ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

শিল্পকলা

বীরেন সোম ও তাঁর ললিত রেখা

বীরেন সোম ও তাঁর ললিত রেখা

নিসর্গ সনাতন

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২২ | ১২:০০

যে দৃশ্যসজ্জা শিল্পীর সামনে উপস্থিত অথবা যে অবয়ব তাঁর মনে উদ্ভাসিত, তা ব্যক্ত করার প্রথম উপায় রেখা। বাংলার আদি শিল্পনিদর্শনের দিকে তাকালে বোধহয় পাল আমলের বৌদ্ধ অনুচিত্রগুলোর ওপর প্রথম চোখ পড়বে এবং সেখানে দেখা যাবে রেখা ও রঙের অনন্য ও সুষম উপস্থাপন। বাংলাদেশের সমসাময়িক চিত্রকলার প্রাণপ্রতিম শিল্পী বীরেন সোমের আঁকা রেখাচিত্রগুলোয় যেন তারই উত্তরসূরিতা উপস্থিত। বীরেন সোমের ললিত রেখা সেই আদি অনুচিত্রগুলোর মতোই চরিত্র নির্মাণ করে। একই সঙ্গে চরিত্রের পরিবেশ ও প্রতিবেশের যা কিছু প্রাকৃতিক, স্বকীয় ধারায় তা উপস্থাপন করে।
শিষ্যের এই স্বকীয়তার স্বীকৃতি দিয়েছেন গুরু ও বাংলাদেশের চিত্রকলার প্রবাদপ্রতিম এবং রেখাচিত্রের অপর অজর শিল্পী রফিকুন নবী স্বয়ং। এ লেখায় বীরেন সোম বিষয়ে রফিকুন নবীর মূল্যায়ন বারবার সামনে আসবে।
বীরেন সোমের 'রেখায় রূপ' প্রদর্শনী নিয়ে আলোচনার একাংশে রফিকুন নবী বলেন, 'তরুণদের মতো (বীরেন সোমের) প্রায়ই ছবির ধরন-ধারণ পাল্টে দেওয়ার প্রবণতাও চোখে পড়ার মতো! এটাকে সাহসী ব্যাপারও বলা যায়। আসলে অন্য শিল্পীদের চাইতে বীরেন নিজের ধরন তৈরির দিকটিতে তার কর্মক্ষেত্রটিকে সহায়ক হিসেবে আবিস্কার করেছিল। হারবেরিয়াম বিভাগে লতা-গুল্ম-পাতা, বৃক্ষের খুঁটিনাটি ডিটেইল ড্রইং তাকে অন্যভাগে অভিজ্ঞ করে তুলেছিল। তার সৃজনশীল ড্রইংয়ে সেসবের মিশ্রণে বিশেষ ধরন তৈরি হয়েছে।' চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে ১৪ অক্টোবর শেষ হওয়া তাঁর 'রেখায় রূপ' শিরোনামের চিত্রপ্রদর্শনী বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বীরেন সোম সালেহ ফুয়াদের সঙ্গে এক আলাপে বলেছেন, '(প্রদর্শনীর ছবিগুলোয়) রেখার মাধ্যমে জীবনের রূপকে মেলে ধরেছি। প্রকৃতির কথা বলেছি। নগর ও গ্রামের ছবি এঁকেছি। এই ভূখণ্ডের আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে নিসর্গের সৌন্দর্যকে মেলে ধরেছি। চিত্রপট বিন্যাসে ড্রইংয়ের আশ্রয় নিয়েছি। এখানে রেখাচিত্রই আমার শিল্পসৃষ্টির মূল শক্তি। কোনোমতে অবয়ব বা বিষয়কে দাঁড় করিয়ে তার ওপর ইচ্ছামতো রং ঢেলে চিত্রপট সাজাইনি। সেভাবে ছবি আঁকতে ভালো লাগে না। পেইন্টিংয়ের চেয়ে রেখাচিত্রই আমাকে বেশি আকর্ষণ করে।'
দুটি বিন্দুর সংযোগ ঘটালে তৈরি হয় রেখাপথ। শিল্পী মাত্রই রেখাপথের চিরন্তন পথিক। অগ্রজ পথিকেরা বীরেন সোমের প্রেরণা। তিনি বলেন, 'চিত্রকলায় ড্রইং (রেখাচিত্র) এমন একটি বিষয়, যা ছাড়া শিল্প নির্মাণ অসম্ভব। যে মাধ্যমেই চিত্র নির্মাণ করা হোক, আগে গুণী শিল্পীরা তাঁর একটি ড্রইং করে নেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন থেকে পটুয়া কামরুল হাসান কিংবা এসএম সুলতানের মতো শিল্পীরা মূলত ড্রইংনির্ভর কাজ করেছেন। তাঁদের শক্তিশালী সেই রেখার টান আমাকে পথ দেখিয়েছে।'
গ্যালারি শিল্পাঙ্গনে অনুষ্ঠিত বীরেন সোমের এই একক রেখাচিত্র প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছিল ২৫টিরও বেশি ছবি। উল্লেখযোগ্য ছবির ভেতর কাপল, লাভ (সিরিজ ছবি), ড্রিম (সিরিজ ছবি), বাউল, লালন, গণজাগরণ মঞ্চ, হর্স, ফ্রিডম ফাইটার (সিরিজ ছবি), স্প্রিং, উওম্যান (মার্কার ও পেস্টেলে আঁকা পৃথক দুটি ছবি), ব্ল্যাক মুন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। কাপল ও ড্রিম সিরিজের কিছু ছবিতে প্রশস্ত আঁচড়ের রেখাচিত্র দেখতে পাওয়া যায়। অন্যদিকে লাভ সিরিজের ছবিগুলোয় কখনও সাদা কখনও কালো কাগজে সরু আঁচড় টানা হয়েছে। হর্স ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম নেচার। কারণ মার্কার কলমে নয়, এ ছবি দুটি আঁকা হয়েছে চারকোলে। পেস্টেল রঙে আঁকা উওম্যান আর মার্কার কলমে আঁকা উওম্যান- দু'জনই কেশ ও পুষ্পবিলাসে রত, অথচ আলাদা সৌন্দর্য সৃষ্টি করছে। ড্রিম সিরিজের ছবিগুলোয় রেখা ও রেখার একক বিন্দুর মাধ্যমে মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। তুলি ও মার্কার কলমের যৌথ ব্যবহারে আঁকা হয়েছে বাউল। তুলি দিয়ে অনন্য পেছনপট তৈরি করা হয়েছে ছবিটিতে। রেখাচিত্রের দুই মাত্রিকতা সেখানে ত্রিমাত্রিকতায় উত্তীর্ণ। সবচেয়ে যা উল্লেখযোগ্য তা হলো, প্রায় প্রতিটি চিত্রকর্মে চরিত্র উদ্ভাসিত। চোখ ও কর্মকাণ্ডে তারা ব্যঞ্জনাময়।
ছবিগুলোকে রফিকুন নবী মূল্যায়ন করেছেন এভাবে- 'বর্তমান প্রদর্শনীর ড্রইংগুলো ছোট আকারের সাদা ও কালো কাগজে করা। সহজিয়া ও সাবলীল রেখার ড্রইংগুলো সাদা ও কালো কালিতে আঁকা। এর কয়েকটি রয়েছে চারকোলে। ধরনে প্রাচ্যরীতির ব্যবহারও রয়েছে, বিশেষ করে কালো কাগজের ড্রইংয়ে।'
বীরেন সোম যেভাবে ও যে পথে ইতিহাস
শিল্পের যে নন্দন ভুবন শিল্পী মানুষের জন্য তৈরি করেন, সেই ভুবনের মাটির প্রতি কণা সংগ্রাম করে শিল্পীকে জিতে নিতে হয়। শিল্পীকে জীবন দেখতে হয়। যুদ্ধ তাঁর নিয়তির সঙ্গী। ষাটের দশকের শেষের দিকে বীরেন সোম যখন চিত্রশিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু করেন, তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ক্রমে অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এই যুদ্ধ দেশ মায়ের প্রত্যেক সন্তানকে ডাক পাঠিয়েছিল। বীরেন সোম কেবল সে ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন তা নয়, তিনি দেশ মায়ের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন। তাঁর আঁকা অনুপ্রেরণা-জাগানিয়া অনেক প্রতিবাদী পোস্টার স্মরণীয় হয়ে আছে। তেমন কয়েকটি- বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রিষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান- আমরা সবাই বাঙালি, সদাজাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, বাংলার মায়েরা-মেয়েরা সকলেই মুক্তিযোদ্ধা, একেকটি বাংলা অক্ষর অ আ ক খ একেকটি বাঙালির জীবন, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, রক্ত যখন দিয়েছি আরও রক্ত দেব, বাংলাদেশের কৃষক শ্রমিক ছাত্র যুবক সকলেই আজ মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশের সম্পদ বৃদ্ধি করুন, পাকিস্তানি পণ্য বর্জন করুন- বীরেন সোমের আঁকা। একই সঙ্গে রেখাচিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের যে বিশেষ দৃশ্যসজ্জা, তিনি তৈরি করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে তা অনুকরণীয় ধারা তৈরি করেছে।
স্বাধীনতা আন্দোলন পর্বের পর শিল্প-সাহিত্য ক্ষেত্রে বিপুল শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। বিশেষত চিত্রকলার ক্ষেত্রে সেই শূন্যতাকে ক্রমে পূর্ণতায় বদলে দিতে যাঁরা ধর্মপুত্রের ভূমিকা রেখেছিলেন, তাঁদের একজন শিল্পী বীরেন সোম। রফিকুন নবী জানান, বীরেন সোমসহ সেই সময়ের আরও বেশ ক'জন ছাত্র তাঁর গৌরবের কারণ হয়েছিলেন। তাঁকে গৌরবদানকারী ছাত্রছাত্রীদের ভেতর আরও রয়েছেন- শিল্পী শহিদ কবীর, প্রয়াত শিল্পী সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ ও খুশী কবীর।
মুক্তির প্রয়োজনের যে ডাক, তাতে সাড়া দিলে তাতে শিল্পেরও মুক্তি ঘটে। রফিকুন নবী বলেন, 'বীরেনকে তার ছাত্রজীবন থেকেই আঁকাআঁকি ছাড়াও দেশ ও সমাজ-সংসারের নানা কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতে দেখেছি। ষাটের দশকে এসব ক্ষেত্রে বিভিন্ন আন্দোলনে আর্ট কলেজে জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের সঙ্গে কাজের ব্যাপারে কখনও দ্বিধা করতে দেখিনি তাকে।'
বীরেন সোমের ক্রমবিকাশকে তিনটি ধাপে বিভক্ত করেন রফিকুন নবী। 'রেখায় রূপ' প্রদর্শনীকে ঘিরে বীরেন সোমের প্রতি শুভেচ্ছাজ্ঞাপক একটি লেখায়- প্রদর্শনীর স্মারক পুস্তিকায় যেটি প্রকাশিত হয়েছিল- রফিকুন নবী উল্লেখ করেছেন-
'নিজেকে তৈরি করতে এবং প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে বীরেনকে তিনটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়েছে বলে আমার ধারণা। প্রথমটি- ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে ভালো ছাত্র হওয়ার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকায় পোস্টার আঁকা এবং লেখা নিয়ে পরিচিতি প্রাপ্তি। দ্বিতীয় ধাপটি মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় পাকিস্তানি বর্বরতাবিরোধী চিত্রাঙ্কন ও পোস্টার নিয়ে কাজ করা এবং ভারতের বিখ্যাত শিল্পী ও গুণীজনদের সঙ্গে শিল্পকলা সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা ও পরিচিত হয়ে তাঁদের কাজের ধরনগুলো প্রত্যক্ষ করা। তৃতীয় ধাপটি স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর চিত্রকলাচর্চায় মনোযোগ ও নিজের মতো করে একান্ত আপন ধরন তৈরির চর্চায় নিয়োজিত থাকা। এখনও প্রতিনিয়ত আঁকছে, সুযোগ বুঝে প্রদর্শনীও করছে। পাশাপাশি আরেকটি দিকেও তার মনোনিবেশ লক্ষ্য করেছি, তা হলো লেখালেখি।'
রফিকুন নবীর চোখে সবচেয়ে ভালো লাগার দিক হলো, বীরেন সোমের ধারাবাহিকতা। বীরেন অবিরত ছবি আঁকেন।
ছাত্রের আঁকার বিষয়বৈচিত্র্য বর্ণনা করতে গিয়ে রফিকুন নবী বলেন, '(বীরেন সোম) ড্রইং ছাড়াও চিত্রকলার অন্যান্য দিক ও মাধ্যমে কখনও বিষয়ভিত্তিক বিশেষ স্টাইলে আঁকার ধরনে যায়, কখনও আধা বিমূর্তেও মন দেয়। এক পর্যায়ে তো শুধুই রঙ আর ফর্মকে নিয়ে কম্পোজিশনধর্মী কাজও সে করেছে। প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবেও সুনাম রয়েছে। এসবের অর্থ হলো- নিজেকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখা। ভাবনাকে নানা দিকে বিস্তৃত করে নিজেকে যাচাই করা।'
প্রতিনিয়ত নিজ সীমাকে বিবর্ধিত করে চলা এ শিল্পীর রেখাচিত্রের প্রতি ঝোঁক ছাত্রজীবন থেকেই এবং কালক্রমে তা সুপরিণত হয়ে বাংলাদেশের রেখাচিত্রের প্রামাণ্য স্মারকে পরিণত আজ। রেখায় রূপ শীর্ষক প্রদর্শনীটি তারই অনবদ্য নিদর্শন ছিল বলে মনে হয়।
[নিবন্ধে ব্যবহূত শিল্পকর্মগুলো 'রেখায় রূপ' শিরোনামে বীরেন সোমের শিল্প প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে]

আরও পড়ুন

×