ফ্যাশনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হচ্ছে লাইফস্টাইলেও। ঘরের সাজেও আসছে অনেক পরিবর্তন। চলতি বছরে অনেক বড় পরিবর্তন এসেছে ঘরের ফার্নিচারের। ঘরের প্রতিটি কোণকে সাজাতে এর বিকল্প নেই। ফার্নিচারের কথা বললেই সবচেয়ে উপযোগী হিসেবে ধরা হয় কাঠের আসবাব। একটা সময় কাঠের আসবাবের বিকল্প যেন কিছুই চিন্তা করা যেত না। কিন্তু সে বিষয়টি পুরোপুরি ঘুচিয়ে দিয়েছে চলতি বছরের ধারা। 

এ বছর সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে প্রসেস উড বা আর্টিফিশিয়াল কাঠ। অন্যদিকে পরিবর্তন এসেছে ফার্নিচারের ডিজাইন এবং নকশাতেও। একদম সাদামাটা ডিজাইনের মাধ্যমে আধুনিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত ছিল ফার্নিচার ব্র্যান্ডগুলো। ফার্নিচারে রঙিন ফেব্রিকের ব্যবহার ছিল এবার লক্ষ্য করার মতো। আগের মতো এখন আর ফলের ডিজাইন বা বেশি কারুকার্য ব্যবহার হচ্ছে না। সোফাতে এসেছে ফিউশন। একসময় পাঁচটি বসবার জায়গা নিয়ে একটি সেট। সেটি অবশ্যই হবে একই ডিজাইনের। এ বিষয়টি থেকে অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে বর্তমান প্রজন্ম। অনেক ক্ষেত্রে সোফার জায়গা দখল নিয়েছে ডিভান।

ঘর সব সময় থাকবে পরিপাটি এবং গোছানো। তাই ফার্নিচারের আধিক্য অনেকেই এড়িয়ে গেছে এই বছরটিতে। ফার্নিচারের কাঠের ব্যবহার অনেকটাই কমিয়েছে। অন্যদিকে হয়েছে আগের থেকে বেশি টেকসই। ছোট ঘরকে খুব সুন্দরভাবে সাজিয়ে দিতে আসবাবগুলোতে আনা হয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। বসবার ঘরের সোফাকে অনেকভাবে পরিবর্তনের সুযোগ দিয়েছে এসব নতুন ধারার ফার্নিচার। তাই একজন অতিথি এলে খুব সহজে সোফাকে বানিয়ে ফেলতে পারবেন খাট। ছোট ছোট এসব পরিবর্তন ফার্নিচার জগতকে নিয়ে গেছে অন্যমাত্রায়, যা এই বছরে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল।

শোবার ঘরের ফার্নিচারের মধ্যে খাটগুলোতে আগের মতো বাহারি কারুকার্য নেই। তবে ডিজাইনে এসেছে নতুনত্ব। এসব ডিজাইন যে কারও নজড় কাড়তে বাধ্য। জাজিম এবং ম্যাট্রেসের ব্যবহারোপযোগী করে বানানো হয় এখনকার বেশিরভাগ খাট। এ বছর বেশি চলেছে তুলনামূলকভাবে নিচু ধাঁচের খাটগুলো। এখন এসব আসবাব তৈরিতে মনোযোগী হচ্ছেন ইন্টেরিয়র ডিজাইনররা। ফলে ভিন্নতা আসতে বাধ্য। কোথাও কোথাও দেখা মিলেছে প্রাচ্যাত্যের রূপও। কিং সাইজের খাটের চাহিদা এখন অনেকটাই কম। বেড়েছে ডাবল এবং সেমি বেড। শিশুদের উপযোগী করেও এখন তৈরি হচ্ছে খাট, যা আগে কখনোই চিন্তাই করা যেত না। কাঠের ব্যবহার অবশ্যই হচ্ছে, তবে তা আধুনিক উপায়ে। এসব আসবাবেও ব্যবহার হচ্ছে রেইনট্রি, মেহগনি, কড়ই, সেগুন, গজারি, জাম, আম ও কাঁঠাল প্রভৃতি কাঠ। তবে কাঠের বিকল্প হিসেবে প্রাধান্য পাচ্ছে মালয়েশিয়ান প্রসেস উড। এই প্রসেস উডের মধ্যে রয়েছে পার্টিক্যাল বোর্ড, ভিনিয়ার্ড বোর্ড, এমডিএফ বোর্ড, প্লাই বোর্ড।

শোভা বাড়াতে বা ঠিক রাখতে শোবার ঘরের ফার্নিচারগুলো সাধারণত একই রঙের রাখা হয়। সেক্ষেত্রেও প্রাধান্য পাচ্ছে একদম সাদাসিধে। নিজেদের বাড়ি বা ফ্ল্যাট হলে অনেকেই করছেন ওয়াল ক্যাবিনেট। এতে বাড়তি জায়াগা নষ্ট হচ্ছে না, উপরন্তু বৃদ্ধি পাচ্ছে সৌন্দর্য। খাটের পাশে এখন ইজি চেয়ার। বাড়তি জায়গা থাকলে ছিমছাম একটি রিডিং কর্নার। এ ঘরটিতে প্রাধান্য পাচ্ছে এখন গাঢ় রঙের ফার্নিচার। ডাইনিং টেবিলগুলোতে এসেছে অনেক পরিবর্তন। গত বছরে অনেক বেশি প্রাধান্য ছিল গ্লাসের ব্যবহার। এবারও কিছুটা আছে। কিন্তু একটু ভিন্নভাবে ফিরে এসেছে পুরো কাঠের টেবিল। এতে ব্যবহার হয়েছে একদম পলিশ কাঠ। চেয়ারগুলোতে যুক্ত হয়েছে ফোমের ব্যবহার। ছোট পরিবারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এবার চার ও ছয় সিটের ডাইনিং টেবিল বেশি এসেছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রায় দশ বছর আগের সেই বেঞ্চ আবার ফিরে এসেছে আধুনিক আঙ্গিকে। ছয় সিটের ডাইনিং টেবিলে এখন তিন পাশে থাকছে চারটি চেয়ার। আর অন্য পাশে দেওয়া হচ্ছে বেঞ্চ। তবে এতে যুক্ত হয়েছে বাড়তি ফোম। ডাইনিংয়ের পাশাপাশি আরও একটি টেবিল যুক্ত হয়েছে। ঠিক ধরেছেন টি টেবিল। সোফার সঙ্গে থাকা টি টেবিল হয়। এটা চায়ের আড্ডার জন্য করা হয়েছে। ঘরের যে কোনো একটি ফাঁকা জায়গাতে এ টেবিলটি এখন শোভা পাচ্ছে। সাধারণত ছোট একটা গোলটেবিলের সঙ্গে চার চেয়ার বা টুল দিয়ে তৈরি হয় এটি। অনেকে আবার সোফার সঙ্গে থাকা টি টেবিলটি পরিবর্তন করে বানিয়ে ফেলেন নতুন এই আসবাবটি। ছোট আরামদায়ক টুলে বসে চায়ের আড্ডা দেওয়া টি টেবিলটা এ বছরের একটি নতুন সংযোজন ছিল।

ফার্নিচারের মধ্যে এই বছর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে সোফাতে। যে যেভাবে পেরেছে ড্রইং রুমটাকে আলাদা করার চেষ্টা করেছে। কেউ একদমই নিচু সোফা, কেউ বা ডিভান আবার কেউ রেখেছে শুধু টুল। অনেকে শুধু কুশন, ফোম আর সেন্টার টেবিল দিয়েই সাজিয়ে তুলেছে তার বসবার ঘরটি। ডিভান বা সোফাতে এবার ব্যবহার হয়েছে এক রঙা ফেব্রিক্স।

সময়ের প্রয়োজনে এসব নতুন নতুন ফার্নিচার নিয়ে এসেছে আমাদের দেশি ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের মধ্যে রয়েছে হাতিল, আকতার, ব্রাদার্স, নাভানা, ডেলটা, নাবিলা, নিউ এথেনটিক, পারটেক্স, অটবি, নাদিয়া, উড মার্কস, গ্রিন ফার্নিচার, উডি রিজন্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে ফার্নিচারের সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার দেখিয়ে এ বছর তাক লাগিয়েছে ইশো। হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ৩১ বছর ধরে ফার্নিচার নিয়ে কাজ করছে হাতিল। একটা সময় খুব ভারী এবং মোটা কাঠের ফার্নিচারের বেশ চল ছিল। এখন সেগুলো একেবারে বিলীনের পথে। এখন স্লিম ফার্নিচার বেশি মানানসই। এ বছর ফার্নিচারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এখানেই। শুধু হাতিল নয়, সব দেশি ফার্নিচার প্রতিষ্ঠানই এই বিষয়টি লক্ষ্য রেখে আসবাব তৈরি করছে।

বিষয় : ফ্যাশন লাইফস্টাইল

মন্তব্য করুন