ঞেও হাতছানি দিয়ে ওঠে জীবনের পরিচিত কাঠামো। মাতৃভূমির সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপ তুলে ধরেছেন ওয়ালী আসকারজাই, যা শোভা যাচ্ছে ৯ নম্বর গ্যালারিতে।

বৃহস্পতিবার সরেজমিন ১৯তম দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে গিয়ে ক্রিস্টন ও ওয়ালীর শিল্পকর্মের সামনে তরুণদের ভিড় দেখা যায়। তাঁদের অনেকেই তুলির ভাষা বুঝে নিচ্ছেন গ্যালারির দায়িত্বে থাকা বেসরকারি ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভের (ইউডা) চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী প্রীতি শেখের কাছ থেকে। তিনি সমকালকে বলেন, 'দুপুরের পর দলে দলে তরুণ আসেন। যাঁরা শিল্পকর্ম বুঝতে চান, তাঁদের সহযোগিতা করি। তবে বেশিরভাগ ছবি তোলায় ব্যস্ত থাকেন।'

এশিয়ার বৃহৎ চারুকলা প্রদর্শনী হিসেবে পরিচিত এ প্রদর্শনী চলবে আগামী ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত। শিল্পকলা একাডেমির কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ বিপ্লব জানান, প্রদর্শনীতে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশের ৪৫ শিল্পীর অংশগ্রহণে ৩১টি এবং বিদেশি সাত শিল্পীর সাতটি পারফরম্যান্স আর্টও উপস্থাপন করা হয়েছে।

চিত্রশালার ১ নম্বর গ্যালারিতে দেখা যায়, বাংলাদেশের চিত্রশিল্পীদের চারটি ভিডিও আর্টসহ বিভিন্ন মাধ্যমের ৯১টি শিল্পকর্ম। 'রুক্ষ ছালের আখ্যান' শিরোনামে একটি চিত্রকর্মে প্রকৃতি ও পরিবেশ জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে। বাঙালির ইতিহাস, সমাজজীবন, ধর্মজীবন, গোষ্ঠীগত প্রতীক এমনকি সমাজমানস খণ্ডিত হয়ে গেছে। সেই অনুভূতি থেকেই এসব চিত্রকর্ম।

এ গ্যালারিতে দর্শনার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী এমএএফ ফাহিম। তিনি বলেন, 'শিল্পের অন্তরীণ বিষয় অনেকেই বোঝেন না। আগ্রহীদের বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করি। যাঁরা আসছেন ঋদ্ধ হচ্ছেন। একই বৃত্তে ১১৪টি দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে বিরল ঘটনা।'

প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ইরানের চিত্রশিল্পী আরজু জারগারের 'নাউহেয়ার' শিরোনামের তিন চ্যানেল ভিডিও। এখানে স্পেস আর সময়ের মাঝে উপস্থিত থাকাই মানুষ হিসেবে আমাদের পরিচয়কে জানান দেয়। পূর্ব আফ্রিকার দেশ উগান্ডা দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন আর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের দগদগে ক্ষত নিয়ে চলছে। দেশটির চিত্রশিল্পীদের রং-তুলিতেও তা মূর্ত। উগান্ডার চিত্রশিল্পী রনেক্স আহিম্বিসিবিয়ে তাঁর শিল্পকর্মে রেখা, প্রাকৃতিক এবং জ্যামিতিক আকারের বিন্যাসের সঙ্গে রঙের দৃষ্টিনন্দন মিশেল ঘটিয়েছেন।

চট্টগ্রাম থেকে আসা ইয়াসিন আরাফাত বলেন, 'রনেক্সের কাজে ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবের গভীর যোগাযোগ রয়েছে। নিজ দেশের সংস্কৃতির পাশাপাশি এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের চিত্রশিল্পীদের কাজ দেখে অভিজ্ঞতা অর্জন সত্যিই অসাধারণ।'

শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী বলেন, 'প্রত্যেক শিল্পী নিজের ভেতর শৈল্পিক দর্শন ধারণ করেন, যা তাঁকে পরবর্তী সময়ে শৈল্পিক বুদ্ধিজীবীতে পরিণত করে। শিল্প, সমাজ ও পরিবেশের আন্তঃসম্পর্কের মধ্য দিয়ে তাঁরা শিল্পচর্চা করেন। পৃথিবীর ঘটমান বাস্তবতায় অন্যান্য দেশের মতো এশীয় শিল্পীরাও নতুন মাধ্যমে নিজের দর্শনের অনন্য প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। এখানে এসে আগ্রহীরা সত্যিকারের শিল্পরস আস্বাদন করছেন।'

একাডেমির চারুকলা বিভাগের পরিচালক সৈয়দা মাহবুবা করিম বলেন, 'প্রদর্শনীতে চিত্রকলা, ছাপচিত্র, আলোকচিত্র, ভাস্কর্য, স্থাপনাশিল্প, পারফরমেন্স আর্ট ও নতুন মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। শিল্পীরা দৈনন্দিন জীবন ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের হৃদয়তাও তুলে এনেছেন।'