ঢাকা শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪

ডলারের বিকল্প লেনদেন কতটুকু সম্ভব

ডলারের বিকল্প লেনদেন কতটুকু সম্ভব

ওবায়দুল্লাহ রনি

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২২ | ২৩:৫৫

বিশ্বের দুই পরাশক্তি রাশিয়া ও চীন বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নানা হুমকি বা নিষেধাজ্ঞায় পড়েছে। বিশ্ববাণিজ্যে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরিতে বেশ আগ থেকে নিজেদের মুদ্রায় লেনদেন নিষ্পত্তির বিভিন্ন মডেল নিয়ে এগোচ্ছে দেশ দুটি। এ জন্য তারা বিশ্বের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য লেনদেন নিষ্পত্তি ব্যবস্থা সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশনের (সুইফট) বিকল্প নিজস্ব নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু করেছে। কিছু দেশ সেই ব্যবস্থায় যুক্ত হয়ে লেনদেনও করছে। বাংলাদেশের এ ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়া-না হওয়ার আলোচনা অনেক পুরোনো। নতুন করে বিষয়টি সামনে এসেছে করোনা অতিমারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে, টাকার বিপরীতে ইউএস ডলারের শক্তিশালী অবস্থান ও সংকটকে কেন্দ্র করে। ডলারের বিকল্প মুদ্রা কীভাবে কতটা সম্ভব, তা নিয়েও অনেকে এখন আলোচনা করছেন। যদিও দেশ দুটির নিজস্ব লেনদেন ব্যবস্থায় যুক্ত না হয়ে কারেন্সি সোয়াপ বা মুদ্রার অদল-বদল পদ্ধতিতে পণ্যমূল্য পরিশোধ বিষয়ে এখন আলোচনা জোরালো হয়েছে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে এককভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে ডলার। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশই ডলারে সম্পন্ন হওয়ায় কোনো সংকট হলে তার প্রভাব পড়ে বিভিন্ন দেশে। বিশেষ করে মূল্যস্ম্ফীতির ওপর প্রভাব পড়ে। যে কারণে লেনদেন নিষ্পত্তিতে ডলারের বিকল্প মুদ্রা এখন প্রয়োজনীয়। তবে কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর অন্যতম কারণ, বেশিরভাগ দেশের মুদ্রার মূল্যমান নির্ধারণ অনেকটা নিজেদের ওপর নির্ভর করে। তবে ডলারের ওঠা-নামা হয় স্বাধীনভাবে। বৈশ্বিক লেনদেন নিষ্পত্তিতে গ্রহণযোগ্য ব্যাংকের বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক। সুইফটের মাধ্যমে তারা ডলারেই লেনদেন নিষ্পত্তি করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ রয়েছে, তার অর্ধেকের বেশি ডলারে। বিশ্বের যে কোনো দেশ বাণিজ্য নিষ্পত্তিতে ডলারকেই প্রাধান্য দেয়। সব মিলিয়ে ডলারের বিকল্প অন্য মুদ্রার প্রয়োজন হলেও তা বাস্তবায়ন কঠিন মনে হয়।

বাংলাদেশের জন্য ডলারের বাইরে অন্য মুদ্রায় লেনদেন নিষ্পত্তি যেন আরও কঠিন। কেননা, আমাদের রপ্তানি পণ্যের বড় অংশের ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ অঞ্চল। এসব দেশ ডলারের বাইরে অন্য মুদ্রায় দাম পরিশোধ করবে না; এটাই বাস্তবতা। বাংলাদেশের মোট আমদানির ২৫ শতাংশের বেশি হয় চীন থেকে। ভারত থেকে হয় ১৭ শতাংশের মতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চীনের রপ্তানিকারকরাও ডলারের বাইরে অন্য মুদ্রায় পরিশোধ নিতে চান না। রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য খুব সামান্য। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের আমদানির প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং রপ্তানির ৯৭ শতাংশ নিষ্পত্তি হয় ডলারে।

এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ অঞ্চলের বিরাগভাজন হয়ে ডলার-ভিন্ন অন্য মুদ্রায় যেতে আগ্রহ দেখান না এখানকার ব্যাংক ও ব্যবসায়ীরা। আবার নানান ঝুঁকি এড়িয়ে ডলার-ভিন্ন মুদ্রায় লেনদেনকে বিশ্বাসযোগ্য পর্যায়ে নেওয়া বেশ জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এতে বাংলাদেশের ব্যবসা হারানোরও আশঙ্কা থাকে। বেশ আগ থেকে চীন ও রাশিয়ার নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন নিয়ে আলোচনা চলছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে এই আলোচনায় নাম লিখিয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল দেশ ভারত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এখানকার লেনদেনের অধিকাংশ ডলারে নিষ্পত্তি হয়। যে কারণে ব্যাংকগুলোর নস্ট্রো অ্যাকাউন্টের ৮৫ শতাংশ ইউএস ডলারভিত্তিক। আবার দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উল্লেখযোগ্য অংশ ডলারের বিভিন্ন ইনস্ট্রুমেন্টে বিনিয়োগ করা আছে। তা ছাড়া রাশিয়ার বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের ওপর বেশ আগ থেকে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। বিদ্যমান বাস্তবতায় পশ্চিমা দেশের অবরোধের ঝুঁকি এড়িয়ে এসপিএফএস নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। তবে বিকল্প হিসেবে টাকা-রুবল সোয়াপের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাশিয়া সফরের পর থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনার পর ২০১৮ সালে মস্কোতে একটি দ্বিপক্ষীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে একটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। যেখানে বাধাহীন ব্যাংকিং লেনদেন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যায়ে একটি প্ল্যাটফর্ম গঠনের সুপারিশ আসে। এর পর ২০১৯ সালের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংককে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল মেসেজিং সিস্টেমে (এসপিএফসি) যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেয় রাশিয়া। যেখানে দুই দেশের নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন নিষ্পত্তির কথা বলা হয়। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক শেষে তাতে যোগদান না করে কারেন্সি সোয়াপ পদ্ধতিতে লেনদেন নিষ্পত্তি নিয়ে আলোচনা হয়। এ উপায়ে লেনদেন নিষ্পত্তির বিষয়ে গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সোয়াপের অনুমোদন দিলেও এখনও তা কার্যকর হয়নি।

রাশিয়ার সঙ্গে কারেন্সি সোয়াপ কী ও কীভাবে :গত বছর রাশিয়ার সঙ্গে কারেন্সি সোয়াপ বা মুদ্রার অদল-বদল পদ্ধতি কী হবে সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একটি ধারণাপত্রের অনুমোদিত হয়। এ উপায়ে বাংলাদেশ রাশিয়ার জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা রাখবে। রাশিয়া বাংলাদেশের জন্য রাখবে দেড় হাজার কোটি রুবল। ব্যাংকের মাধ্যমেই এলসি খুলে পণ্য আমদানি-রপ্তানি হবে। তবে এক দেশের আরেক দেশে শুরুতেই কোনো অর্থ যাবে না। ব্যাংকগুলো নিজ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সমপরিমাণ মুদ্রা বিনিময় করবে। মুদ্রা বিনিময়ের সময় স্বল্পমেয়াদি যে ঋণের সৃষ্টি হবে তার সুদহার পূর্বনির্ধারিত থাকবে। তিন বছরের জন্য কারেন্সি সোয়াপ চুক্তি হবে। লেনদেন নিষ্পত্তি হবে তিন মাস অন্তর। বিনিময় শেষে যে দেশের যা পাওনা দাঁড়াবে তা তৃতীয় একটি মুদ্রা তথা- ডলার, ইউরো, পাউন্ড বা এ ধরনের আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুদ্রায় নিষ্পত্তি করা হবে। অবশ্য রাশিয়া কারেন্সি সোয়াপের চেয়ে দেশটির মেসেজিং সিস্টেম এসপিএফসিতে বাংলাদেশকে যুক্ত করায় বেশি আগ্রহী।

চীনের সঙ্গে লেনদেন নিষ্পত্তির বিকল্প ভাবনা :পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববাণিজ্যে শক্তিশালী হওয়ার লক্ষ্যে এক অঞ্চল, এক পথ বা বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) কর্মসূচিসহ নানা উদ্যোগ রয়েছে চীনের। বিশ্ববাণিজ্যে চীনা মুদ্রা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াতে চীন ক্রস-বর্ডার ইন্টার ব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস) চালু করেছে। পাশাপাশি সোয়াপ তথা দুই দেশের নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তি পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা চালাচ্ছে। বাংলাদেশে অবস্থিত চীনা দূতাবাস এ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছে। এসব ছাপিয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বিবেচনায় ২০১৮ সালের আগস্টের এক নির্দেশনায় ইউএস ডলার, ইউরো, জাপানি ইয়েন, যুক্তরাজ্যের পাউন্ড এবং কানাডিয়ান ডলারের পাশাপাশি চীনা ইউয়ানে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশি কোনো ব্যাংক চাইলে চীনের মুদ্রায় ক্লিয়ারিং হিসাব খুলে লেনদেন নিষ্পত্তি করতে পারে। তাতেও সাড়া নেই বললে চলে। এসবের মধ্যে বাংলাদেশের দ্বিতীয় আমদানিকারক দেশ ভারত নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন নিষ্পত্তির ভাবনার কথা জানিয়েছে। তবে চীন-রাশিয়ার পর ভারতীয় মুদ্রায় লেনদেন নিষ্পত্তি কতটা বাস্তবায়ন করা যায় সেটি নিয়ে সবার মধ্যে আগ্রহ আছে।

জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম সমকালকে বলেন, প্রয়োজনীয়তা মানুষকে নতুন কিছু শেখায়। করোনা অতিমারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ডলারের চাহিদা ও দর অনেক বেড়েছে। এখন ডলারের বিকল্প ভাবতে হচ্ছে। যদিও হঠাৎ অন্য মুদ্রায় যাওয়া জটিল। তবে একটি বিষয় ভাবতে হবে। আগামীতে হয়তো ডলারের পরিবর্তে ক্রিপ্টো কারেন্সি হবে বৈশ্বিক লেনদেন নিষ্পত্তির প্রধান মুদ্রা। তখন তো আমাদেরও ক্রিপ্টো কারেন্সির দিকে যেতে হবে। ফলে ধীরে ধীরে বিকল্প মুদ্রায় যাওয়ার চেষ্টা করার সময় এসেছে।

ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী একই ধরনের অভিমত জানান। তিনি সমকালকে বলেন, ডলারের বিকল্প মুদ্রায় লেনদেন এখন প্রয়োজন হয়ে দেখা দিয়েছে। কেননা, কোনো ঘটনা ঘটলেই বিশ্বব্যাপী ডলারের দর বেড়ে যায়। এর প্রভাবে মূল্যস্ম্ফীতি বাড়ে। ডলার-ভিন্ন অন্য মুদ্রায় লেনদেন নিষ্পত্তি বাস্তবসম্মত।

আরও পড়ুন

×