ঢাকা রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

প্রচ্ছদ

‘সম্মিলিত অবচেতনে লেখক মানেই পুরুষ’

‘সম্মিলিত অবচেতনে লেখক মানেই পুরুষ’

--

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০

নোবেল পুরস্কারের এবারের আসরে আনি আরনোর নাম ঘোষণার পরই তাঁর সাহিত্যের ঘরানা চিহ্নিত করে নিবন্ধ লেখায় সমালোচকরা সক্রিয় হয়েছেন। আমাদের মতো অনেক দেশে ৮২ বছর বয়সী লেখকের সাহিত্য অনুবাদের আগে পরিচিতিমূলক নিবন্ধ লিখতে হয়েছে। তবে তিনি ফ্রান্সসহ ইংরেজিতে পড়ুয়াদের মধ্যে অপরিচিত নন; বরং তাঁর কোনো কোনো বই বহু বিক্রির তালিকায় থেকেছে। নোবেল কমিটি বলছে, তিনি সাহস ও তীক্ষষ্টতার সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতি, বিচ্ছিন্নতা ও সম্মিলিত অবদমন উন্মোচন করেছেন। ১৯৯১ সালে হোয়াইট রিভিউ পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন লউরেন এলকিন। সাহিত্যের মতো তিনি কথাবার্তায় স্বচ্ছন্দ। এতে লেখালেখিতে তাঁর লব (আমি), বষষব (সে), নারীর সম্মিলিত অবদমন নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন অলাত এহ্‌সান
- তো, আপনি নিজেকে ঔপন্যাসিক মনে করেন না?
--না, ওই তকমাটা আমার সঙ্গে মোটেই যায় না। এমনকি একটু এগিয়ে বললে, আমরা নারী লেখকদের 'ঔপন্যাসিক' বলতে অভ্যস্ত, যখন পুরুষ লেখকদের শুধু 'লেখক' বলছি। এবং 'লা মনদে'-তে পুরুষকে সবসময় সাহিত্য বিষয়ে লিখতে বলা হলেও, নারীদের জন্য কেবল বইয়ের পাতা। সম্মিলিত অসচেতনে 'লেখক' মানেই 'পুরুষ' অথবা এটাই হয়তো ফ্রান্স।
- আমার মনে হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। আপনি কি তবে ভাষার নারীকরণের পক্ষে? আপনি কি নিজেকে একজন écrivaine (লেখক) হিসেবে উপস্থাপন করেন?
-- হ্যাঁ, তাই করি। প্রথম দিকে আমি চাইনি, কিন্তু এখন এটা অনেক বেশি অভ্যাসের প্রশ্ন। আমি এটা আরেকটু বাড়িয়ে écriture inclusive (শুদ্ধ লেখক) পর্যন্ত যাই না, তবে এতে আমার কিছু যায় আসে না।
- আপনি যা করছেন, তাকে কি আত্মজৈবনিক, গদ্য লেখা হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন?
-- মোটেই না। আমি আসলে 'ঘরানাবিহীন' (genre-less) লেখায় বেশি আগ্রহী। কিন্তু তখন আপনি একটা ঝুঁকি নিচ্ছেন যে, সুনির্দিষ্টভাবে ঘরানায় ফেলা যায় না বলে অন্যরা একে সাহিত্য নয় বলে দিতে পারে। কিন্তু এ রকম অনেক অনেক লেখা আছে, এসব লেখকের অনেকে তাকে 'উপন্যাস' বলতে গোঁ ধরবেন, এমনকি যখন এটা পরিস্কার, তাঁরা তা লেখেনইনি। কারণ, উপন্যাস বিক্রি হয়। আমি সেটা করতে চাইনি।
- একটা লেখায় আপনি 'জার্নাল দ্যু দেওরস' (JOURNAL DU DEHORS) সম্পর্কে বলেছেন, এটা একটা 'je transpersonnel' (স্বতন্ত্র আমি) ধরনের লেখার চেষ্টা ছিল। এতে কী বোঝাতে চেয়েছিলেন?
-- এ দিয়ে আমি বোঝাতে চেয়েছি আত্মজৈবনিক je (আমি)-এর সবকিছু বিরোধিতা করা যায়। এই je (আমি) বলতে আমি যা ধারণ করি, আমি ও আমার ইতিহাসকে একই কাতারে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার মতো একটি পরিচয় নয়, এটা মনস্তাত্ত্বিক je নয়, এটি হচ্ছে সেই je (আমি), যা আমাদের সবার পরিচিত- একজনের বাবা-মার মৃত্যু, নারীর অবস্থান, অবৈধ গর্ভপাতের মতো সংকীর্ণ ধারণা দিয়ে তৈরি। এইje transpersonnel (স্বতন্ত্র আমি)-এর সংক্ষিপ্তসার হলো 'দ্য ইয়ারস', যেখানে je (আমি) সম্পূর্ণ অদৃশ্য। আমার জন্য je একটি পরিচয় নয়, কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা ও মানুষের ঘটনায় তৈরি একটি পরিসর। আমি লেখায় এটাই তুলে ধরতে চেয়েছি। আমি 'স্বতন্ত্র আমি' বলেছি, কারণ এটি বিচ্ছিন্ন নয় বা কোনো উপাখ্যান, যা আমাকে আগ্রহী করেছে, যা ভাগ করা হয়, হোক তা সামাজিক বা এমনকি অনেকটা প্রতিক্রিয়ার রাজ্যে থাকা মনস্তত্ত্বীয় কোনো ব্যাপার। এভাবেই আমি নিশ্চিত হতে পারি- আমি এমন কিছু বিষয়ে আলোকপাত করেছি, তা ব্যক্তিগত ইতিহাসে খর্ব করার নয়। অবশ্যই, আমি নিজেকে একটা দূরত্বে রাখতে চাই। আমি কে এবং আমি কোথায় আছি এর মধ্যে বিস্তর ফারাক- এটা নিজের সঙ্গেও দূরত্ব সম্পর্কে। অবশ্যই এটি একটা দৃষ্টিভঙ্গি, এটা তৈরিতে সময় লেগেছে। আমার প্রথম দিকের বইগুলো এর প্রভাব দিয়ে বেশ চেনা যায়। এখনও এর প্রভাব আছে। কিন্তু আপনাকে লেখকের নিজের ওপর আরোপযোগ্য প্রভাবের বাইরে কথার পথ খুঁজে বের করতে হবে।
- লোকজন আপনার লেখা সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রায়ই যে বলে, এটা কি সেই 'ফ্ল্যাট রাইটিং' ধরনের লেখায় আসে?
-- হ্যাঁ ফ্ল্যাট। কারণ, আমি এভাবেই লিখি। এটা আমার কাছে সেভাবেই আসে- এটা অনেক বেশি নৈর্ব্যক্তিক, দূরত্বপূর্ণ এবং বাস্তবিক।
- আপনি যখন বলছেন, এভাবে ব্যাপারটা আপনার কাছে আসে, তার মানে কি বোঝাতে চান, আপনি জগাখিচুড়ি ধরনের খসড়া তৈরি করেন না, তারপর খুব ব্যক্তিগত বা আবেগপূর্ণ সব অতিক্রম করেন?
-- না। খালি পৃষ্ঠায় একটি নির্দিষ্ট ধরনের জন্ম হয়েছে, আমার অবস্থানের পক্ষে যা সহজ- শ্রেণি পরিবর্তন খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, লেখালেখিকে আমি (ঈশ্বর) প্রদত্ত হিসেবে মনে করি না। যদিও যাকে অভ্যাস বলবে- আমার শ্রেণি অভ্যাস, আমার প্রথম সংস্কৃতি, শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে আমার জীবনযাপন এবং সাহিত্য, সাহিত্য হিসেবে আমি যা অভিজ্ঞতা পেয়েছি, তার মধ্যে আমি আছি। লেখালেখিতে আমি সবসময় এই দুটি জগতের সমন্বয়ের চেষ্টা করি এবং সাহিত্যের মধ্যে আমার প্রথম সংস্কৃতির কিছু নিয়ে আসা সত্যি কঠিন।
-- আপনি যেভাবে বর্ণনা করেন, এটা খুবই স্থানিক।
-- হ্যাঁ, আপনি যেমন বলছেন, এটি খুব স্থানিক, যেন দুটি আলাদা জায়গাকে একখানে করতে হবে :যে জায়গা থেকে আমি শুরু করেছি, সেখানে একটা নির্দিষ্ট নিষ্ঠুরতা আছে এবং সাহিত্যের জগৎ। একভাবে, সবসময়ই আমি লিখি, আমি কিছু জয় করি। আমি কি বোঝাতে চাইছি বুঝছেন?
- হ্যাঁ, পুরোপুরি। এটা এমন কিছু আপনাকে চেষ্টা করতে হবে। এটা প্রদত্ত কিছু নয়।
-- এটা প্রদত্ত কিছু নয়।
- আপনার বইগুলোতে প্রচুর ফাঁকা জায়গা রয়েছে। এটা কি লেখা ও কাজের কোনো দৃশ্যগত অনুবাদ, লেখার সঙ্গে স্থানিক সম্পর্কের নিদর্শন?
- হ্যাঁ। কিন্তু আমার সব বইয়ে এটা নেই- দ্য ইয়ারস বইয়ে বেশি খালি নেই।
- কিন্তু আপনার পৃষ্ঠার বাইরে রাখার ধরনে কিছু একটা আগ্রহ-জাগানিয়া ব্যাপার আছে।
-- হ্যাঁ, জায়গাটা! এই জায়গা যুক্ত করা আমার জন্য মৌলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই অংশটা অপ্রকাশ্যের, ভিন্নতার, ফেলে দেওয়ার, ভাঙার ধরন। হ্যাঁ, এটা কিছুটা এ রকম। কিন্তু এরপর এটা আমার জন্য জায়গা (space) নয়, বরং তার চেয়ে বেশি পাঠকের জন্য।
- 'দ্য ইয়ারস' সম্পর্কে আমার জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হচ্ছে- এটা আপনার শুরুর দিকের লেখালেখির মধ্যে একমাত্র বই, যেখানে আপনি তৃতীয় পুরুষ ব্যবহার করেছেন। আপনি কীভাবে এই স্বর ধারণ করলেন? আপনার অন্য বইগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ je (আমি)-এর কী হলো?
-- এটা দ্য ইয়ারসে অদৃশ্যের বিন্দুতে বিবর্তিত হয়েছে। আমার শেষ বই MÉMOIRE DE FILLE (একটি মেয়ের গল্প), এও তাই। দুই ভিন্ন ও খুব স্বতন্ত্র স্বর, উত্তম ও তৃতীয়। যে নারী লিখছেন, তার জন্য Je এবং আমি যাকে বর্ণনা করছি তার জন্য elle (সে/তৃতীয়), ১৯৫৮ সালের এক তরুণী।
- দ্য ইয়ারস লিখতে আপনি কি প্রথমবারের মতো তৃতীয় পুরুষে লিখেছিলেন?
-- হ্যাঁ।
- কী অনুভব করলেন? আমি মোটেই তৃতীয় পুরুষে লিখতে পারি না, এটা সবসময়ই খুব আরোপিত মনে হয়?
ষষ আপনার একটু সময় লাগতে পারে! কোনো কারণে এটা আদর্শ নয়। আমার বেলায় এর উল্টোটা হয়েছে- বহু বছর je (আমি)-তে লেখার পর, এখন আমি আর উত্তম পুরুষে লিখতে পারি না।
- কেন?
-- আমি ঠিক জানি না। আমি ঠিক একইভাবে অনুভব করি, আমি অনুভব করেছি আমাকে লব-তে লিখতে হবে- একটা প্রয়োজনীয়তা হিসেবে।
- je  (আমি) উপায়ে লেখার ক্ষেত্রে, elle (সে) কি শুধুই আলাদা। je-এর দিকে বাঁক ফেরার একটি উপায়?
-- elle-এর ভেতর প্রচুর je আছে, এটা কোনো তৈরি করা না elle,  এটা elle/je; তবে সংক্ষেপে elle| elle সবকিছু করে Je। শুধু ব্যাকরণগতভাবে নয়, ঔব আমার কাছে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
- আপনার আর পৃষ্ঠার মধ্যে দূরত্ব তৈরির এটা আরেকটা উপায়।
-- হ্যাঁ, অনেক বেশি দূরত্ব। তবে এটা আমার জন্য কথা বলা, লেখা সহজ করে তোলে। আমার মনে হয়, যদি MÉMOIRE DE FILLE আমি উত্তম পুরুষে লিখতাম, তাহলে ১৯৫৮ সালের তরুণীর ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, আমি সবকিছু লিখতে পারতাম না। সত্যিই elle আমাকে মুক্তি দিয়েছে।
-LE VRAI LIEU-তে আপনি লেখকদের মাধ্যমে সমাজ যেভাবে বলে, তার সম্পর্কে কথা বলেন। এবং দ্য ইয়ারসের উপসংহারে আপনি পাঠককে লেখার কাছে যেতে বলেন।
সেই কথা মাথায় রেখে আমি নৈর্ব্যক্তিক বা যৌথ আত্মজীবনীর প্রশ্নে আরও কিছু কথা বলতে চেয়েছিলাম। যে নারী তাদের নিজের জীবন সম্পর্কে লেখেন, তাঁদের প্রায়ই আত্মপ্রেমের (নার্সিসিজম) জন্য অভিযুক্ত করা হয়। সে ক্ষেত্রে যৌথ আত্মজীবনী ধারণাটি আমার কাছে আমি ও আমরার মধ্যে সম্পর্ক উপস্থাপনে অনেক বেশি সৎ উপায় মনে হয়েছে। বিশ্ব এর মাধ্যমে যা তৈরি করে, যা বলে এবং ক্রমাগত আমাদের আকৃতি ও পুনরাকৃতি দেয়।
-- হ্যাঁ, ঠিক তাই। শুরুতে যৌথ আত্মজীবনী লেখার কোনো ইচ্ছাই আমার ছিল না। আমার নেওয়া সব পদক্ষেপ লেখার মধ্যে খচিত আছে। আমি একজন নারীর গল্প লিখতে চেয়েছিলাম, যিনি একটি যুগের মধ্যে বেঁচে ছিলেন, কিন্তু আমি চেয়েছিলাম তিনি প্রায় সেখানে না থাকুন। কীভাবে এটা করা যায়, আমি জানতাম না; আমি যদি তাকে পুরোপুরি 'নাই' করে দিতাম, সেটা একটা ইতিহাসের বই হতো। বইয়ের ভেতরে একটা সচেতনতা থাকা দরকার ছিল।
তাই আমি যা একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও নৈর্ব্যক্তিক- এ ধরনের ছবি ও স্মৃতি সংগ্রহ করতে শুরু করলাম। যেমন চলচ্চিত্র, বই, স্মৃতি, গান- কিছু ছাড়াই কাউকে যুক্ত করা যায়। আমি পৃথিবীতে আসা থেকেই শুরু করেছিলাম- আমার কাছে পৃথিবীর নিজস্ব কোনো বাস্তব স্মৃতি নেই, কিন্তু আসার পরের স্মৃতি আছে। তাই বইটি হয়ে উঠেছে পূর্বতন বিশ্বের সম্পর্কে- আমরা যেভাবে এ সম্পর্কে সচেতন হই। আমি নিজের সম্পর্কে লিখছিলাম না। কিন্তু বর্ণনার মাধ্যমে, আমাদের জানার উপায়গুলোর মাধ্যমে, আমরা যেভাবে বিশ্বের মোকাবিলা করি তার মাধ্যমে; এটা মনস্তাত্ত্বিক নয়, এটি অনেক বেশি পরিস্থিতি সম্পর্কে; ব্যক্তিবিশেষের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে নয়- সেভাবেই এটা আমার কাছে আসে। তবে ফ্রান্সের এই ইতিহাস পুরোনো দিনের। তার পরেই আমি চালিয়ে যাওয়ার একটা উপায় খুঁজে পেয়েছিলাম, তাই আমি পুরোনো ছবি, যেমন আমার শিশুর ছবি দেখেছিলাম। কিন্তু তখনও কিছুই হয়নি, ওখানে কেউ ছিল না। আমি জানি না কীভাবে ছবি ব্যবহারের ধারণা পেয়েছিলাম। তবে সমুদ্রের ধারে ছোট্ট মেয়েটার ফটোগ্রাফ পেয়েছি, ছবিটা বর্ণনা করেছি এবং আমি মনে করি, আমাকে এটা ঠিক করতে হয়েছিল যে আমি je বা elle লিখতে যাচ্ছি।
- এটি খুব কার্যকর।
-- আমি সত্যিই এভাবে লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমি চিন্তিত ছিলাম যে আমার সম্পাদক এটি হয়তো গ্রহণ করবেন না। আমি এর সুপাঠ্য বা বোধগম্য হওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলাম। আমি চিন্তিত ছিলাম, আমি হয়তো অগ্রবর্তী, অপাঠ্য ধরনের কিছু তৈরি করব। এবং আমি ভেবেছিলাম- ওহ ভালো, আমি পাত্তা দিই না, আমি যেভাবে চাই তা লিখব। তার পরে [এটি প্রকাশিত হওয়ার পরে] আমি নিবন্ধগুলো পড়ি, যেখানে সমালোচকরা বলেছেন, 'এই সময়ে এরনো সত্যিই ভিন্ন কিছু করেছে!' দেখে মনে হয়েছিল, এই ধরনের পুরো বিকেন্দ্রীকরণ নিজেই সার্থক কিছু তৈরি করেছে।

আরও পড়ুন

×