ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

প্রেরণা

'গুঞ্জন' ও স্বপনের সঙ্গে একদিন

'গুঞ্জন' ও স্বপনের সঙ্গে একদিন

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২২ | ২২:২৯

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আগেই এক পাঠাগারের খোঁজ পাই। তবে সুযোগ হচ্ছিল না বলে যাওয়াও হচ্ছিল না। সম্প্রতি একটি দিন কাটিয়ে এলাম সেই পাঠাগার ও উদ্দীপ্ত কিছু মানুষের সঙ্গে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার এক গ্রামে পাঠাগারটির অবস্থান। গ্রামটির নাম 'সুহাতা'। জেলা সদর থেকে নদীপথে স্পিডবোটে নবীনগর যেতে সময় লাগে প্রায় ২৫ মিনিট। সড়কপথ বন্ধ থাকায় সে পথেই রওনা দিলাম। নবীনগর নেমে আরও প্রায় আধ ঘণ্টা যেতে হয় রিকশা বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায়। সবুজের আচ্ছাদনে সমৃদ্ধ এক গ্রাম সুহাতা। তবে গ্রামটি শিক্ষা-দীক্ষায় এক ভিন্ন খ্যাতি অর্জন করেছে; যা এক যুগ আগেও অনেকটা অকল্পনীয় ছিল। সে স্বপ্নের বীজ বোনা হয় প্রায় ১৮ বছর আগে, যখন 'গুঞ্জন পাঠাগার' গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন এক 'বইপাগল' মানুষ- তাঁর নাম হাবিবুর রহমান স্বপন। গ্রামে কেউ ডাকেন স্বপন মিয়া, কেউবা স্বপন স্যার। তবে 'বইমজুর' হিসেবে পরিচয় দিতে বেশি ভালোবাসেন।

স্বপন মিয়ার সঙ্গে তখনই যে প্রথম দেখা, তা তাঁর সঙ্গে কথা বলে বোঝার উপায় নেই। তিনি যেন মন খারাপ করতে জানেন না। সবসময় মুখে লেগে আছে এক অমলিন হাসি। নিজের বাড়ির যেটুকু অংশ ভাগে পেয়েছেন, সেখানেই গুঞ্জনের ঠিকানা। সেখানে বসেই কথা হচ্ছিল স্বপন মিয়ার সঙ্গে। গুঞ্জন নিয়ে বলার সময় তাঁর চোখ দুটো ছলছল করছিল। স্বপন জানান, ছোটবেলায় বই পড়ার প্রবল ইচ্ছা ছিল তাঁর; কিন্তু পড়ার জন্য বই পেতেন না। অন্যের কাছ থেকে বই এনে পড়তেন। তখন মনে হয়েছে, তাঁর মতো অনেক গরিব মানুষ আছেন, যাঁরা ইচ্ছা থাকলেও বই পড়তে পারেন না। সেই চিন্তা থেকেই পাঠাগার গড়ার পথে যাত্রা শুরু।

মাত্র তিনটি বই আর একটি বাঁশের তাক বানিয়ে ২০০৪ সালের ৩০ মার্চ যাত্রা শুরু করে স্বপনের 'গুঞ্জন পাঠাগার'। গ্রামের এক বোনের মাধ্যমে এনজিও থেকে ৮ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দিয়েছিলেন টিনের চালা। জীর্ণ ঘরের পাশে উঠানের এক কোণে ছিল গুঞ্জন। ১৮ বছরের যাত্রায় এখন বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার।
মাত্র দেড় বছর বয়সে বাবাকে হারান স্বপন। তাঁর বাবা হারুন মিয়া ছিলেন পশুচিকিৎসক। বাবার মৃত্যুর পর তিন সন্তানকে নিয়ে অকূল সাগরে পড়েন মা রাজিয়া খাতুন। তাঁদের লালন-পালনে রাস্তার মাটি কাটার কাজ শুরু করেন। সংসারের অভাব মেটাতে স্বপনের বড় দুই ভাই রিকশা চালাতে শুরু করেন। এমন বাস্তবতাতেও স্বপন বইয়ের মাঝেই নিজেকে খুঁজে ফেরেন।

অনেকে নিরুৎসাহিত করেছেন, তির্যক সমালোচনায় বিদীর্ণ করেছেন। স্বপন জানান, পাঠাগারের জন্য ২০০৭ সালে ভেঙে যায় তাঁদের পরিবার। পৃথক হন দুই ভাই। মা, খালা, নানিসহ ছয়জনের দায়িত্ব পড়ে স্বপনের কাঁধে। অর্থাভাবে দুবার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। স্বপন তখন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এসএসসি পরীক্ষার্থী। টিউশন থেকে আয় দেড় হাজার টাকায় পরিবারের ভরণ-পোষণের পাশাপাশি চলে লেখাপড়া ও পাঠাগার। জীবিকার তাগিদে দিনমজুর, মাইকিং, হকারের কাজও করেছেন স্বপন। তবুও দমে যাননি। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করার পর স্বপন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন।

চাঁদপুরে একটি কলেজে চাকরি হয়েছিল; কিন্তু তিনি সেদিকে যাননি। কারণ তিনি পাশে না থাকলে গুঞ্জন যে অসহায় হয়ে পড়বে! তিনি এখন পাশের একটি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত চলে পাঠাগারের কাজ। যখন বিকেল ৩টা ছুঁই ছুঁই পাঠাগারে আসতে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী শিশু, কিশোর, তরুণের দল। স্কুলের শিক্ষার্থীদের বাড়ির কাজ দেখা হচ্ছে। সে কাজে সহযোগিতা করছে বড় ক্লাসের শিক্ষার্থীরা। তাদের ছোট-বড় দুটি দলে ভাগ করে গান, কবিতা আবৃত্তি, কুইজের আয়োজন এক অভিনব শিখন পদ্ধতির জানান দেয়। এমন করে যদি প্রতিটি স্কুলে জ্ঞানচর্চার পথটা খোলা থাকত, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতাটা ভিন্ন হতো। স্কুল-কলেজ আর বই হয়ে উঠত শিক্ষার্থীদের জীবনের অংশ, যেখানে নম্বর আর চাকরির দৌড় নেই।

স্বপন মিয়া বলেন, 'মায়ের পরে পাঠাগার আমার প্রথম ভালোবাসা। বিশ্বাস করি, পৃথিবীকে বদলে দিতে পরমাণু যুদ্ধ নয়, জ্ঞান যুদ্ধ দরকার। পাঠাগারের মাধ্যমে সারাবিশ্বে জ্ঞান যুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে চাই।'

যে পথে গুঞ্জনে গিয়েছিলাম, সে পথেই ফিরলাম। তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। সময় যেন নিমেষেই চলে গেল! এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছিল। স্পিডবোটে হাওয়ার ঝাপটায় বারবার মনে দোল খাচ্ছিল- যখন নতুন প্রজন্ম বইবিমুখ হয়ে পড়ছে, কিছু আলোকদীপ্ত মানুষ সে সময়েও বইয়ের দিকে নজর ফেরাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সব শেষ হয়ে যায়নি, সব শেষ হয়ে যায় না।

আরও পড়ুন

×