ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

সাক্ষাৎকার

দীর্ঘায়িত হতে পারে মূল্যস্ফীতির চাপ

দীর্ঘায়িত হতে পারে মূল্যস্ফীতির চাপ

ড. আব্দুর রাজ্জাক, গবেষণা পরিচালক, পিআরআই, এবং চেয়ারম্যান, র‌্যাপিড

--

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২২ | ১২:০০

সমকাল: নতুন একটি অর্থবছর কোন প্রেক্ষাপটে শুরু হলো?

আব্দুর রাজ্জাক: সনাতন ও নিয়মিত চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি কিছু নতুন সমস্যা এবং দেশ ও দেশের বাইরের অর্থনৈতিক গতিধারার প্রতিকূল উঠতি প্রবণতার মধ্যে নতুন অর্থবছর শুরু হলো। বিগত অর্থবছরের শুরুতে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত, টাকার বিনিময় হার এবং মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি অত্যন্ত সহায়ক ছিল। কিন্তু বিগত কয়েক মাসে এসব নির্দেশকের বেশ অবনতি ঘটে। সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের যে দীর্ঘদিনের সুনাম রয়েছে, তা হঠাৎ করেই যেন চাপের মধ্যে পড়ে। এসবের মধ্যে নতুন অর্থবছরের বাজেট দেওয়া হয়েছে পুরোনো সমস্যা ও অভিযোগ নিয়ে। যেমন সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যায় না বা শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যথেষ্ট বরাদ্দ দেওয়া হয় না। ধরে নেওয়া হয়েছে জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আদায় খুব একটা বাড়বে না। কাজেই সরকারি ব্যয়ের প্রসারে সেই পরিচিত সীমাবদ্ধতা থাকছেই। সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ বন্যা একটি নতুন চাপ তৈরি করবে। এর পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন সামরিক সংঘাতের ফলে উদ্ভূত বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তায় যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, তা দীর্ঘতর হবে বলে মনে হচ্ছে। পৃথিবীর ধনী দেশগুলোতে অর্থনৈতিক মন্দা অবস্থার প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি, যা বিশ্ববাণিজ্য শ্লথ করে দিতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে চলতি অর্থবছরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা (শতকরা ২০ ভাগ) অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, চাপের মুখে থাকা টাকার বিনিময় হার আর প্রতিকূল বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ তার আকাঙ্ক্ষিত উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার (৭.৫%) কীভাবে অর্জন করবে, সেই প্রশ্ন নিয়েই নতুন অর্থবছর শুরু হলো।

সমকাল: যে বাজেট দেওয়া হলো, তাতে কি সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় যথাযথ পদক্ষেপ রয়েছে?

আব্দুর রাজ্জাক: বাজেটের আগেই বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর চাপ কমানোর জন্য টাকার বিনিময় হার নমনীয় করা হয়েছে। এটি টাকার দীর্ঘদিনের অতিমূল্যায়িত সমস্যা লাঘবে সাহায্য করবে। কিন্তু বিনিময় হারের সমন্বয় এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন মূল্যস্ফীতির উচ্চ প্রবণতা রয়েছে। নমনীয় হার ব্যবস্থায় টাকা যদি আরও দুর্বল হয়, তা মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দেবে। অবশ্য টাকার দাম পড়ে যাওয়ায় রপ্তানির সক্ষমতা বাড়বে এবং সেই সঙ্গে রপ্তানিকারকদের টাকার অঙ্কে আয় বাড়বে, যা মোট রপ্তানির পরিমাণকে বাড়াতে পারে। তবে বিশ্বঅর্থনীতি একটি মন্দা অবস্থায় উপনীত হচ্ছে, রপ্তানি আয়ে আশানুরূপ ভালো করা কঠিন হবে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য সুদের হারের নমনীয়তা প্রয়োজন। স্থির সুদ কাঠামো থাকা মানে একটি শক্তিশালী আর্থিক হাতিয়ার প্রয়োজনের সময় কাজে না লাগানো। মূল্যস্ফীতির কথা মাথায় রেখে হয়তো বাজেট ঘাটতি বিগত বছরের কাছাকছি রাখা হয়েছে। যদিও একথা সত্য যে, সাম্প্রতিক সময়ে বাজেটের মাত্র শতকরা ৮০ ভাগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। সে ক্ষেত্রে বলতে হবে যে, বাস্তবায়ন করার সক্ষমতার অভাব মূল্যস্ফীতির ওপর সরকারি খরচের পূর্ণাঙ্গ প্রভাবকে খানিকটা দুর্বল করতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পেছনে ভোক্তার ব্যয় সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এ বছর পণ্য ও সেবা খাতের প্রকৃত চাহিদাকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল করে রাখতে পারে। সে ক্ষেত্রে অভীষ্ট প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

সমকাল: নতুন অর্থবছরে কি উচ্চ মূল্যস্ফীতি বহাল থাকবে? নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোন কোন নীতি নেওয়া যেতে পারে?

আব্দুর রাজ্জাক: বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং সেই সঙ্গে টাকার মূল্যমান কমে যাওয়ার অনিবার্য ফল হচ্ছে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি। বিভিন্ন পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘায়িত হতে পারে। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত বন্ধ হওয়ার মাধ্যমে যদি খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহে শৃঙ্খলা ফিরে আসে এবং চীনের নেওয়া কভিড নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা কিছুটা শিথিল হলে অন্যান্য পণ্যসামগ্রীর দামে কিছুটা অধোগতি নেমে আসতে পারে।

দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপকে খানিকটা সহনীয় করা যায়। অনেক সময় বাজার ব্যবস্থায় ত্রুটি ও জোগানকারীদের সংঘবদ্ধ কারসাজি বাজারে দাম বাড়ার জন্য দায়ী। এ প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক কমিয়ে, এমনকি সাময়িকভাবে ভ্যাট আদায়ে ছাড় দিয়েও মূল্য বাড়ার গতিকে দুর্বল করা যেতে পারে। একটি অন্যতম প্রধান নীতি হওয়া উচিত, দুস্থ ও গরিব মানুষদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অন্য জায়গা থেকে খরচ কমিয়ে হলেও খাদ্য নিরাপত্তায় সাহায্য বাড়ানো দরকার।

সমকাল: বাংলাদেশ এলডিসি থেকে মসৃণ উত্তরণে যথাযথ প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে করেন? ঘাটতি থাকলে আপনার পরামর্শ কী?

আব্দুর রাজ্জাক: এলডিসি থেকে উত্তরণে প্রস্তুতির ব্যাপারে সচেতনতা বেড়েছে। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং এগুলো নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু এ আলোচনা ও চিন্তা-চেতনার প্রায়োগিক ঘাটতি রয়েছে। একটি সুযোগ ছিল যে, চিরাচরিত তিন বছর মেয়াদি না করে রপ্তানি নীতিকে এলডিসি থেকে উত্তরণে একটি দীর্ঘতর রূপকাঠামো হিসেবে আরও বলিষ্ঠভাবে তৈরি করা। বাজেটে অন্যান্য খাতের রপ্তানির জন্য তৈরি পোশাকশিল্পের মতো কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এটি একটি ভালো পদক্ষেপ। আরও কিছু বৈষম্য কমানোর সুযোগ রয়েছে- বিশেষ করে, সব রপ্তানিকারককে বন্ডেড ওয়্যারহাউসের সুবিধা দেওয়া উচিত। বাণিজ্যনীতিকে সময়োপযোগী করতে হবে, যেন এলডিসি সুবিধা উঠে গেলেও রপ্তানি খাতে বিনিয়োগ অনাকর্ষণীয় হয়ে না পড়ে এবং যেসব দেশে বড় রপ্তানির বাজার রয়েছে, তাদের সঙ্গে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাণিজ্য চুক্তি করা সম্ভব হয়। একটি সমন্বিত নীতিমালা তৈরি করে তার আওতায় বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং সংস্কার কর্মসূচি বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে। রপ্তানি খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগ টানাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

সমকাল: ডব্লিউটিও মন্ত্রী পর্যায়ের ১২তম সম্মেলনে এলডিসির দাবি কি যথাযথভাবে পূরণ হয়েছে? বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎকে কীভাবে দেখেন?

আব্দুর রাজ্জাক: সত্যিকার অর্থে এবার ডব্লিউটিও মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক থেকে স্বল্পোন্নত দেশগুলো কোনো কিছু পায়নি। প্রকৃতপক্ষে, বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা এক বিরাট সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ২০০১ সাল থেকে চলা দোহা ডেভেলপমেন্ট রাউন্ডের দরকষাকষি বা আলোচনা মূলত এখন নিখোঁজ হয়ে পড়েছে। ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যে তীব্র রেষারেষি চলছে, তার চরম খেসারত দিতে হতে পারে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বহুপক্ষীয় সহযোগিতাকে।

সমকাল: পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হলো। এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে আপনার পরামর্শ কী?

আব্দুর রাজ্জাক: পদ্মা সেতু একটি মাইলফলক অর্জন এবং এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিশাল। এ সেতুকে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সেতুর ফলে যে সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা হলো, তা কিন্তু ঢাকার অভিকর্ষ এবং গুরুত্বকেও বাড়িয়ে দেবে। এই আকর্ষণ রোধ করে উন্নয়ন বিকেন্দ্রীভূত করতে হলে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলোতে বিনিয়োগে ধাক্কা দিতে হবে। অনেক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এই জেলাগুলোতে করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে অন্তত দুটি বা তিনটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সেগুলোতে বড় মাত্রার বিনিয়োগের সন্নিবেশ ঘটাতে হবে। এসব অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে যেতে পারলে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাকির হোসেন

আরও পড়ুন

×