ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

বেণি বেঁধে

বেণি বেঁধে

অরণ্য সৌরভ

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২২ | ২২:৪৮

'স্নিগ্ধ-শ্যাম-বেণি-বর্ণা এসো মালবিকা!
অর্জুন-মঞ্জরী-কর্ণে গলে নীপ-মালিকা...'
কাজী নজরুল ইসলাম

নারীর কেশসজ্জায় বেণির কথা এভাবেই কবির কবিতায়, গল্পকারের গল্পে, শিল্পীর তুলির আঁচড়ে কিংবা ইতিহাসের পাতায় নানাভাবে ফুটে উঠেছে। আগেকার দিনে বাঙালি মা-বোন, দাদি-চাচিদের লম্বা চুলে বাহারি বেণি ও খোঁপা দেখা যেত। সময়ের সঙ্গে ফ্যাশন বদলায় বলে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চুল বাঁধার ধরনে এসেছে পরিবর্তন। তবে বেণি তার মাধুর্য হারায়নি। আজকাল জাম্পসুট, ক্রপটপ, টপস, কুর্তি এমনকি শাড়ি, সালোয়ার-কামিজের সঙ্গেও দেখা যায় বেণি বাঁধার চল।

রেড বিউটি স্টুডিও অ্যান্ড স্যালুনের রূপবিশেষজ্ঞ আফরোজা পারভীন বলেন, 'সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ঋতুর তারতম্য ভেদে আমরাও আরামদায়ক বিভিন্ন হেয়ার স্টাইল বেছে নিই। বেণিও চুলের একটি স্টাইল; যা কখনও পুরোনো হয় না। এটি শিশু থেকে শুরু করে কিশোরী, তরুণী, মধ্য বয়সী এমনকি বয়স্করাও করে থাকেন।'

'বেণি সময় (যুগ) ও স্টাইলের সঙ্গে বরাবরই একটি স্টাইলিশ হেয়ার স্টাইলের মধ্যে থাকে। বেণিকে যদি আউটফিটের সঙ্গে মানানসই করে করা না যায় তাহলে সৌন্দর্য বা স্টাইল ফুটে উঠে না। এ ক্ষেত্রে বেণিকে আউটফিটের সঙ্গে মানানসই ফুটিয়ে তুলতে পারলে বেণি একটি আলাদা জায়গায় নিয়ে যায়'- যোগ করেন আফরোজা পারভীন।

বনশ্রীর স্পা ব্রাইডালের বিউটি এক্সপার্ট মনি ইসলাম বলেন, 'ট্র্যাডিশনাল চুলের সাজে বেণি দারুণ দেখায়। শাড়ি, কুর্তি, সালোয়ার-কামিজ, টপ, ওয়েস্টার্ন সব পোশাকেই বেণি পরিপাটি একটা লুক নিয়ে আসে। পরিপাটি ও আরাম- দুটোই একসঙ্গে বেণির মাধ্যমে পাওয়া যায় বলে আগ্রহটা বেশি স্কুল-কলেজপড়ূয়া কিশোরী বা তরুণীদের। তবে সব বয়সী নারীই বেণি বাঁধতে পছন্দ করেন।'

খোলা চুলের চেয়ে বেণি চুলকে বেশি সুরক্ষিত রাখে, গরমের মধ্যে খোলা চুলের অস্বস্তিকর থেকেও রক্ষা করে। এ ছাড়া এটি দীর্ঘ সময় বহন করা যায়। এ কারণেই সবাই বেণির স্টাইলগুলোকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

ইতিহাসের পাতা থেকে :চুল বাঁধায় বেণির ইতিহাস অনেক পুরোনো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাতে সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে। বার্ডি ডটকম ও জ্যানিস পার্লার ডটকমের সূত্র মতে, আফ্রিকার সংস্কৃতিতে ৩৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে বেণির জনপ্রিয়তার কথা জানা যায়। আফ্রিকার নামিবিয়া অঞ্চলের হিমবা জনগণের মাধ্যমে বেণির প্রচলন শুরু হয়। ৩৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে কর্নরোস বেণি, ৩১০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিসরে অ্যাফ্রোবক্স বেণির চুলের কথা জানা যায়। খ্রিষ্টাব্দ প্রথম শতকে গ্রিসে হালো বেণি, পঞ্চম শতকে যুক্তরাষ্ট্রে পোকাহানটাস বেণি, ১০৬৬ থেকে ১৪৮৫ সাল পর্যন্ত ইউরোপে ক্রাউন বেণি জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তী সময়ে উনিশ শতকের দিকে পৃথিবীজুড়ে বেণি জনপ্রিয়তা পায়।

বেণির বাহারি ধরন :''সই ভালো ক'রে বিনোদ-বেণি বাঁধিয়া দে, মোর বঁধু যেন বাঁধা থাকে বিননী-ফাঁদে।' প্রেম ও দ্রোহের কবি নজরুলের ছন্দের মতো বেণির বাহারি ধরনের চুলের বন্ধনে নিজেকে বন্দি করতে পারেন।

মনি ইসলাম বলেন, 'অনেক ধরনের বেণি রয়েছে। যেমন- খেজুর বেণি, গিঁট বেণি, ফ্রেঞ্চ বেণি, টুইস্ট বেণি, কামরাঙ্গা বেণি ইত্যাদি। এসব বেণিতে ভিন্নতা আনার জন্য রয়েছে সাজের বিভিন্ন ধরন। যেমন- ফুল, পুতি, রং-বেরংয়ের ফিতা, ববি ক্লিপ, বারবি রিবন, স্টোন ইত্যাদি।'

বেণির অনেক স্টাইলের মধ্যে একটি হলো পুরো চুম্পাকার। যেটির মধ্য থেকে ক্রাউন পর্যন্ত শুধু দেখা যায়। এটি কিশোরী, তরুণীদের একটি বিশেষ হেয়ার স্টাইল।
আঠারো শতকে শুরু হয়ে ফ্রেঞ্চ বেণির চলটা এখনও পর্যন্ত রয়েছে। সব বয়সী মানুষের কাছে এটি খুব আকর্ষণীয়।

এ ছাড়া তিনটি কাটিং করে তিনটি ইন্ডিভিজ্যুয়াল ফ্রেঞ্চ বেণি করা যায়। পরে সেটি দুটি বেণিতে গিয়ে বিভক্ত হবে। এটিও বেশ স্টাইলিশ দেখাবে। কিশোরী ও তরুণীদের এটি দেখতে খুব ভালো দেখাবে। এটি ওয়েস্টার্ন আউটফিটের সঙ্গে, কুর্তি, লং কুর্তি, শর্ট কুর্তি, শর্ট প্যান্টের সঙ্গে দেখতে খুবই সুন্দর দেখায়। তা ছাড়া বেণিতে ফুল পড়া একটি স্টাইল। এটি গাউন বা শাড়ির সঙ্গে বেশ মানাবে। এটি সাধারণত পার্টিতে করা হয়।

হাফ সাইজের আরেকটি বেণি রয়েছে, যেটি সাধারণত ফ্রেঞ্চ বেণিকেই স্টাইলিশ করে করা। এটি সুন্দর একটি লুক এনে দেয়। এ ছাড়া আমরা যদি চুলকে পাঁচ-সাতটি ভাগ করে সামনে থেকে চুল নিয়ে ফ্রেঞ্চ করে একটি বেণি করি, সেটিও আরেকটি স্টাইলিশ বেণি হবে।

যাদের লম্বা চুল, তাঁরা কলা বেণি করতে পারেন। প্রথমে চুল দু'ভাগে ভাগ করে নিয়ে চুলের দৈর্ঘ্য অনুসারে দুটি বেণি বাঁধতে হবে। এরপর প্রতিটি বেণি ফিতা দিয়ে বেঁধে ডাবল করে ওপর দিকে নিয়ে ফুলের মতো করে বাঁধলেই হয়ে যাবে কলা বেণি।

খেজুর বেণি করতে চাইলে প্রথমে চুলগুলোকে দু'ভাগ করে নিতে হবে। এরপর এক ভাগের একদম শেষ প্রান্ত থেকে খানিকটা চুল এনে অপর প্রান্তে মিশিয়ে দিতে হবে। আবার অপর প্রান্তের একদম শেষ অংশ থেকে খানিকটা চুল এনে বিপরীত প্রান্তে মিশিয়ে দিতে হবে। এভাবেই এক ভাগ চুলের শেষ প্রান্ত থেকে চুল নিয়ে অপর ভাগে মিশিয়ে দিতে দিতে করতে পারেন বেণিটি।

সামনের চুলগুলো একপাশে সিঁথি করে কানের কাছে আটকিয়ে দিন। পেছনের চুল থেকে কিছুটা চুল নিয়ে এর সঙ্গে অতিরিক্ত চুল লাগিয়ে লম্বা বেণি করুন। আকর্ষণীয় করতে আম্রপালি বেণির একপাশে পছন্দসই ফুল বা হেয়ার অ্যাকসেসরিজ লাগিয়ে নিতে পারেন। শাড়ির সঙ্গে এ বেণি ভালো লাগবে।
যেমন গঠন, তেমন বেণি :লম্বা মুখে যখন বেণি করবেন, এক পাশে সিঁথি করে করুন। এতে লম্বাটে ভাবটা কমে যাবে। আবার গোল চেহারার জন্য চুল কিছুটা ছেড়ে ছেড়ে বেণি করার চেষ্টা করুন। এতে মুখের ফোলা ভাব কম লাগবে।

বাঁধার আগে করণীয় :মনি ইসলাম জানান, চুলের যে কোনো সাজের আগেই পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অপরিহার্য। বেণি করার আগে ৩০ মিনিট হট অয়েল ম্যাসাজ করে চুলের ধরন বুঝে শ্যাম্পু করুন। শুধু চুলের ডগায় কন্ডিশনিং করুন। তারপর একটু অ্যালোভেরা জেলের সাহায্যে উশকোখুশকো চুলকে ম্যানেজেবল করে তুলুন। চুল গুছিয়ে একটু অ্যালোভেরা জেল দিয়ে চিরুনি করে ডিজাইন করুন। এতে অনেকক্ষণ বেণি পরিপাটি থাকবে, এলোমেলো হবে না।

আরও পড়ুন

×