শায়লা থাকেন মালিবাগ। এবার ঈদে নিজের ও পরিবারের কেনাকাটা করছেন অনলাইনে। তিনি জানান, দেশের এই পরিস্থিতিতে তিনি বাইরে বের হওয়াকে প্রাধান্য দিচ্ছেন না। তার আশপাশে বিভিন্ন বিপণিবিতান অবশ্য অল্প সময়ের জন্য খোলা থাকছে। তবুও তিনি ভিড় এড়াতে চাইছেন।

তিনি বলেন, আমি পোশাক থেকে শুরু করে কসমেটিকস, ঘরের পণ্য সবই কিনি অনলাইন থেকে। কারণ জানতে চাইলে জানালেন, সারাদিন ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকছি, বাইরে গিয়ে কেনাকাটা এ মুহূর্তে সঠিক মনে করছি না। কিন্তু অনলাইনে যেহেতু সময় নিয়ে কেনার একটা ব্যবস্থা রয়েছে, তাই এবার অনলাইনকেই বেছে নিলাম।

তিনি আরও বলেন, ঈদে অনেকের জন্য শপিং করতে হয়। তাই সময় লাগে অনেক বেশি, দিনের নির্দিষ্ট সময়, অল্প কিছু সময়ের জন্য যেহেতু কিছু দোকান খোলা থাকছে, এত অল্প সময় সবকিছু কিনে ওঠা সম্ভব হবে না বলে জানান তিনি। সুবিধামতো কেনাকাটা করতে কোনো শপিংমলে যেতে সময় দরকার হয় অনেক বেশি। কিন্তু অনলাইনে অর্ডার করলে তারাই পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে, মান নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। কোনো সমস্যা হলে তারা ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আবার দূরে কাউকে উপহার পাঠাতে এখন আর নিজের যেতে হয় না, অনলাইনে অর্ডার করে সরাসরি তার ঠিকানায় পাঠানো যায়। এটাও বড় সুবিধা।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে দেশব্যাপী লকডাউনে অনলাইনে বিলাসবহুল বা অপ্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্যের বাজার থমকে গেলেও শুরু থেকেই জমে উঠেছিল নিত্যপণ্যের বাজার, তবে এখন ঈদের কেনাকাটাতেও বেশিরভাগ মানুষ এই অনলাইন বা ই-কমার্স সিস্টেমকে বহুল আকারে বেছে নিচ্ছে। এতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ৩-৪ গুণ বেশি বেচাকেনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্নিষ্টরা।

অনলাইন কেনাকাটায় অভ্যস্ত ক্রেতারা অনেক আগে থেকেই। তবে অনেকেই জানান, হাতে ধরে দেখে কেনাকাটা করাটাকে বেশিরভাগ ক্রেতাই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। ঈদ কেনাকাটায় ঘুরেফিরে কেনাকাটা ঈদ আনন্দেরই একটা অংশ। তবে এবারের ঈদ সবার জন্যই অন্যরকম। আনন্দের দিক থেকে নিজেদের সচেতনতার কথাই সবার আগে চিন্তা করছেন সবাই।

এর কী প্রভাব পড়ছে দেশি ফ্যাশন হাউসগুলোতে? বেশিরভাগ দেশি ফ্যাশন হাউস এবং অনলাইনে ছোট ছোট পরিসরে ব্যাবসা করছেন যারা, তাদের উভয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, অনলাইনভিত্তিক এ কাজগুলোতে বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় নারীরা ব্যবসাগুলো চালাচ্ছেন- তাদের সাধুবাদ জানাতেই হবে। তবে অনলাইনে বিদেশি পোশাক কেনাকাটা করার একটা নেতিবাচক প্রভাব দেশি হাউসগুলোর ওপরে পড়েছে বিগত বছরগুলোতে। তবে এবার বেশিরভাগ দেশি হাউসগুলো অনলাইন সেবাদানকেই ঈদের সময় কেনাকাটার প্রধান মাধ্যম হিসেবে উৎসাহিত করছেন। অনেকেই অনলাইন ডেলিভারিতে নানা রকম সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে ফ্রি অনলাইন ডেলিভারি সুবিধা বাড়িয়ে দিয়েছেন অনেকেই। তবে অনেকের মতে, অনলাইন ব্যবসা পরিচালনার জন্য একটা নীতিমালা অবশ্যই প্রয়োজন, না হলে ক্রেতাদের প্রতারিত হওয়ার সুযোগ থেকেই যায়। আর সরকারও তার প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় অনেক ক্ষেত্রে।

প্রসঙ্গত, বিশ্বব্যাপী মহামারি আকার ধারণ করা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকার প্রথম পর্যায়ে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। পরবর্তী সময়ে তা দু'দফা বাড়িয়ে ছুটি সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তবে ঈদের কথা মাথায় রেখে বেশ কিছু বিপণিবিতান স্বল্প পরিসরে খুলেছে। ঢাকার অভ্যন্তরীণ বেশিরভাগ বিপণিবিতান না খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা মাথায় রেখে। তাই ক্রেতাদেরকেও করোনাকালীন সময়ের স্বাস্থ্যবিধিগুলো মাথায় রেখেই কেনাকাটা করতে হবে।

বাজারে লোকজনের ভিড় এড়াতে সাংসারিক দ্রব্যও অনেকে কেনাকাটা করছেন অনলাইনে। তিল থেকে তাল সবটাই যেহেতু অনলাইনে পাওয়া যায়, তাই বাজারে গিয়ে ঝুঁকি নিতে চাইছে না কেউই। করোনাকালীন সময়ে কেনাকাটা আগের অভ্যাসকে বদলে দিয়েছে। আগে শুধু জামা-কাপড় বেশি কেনা হতো অনলাইনে। তবে করোনা তার থাবা বসানোর পরই সবটা বদলে গিয়েছে। কোনো কোনো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ের বিপরীতে নগদ ছাড়, ক্যাশব্যাক ও উপহার দিচ্ছে, যা এই সময়ের কেনাকাটাকে বেশি উৎসাহিত করছে।

ফ্যাশন হাউস আড়ং নিয়েছে এক অন্যরকম পন্থা। তাদের আউটলেটে কেনাকাটা করতে আসার আগে প্রতিষ্ঠানটির নির্দেশনা জেনে তবেই কেনাকাটা করা যাবে বলে তারা জানিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো টাইম স্লট। ক্রেতাকে আগে টাইম স্লট বুকিং দিয়ে আউটলেটে যেতে হবে। এ জন্য প্রথমে লগইন করতে হবে আড়ংয়ের ওয়েবসাইটে www.aarong.com সাইটে গিয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে টাইম সল্গট (ক্রেতার শপিংয়ের তারিখ ও সময়) বুক করতে হবে। এরপর মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে আড়ং কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেবে, ক্রেতা কখন শপিংয়ে যাবেন। নির্ধারিত তারিখে নির্দিষ্ট সময়ের ১০ মিনিট আগে উল্লেখ করে দেওয়া আউটলেটে হাজির হতে হবে। আউটলেটে প্রবেশের আগে মোবাইলের মেসেজ দেখাতে হবে। তবেই প্রবেশ করা যাবে আউটলেটে। ১০ মে থেকে আড়ংয়ের নির্ধারিত কয়েকটি আউটলেট চালু হয়েছে। এরই মধ্যে টাইম স্লটের বুকিং শুরু হয়েছে। আড়ংয়ের এই সাইট থেকে অনলাইন শপিংও করা যাবে। এবারের ঈদে ঘরে বসে শপিং করার বিশাল আয়োজন রেখেছে আড়ং। এ ছাড়াও সারাবছর যারা অনলাইন সার্ভিস দিত, এমন প্রতিষ্ঠান যেমন দারাজ ডট কম- তারাও নানা রকম সুবিধা বাড়িয়ে দিয়েছে।

ক্রেতা কিনতে চাইলে, তাকে সেগুলো বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছে প্রায় নামকরা সব ফ্যাশন হাউসগুলোই। তবে ক্রেতাকে নিতে হবে তার নিজস্ব সুরক্ষা। এমনকি পণ্য যখন ঘরের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে, যিনি পণ্য ডেলিভারি দিচ্ছেন, তাকেও বাধ্যতামূলক সমস্ত সুরক্ষাবিধি মানতে হবে। মানে, নিশ্চিত করতে হবে তিনি মাস্ক পরে যাচ্ছেন, দূরত্ববিধি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মানছেন। তবে একাংশের বক্তব্য, পণ্য পৌঁছতে ডেলিভারিভ্যান বা কর্মীর বিশেষ কোনো পাস লাগবে কিনা, সেই খুঁটিনাটি জানাও জরুরি।

এভাবে চলছে করোনাকালীন কেনাকাটা। বদলে যাওয়া পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা। সব আয়োজন একটু যেন ভালো থাকা যায় তা নিয়ে। 

বিষয় : করোনাভাইরাস অনলাইন ঈদ করোনা ফোকাস

মন্তব্য করুন