ঢাকা শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪

প্রচ্ছদ

আধেক জীবন

আধেক জীবন

আনি আরনো [জন্ম :১ সেপ্টেম্বর ১৯৪০]

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০

৬ অক্টোবর বিকেল। সপরিবারে ও ক্যাডেট জীবনের বন্ধুরাসহ যাচ্ছিলাম রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাসে বন্ধু খলিলের ডেরায়। ৫টা বাজার পাঁচ মিনিট আগে কানে এয়ারপড গুঁজে নোবেল কমিটির লাইভে যুক্ত হলাম। বহু সাংবাদিক অধীর আগ্রহে বসে আছেন ক্যামেরাসমেত। সামনের সাদা রঙের রাজকীয় দরজাটা খোলার অপেক্ষা। মেসেঞ্জারে এক লেখক বন্ধু বললেন, 'রুশদি পাবে।' আমি কিছু লিখলাম না (মনে মনে বললাম রুশদিকে দেওয়ার বড় সিদ্ধান্তটা বোধহয় সুইডিশ একাডেমি নেবে না)।
ইউরোপীয় সময় ১টায় সাদা দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন সুইডিশ একাডেমির দীর্ঘকায় স্থায়ী সচিব ম্যাটস্‌ মাম। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে প্রথমে সুইডিশ ভাষায় তারপর বর্তমান দুনিয়ার লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা ইংরেজিতে ছোট করে ভূমিকা রাখার পর ফরাসি লেখিকা আনি আরনো-র (বা এখ্‌নো; ফরাসি জ-এর উচ্চারণ আমাদের জন্য গোলমেলে। মনে পড়ে সেই কোনকালে ফরাসি শিখতে গিয়ে জ নিয়ে কসরত করতে হয়েছিল) নাম ঘোষণা করলেন। রুশদির নাম উচ্চারণ করা আমার ওই লেখক বন্ধুসহ আমাদের দেশের সাহিত্যপ্রেমীদের এবং বিশ্বসাহিত্যের অনেক নাম পরপর মনে এলো। মনে প্রশ্ন এলো : কেন আনি আরনো? কেন নয় ন্‌গুগি, আদোনিস, মারিজ কদে, সেসার আইরা, মার্গারেট অ্যাটউড, মিলান কুন্দেরা, ছান শুয়ে, জন বানভিল...
এবারে কে পাবেন- ফি বছর এই প্রশ্নটা সেপ্টেম্বরের শেষ থেকেই সাহিত্যমোদীদের মনে উশখুশ করতে থাকে। আমাদের জায়গা থেকে বলাটা কঠিন। বোকামিও বটে। তারপরও আমরা অনুমান- আন্দাজের খেলায় মাতি, বাজিকরেরা দর হাঁকেন। একজন নাগীব মাহফুজ বা গুন্টার গ্রাস বা জে এম কুট্‌জি বা ডেরেক ওয়ালকট বা মারিয়ো বার্গাস ইয়োসা বা অরহান পামুক বা টনি মরিসন বা হ্যারল্ড পাইন্টার বা কেনযাবুরো ওয়ে পুরস্কারটি পেলে আমরা খুশি হই এবং বিশ্বসাহিত্য সম্মানিত হয়। আবার নগুগি বা আদোনিস বা মিলান কুন্দেরাকে না দিয়ে এলফ্রিডে ইয়েলিনেক বা ইমরে কারতেশ বা দারিও ফো-কে দেওয়া হলে অখুশি তো হই-ই, গালাগালিও করি নোবেল কমিটিকে। বছরের পর বছর হতাশ ও হতোদ্যম হয়েও পরের বছরই আবার একই কাজ করতে থাকি।
কেন? কারণ এটা একটা খেলা। এবং খেলাটা মজার। তাছাড়া এর মধ্য দিয়ে বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় কোথায় কে কী লিখছে, চলটা কেমন তারও একটা হদিস পাওয়া যায়। আর যত গালমন্দ বা সমালোচনা করি না কেন, এটা অনস্বীকার্য যে, এখনও এটাই দুনিয়ার সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার। অপরিচিত কাও শিংচিয়েন বা আবদুল রাজ্জাক গুরনাহ্‌ রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন এবং তাঁদের বইয়ের বিক্রি হতে শুরু করে লাখ লাখ কপি মূল ভাষায় এবং তর্জমা হয়ে নানা ভাষায়, যার ঢেউ আমাদের দেশেও এসে আছড়ে পড়ে। সামনের একুশে বইমেলাতেই দেখা যাবে ইংরেজি সংস্করণ অবলম্বনে আনি এর্নোর একাধিক বইয়ের তর্জমা নিয়ে হাজির হচ্ছে কোনো কোনো প্রকাশক। নীলক্ষেতের বইয়ের মার্কেটে কিংবা গুলশানের ট্রাফিক সিগন্যালে কয়েক দিনের মধ্যেই পাওয়া যাবে এর্নোর বইয়ের ইংরেজি অনুবাদের সস্তা ফটোকপি সংস্করণ। একটা সময় ছিল যখন তাবৎ দুনিয়ার সাহিত্যের পুরস্কার বলতে একচ্ছত্রভাবে ছিল নোবেলের নাম। কিন্তু সে অবস্থা বদলেছে। বর্তমানে দুনিয়ায় অসংখ্য সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয় প্রতি বছর এবং অধিকাংশই গুরুত্বপূর্ণ, অর্থমূল্যও অনেক। বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে নির্দিষ্ট আঞ্চলিক পুরস্কার আগে থেকেই অনেক আছে (যেমন সাহিত্য আকাদেমি, গোকুর, সের্বান্তেস, আকুতাগাওয়া, কাময়েশ পুরস্কার), কিন্তু এখন অনেক পুরস্কার দেওয়া হয় যে কোনো ভাষায় লেখা সাহিত্যের বিচারে।
নোবেল পুরস্কারের ভবিষ্যৎটা কেমন? ভবিষ্যৎই জানে ভবিষ্যতের কথা।

২.
এ বছর কাকে দেওয়া হল সেই আকাঙ্ক্ষিত নামটি ঘোষণার পর সুইডিশ একাডেমি একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করে। নোবেল কমিটির সভাপতি অ্যান্ডার্স ওলসনকে এই প্রশ্নটি (কেন আনি আরনো?) করা হয়। জবাবে তিনি বলেন আনি আরনোর অতুলনীয় সাহিত্যগুণের কথা। আরও বলেন যে ফরাসি সাহিত্যের দিকপাল মার্সেল প্রুস্তের পথে হেঁটে হারানো সময়ের খোঁজ করতে গিয়ে আরনো আমাদের নতুন পথে নিয়ে গিয়েছেন। কেন ইউরোপের একজন লেখককে বেছে নেওয়া হলো, কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এশিয়া, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার কাউকে নয়, এ রকম এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন তাঁদের (সুইডিশ একাডেমির) মূল মানদণ্ড সাহিত্য, সাহিত্যের গুণাগুণের ভিত্তিতেই তাঁরা নির্বাচন করেন।
শুধু তাই কি? ১৮ সদস্যের রাজকীয় সুইডিশ একাডেমি দীর্ঘ প্রক্রিয়াশেষে চূড়ান্ত নির্বাচনে ঘুরেফিরে ইউরোপীয় লেখক-কবি-নাট্যকারদেরই বেছে নেন। ১২১ বছরের নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসটা সেই সাক্ষ্যই দেয়। আর ভাষার বেলায় দুনিয়ার প্রধান ভাষাগুলির লেখকরাই প্রাধান্য পেয়েছে। সুইডিশ একাডেমির ১৮ সদস্যের কয়জন কয়টা ভাষাইবা জানেন! যে ভাষাগুলি তারা জানেন না সেই ভাষাগুলিতে লেখা সাহিত্যের মূল্যায়নটা তারা প্রধানত ইংরেজির মাধ্যমেই করে থাকেন। তার মানে দাঁড়াচ্ছে এই যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তর্জমা ছাড়া নোবেল পুরস্কারের কথা ভাবাই যায় না। রবীন্দ্রনাথের বেলায় এ ব্যাপারটিই ঘটেছিল। তারপর বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত এই সাহিত্য পুরস্কারটি আমাদের বাংলায় আর আসেনি। এর জন্য শুধুই কি নোবেল কমিটির একদেশদর্শিতা দায়ী? না। আমরাও তো জীবনানন্দকে উপযুক্তভাবে তর্জমা করে দুনিয়ার দরবারে হাজির করতে পারিনি। তার জন্য চাই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং যথোপযুক্ত কাঠামো তৈরি করে চর্চার ব্যবস্থা করা।

৩.
আমি-ভিত্তিক লেখালিখির দিন শেষ। এমনটাই সম্প্রতি বলছিলেন পাশ্চাত্যের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক সাংবাদিকরা। আত্মকথনমূলক অটোফিকশনের নাকি আর ভাত নাই! এ রকম যখন কথা হচ্ছিল ঠিক তখন সুইডিশ কমিটি বলে উঠল 'শ্যাম্পেনের বোতলটা ধরুন।' নোবেলের ১২১ বছরের ইতিহাসে ১৭তম মহিলা হিসেবে সম্মাননা পেলেন ফরাসি লেখিকা আনি আরনো। আমি-কে উপজীব্য করে লেখা একবিংশ শতকে আলোড়ন তোলা অটোফিকশনের ভুবনের একজন গুরু হলেন আনি আরনো। যদিও অপ্রাসঙ্গিক হবে না বলা যে মেহিকোর সের্হিও পিতোল, আর্হেন্তিনার রিকার্দো পিগলিয়া বা এস্পানিয়ার এনরিকে বিলা-মাতাস এই ধারার মিশ্র-জরার সাহিত্য রচনা করে বেশ নাম কুড়িয়েছেন হিস্পানি দুনিয়ায়। সময় বা কাল, স্মৃতি, সংরাগ, নারীবাদ, প্রেম ও যৌনতা হলো আরনোর লেখালিখির বিষয়। আন্তরিক, বিহ্বলকর ও অকপট ভঙ্গিতে তিনি প্রশ্ন ছোড়েন সামাজিক ও লৈঙ্গিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে। তাঁর সাহিত্য হলো মুক্তির উত্তরাধিকার। এরই মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন, যার মাঝে আছে হেমিংওয়ে পুরস্কার, হেনোদো পুরস্কার, ফোর্মেন্তোর পুরস্কার, গুয়াদালাহারা বইমেলা সম্মাননা। ফিকশন, অটোফিকশন, জীবনী বা আত্মজৈবনিক-ফিকশন যা-ই বলি না কেন - সত্য লেখাটাই গুরুত্বপূর্ণ, এক সাক্ষাৎকারে এমন কথা বলেছিলেন। সত্যের বয়ানে তিনি দ্ব্যর্থহীন। ব্যক্তিগতভাবে আরনোর নামের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচিতি ঘটে ২০১৬ সালে বার্সেলোনার এক বইয়ের দোকানে। স্বদেশ ফ্রান্সে তো বটেই, গত কয়েক বছর ধরে এস্পানিয়া ও ইউরোপেও পাঠকমহলে তিনি দারুণভাবে পরিচিত, ইংরেজিতে যাকে বলে সেনসেশন। তাঁর কাহিনি নিয়ে সিনেমাও হয়েছে এবং গত বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর একটি শো ছিল। খেটে খাওয়া পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠায় নগর প্যারিস নয় বরং তাঁর শহরতলির মানুষের জীবনযাপনের চিত্র উঠে এসেছে তার প্রচল ভাঙা না-ফিকশন ফিকশনে। নিজের এবং আশপাশের মানুষের জীবনকাহিনি বলার মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিগদ্য হয়ে ওঠে সামষ্টিক স্মৃতিকথা। উচ্চারণে তা সাহসী ও শিকড়সন্ধানী। লেখনী দিয়ে তিনি যেন ছুরি চালান। ছুরি চালিয়ে ভেতরের সত্যটা বের করে আনেন। সবটা মিলিয়ে তাঁর রচনা মৌলিক ও আধুনিক। নোবেল কমিটির কাজ হলো এমন কাউকে নির্বাচন করা, যার সাহিত্যকর্ম হবে-  most outstanding work in an ideal direction এই  ideal বা আদর্শের মাপকাঠি কী? কার আদর্শ? নোবেল কমিটি বলবে আনি আরনোর রচনায় এই গুণাগুণ তারা খুঁজে পেয়েছে, তাদের মতো করে। আমরা হয় একমত হবো, না হয় ভিন্নমত পোষণ করব। তাকে পাঠ করে হয়তো সত্যিই মহৎ সাহিত্যের আস্বাদ পাব, এক নতুন জগৎ আবিস্কার করব। অথবা হয়তো তাকে একেবারেই পড়ব না বা পড়ে আহামরি কিছু মনে হবে না। সে যা-ই হোক, আমরা আগের মতোই পড়তে থাকব তর্জমায় কাফকা, লু শু্যন, বোর্হেস, মাহমুদ দারবিশ, ন্‌গুগি ... এবারে মূল ফরাসি থেকে এস্পানিওলে তর্জমা হওয়া তার একটি টেক্সটের খানিকটা বাংলায় পড়া যাক :
আমরা বেছে নেই আমাদের স্মৃতির তৈজসপত্র ও জায়গাগুলি কিংবা বলা ভালো কালের চেতনা নির্ধারণ করে দেয় অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করার গুরুত্ব কী। লেখক, শিল্পী, চলচ্চিত্রকাররা সেই স্মৃতির বিস্তৃতিতে অংশগ্রহণ করে। সুপারমার্কেটগুলি, বছরে নিদেনপক্ষে পঞ্চাশবার যেগুলিতে ফ্রান্সের বেশিরভাগ লোকজন যাচ্ছে প্রায় চল্লিশ বছর ধরে, আলাদা করে বলবার মতো জায়গা বলে বিবেচিত হতে শুরু করেছে এই সেদিন থেকে। যা হোক, আমি যখন পেছন ফিরে তাকাই, আমি বুঝতে পারি যে আমার জীবনের প্রতিটি পর্বের সঙ্গে বড়সড় বিপণিবিতানের ছবি জড়িয়ে আছে, নানা দৃশ্য, মোলাকাত, মানুষের সঙ্গে।
আবারও সামনের বছর আমরা আমাদের পছন্দের ও পরিচিত কোনো লেখক নোবেল পেলেন কিনা সে খবরের দিকে তাকিয়ে থাকব। সাহিত্য ঘিরে এই আলাপ-আলোচনা-আড্ডা-উৎসব সুখের।

আরও পড়ুন

×