ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

গল্প

বারো ঘরের নামতা ও একটি মিসিং লিঙ্ক

বারো ঘরের নামতা ও একটি মিসিং লিঙ্ক

তাসনুভা অরিন

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২২ | ১২:০০

অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলের সেলফি মুড অন করে নিজের পাকা চুলগুলো দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, মানুষের সাদা চুল তুলে ফেলার নেশা বার্ধক্য সহ্য করতে না পারা। মানুষ অথবা প্রকৃতি বুড়িয়ে যাওয়াকে মানতে চায় না। উপড়ে ফেলতে চায়। এটা আটটি দুঃখের একটি। সান্ত্বনা- এখন ষোলোতেও মানুষের চুল পাকে।
যদিও আমার রাপুঞ্জেল সিন্ড্রোম আছে। যখন টেনশন হয়, কাঁচা-পাকা যা আছে, তুলে ফেলি, ভালো লাগে।
শেষ যে মেয়েটার সাথে প্রেম করেছিলাম, সে বলেছিল একসাথে বৃদ্ধ হবার নাম প্রেম।
ভীষণ ন্যাকামো মনে হয়েছিল।
ন্যাকামো বিবর্জিত প্রেম কেমন হতে পারে, তার একটা নকশা করেছিলাম। এ রকম প্রেম দুইটা কঙ্কালের ভেতর হতে পারে, যারা খটখট আওয়াজ করবে কিন্তু আবেগ, ভাব এসব বুঝবে না। এ রকম ভাবতেই চোখের সামনে আর কোনো নারী বা পুরুষ না, কেবল কঙ্কাল দেখতে শুরু করি, যারা একে অপরকে জবা ফুল দিচ্ছে।
আহা, আমিও তো কঙ্কাল!
আমার একটি বিশেষ আয়না আছে। লেজার আয়না। এর সামনে দাঁড়ালে যে কেউ তার কঙ্কাল রূপ দেখতে পায়। তো, সেই শেষবারের প্রেমিকাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম লেজার আয়নার সামনে। ভাবলাম, মেয়েটার ভালো লাগবে। উল্টো সে ভয় পেয়ে গেল। একটু আগের রোমান্টিক বার্ধক্যের গল্প তার নিমেষে উধাও হয়ে গেল।
সে বলছিল-
আমি আনপ্রেডিক্টেবল ও আনরোমান্টিক।
মেয়েটি আমার সাপেক্ষে কম বয়সী ছিল। বয়সী প্রেমিকদের বালিকা প্রেমিকারা সুগার ড্যাডি বলে। একটু হাঁসফাঁস হতো এ রকম ভাবলে। এখন অবশ্য কিছুই আর হতে চাই না, না তরুণ না বৃদ্ধ। আপাতত কী চাইছি, তাহলে?
চাইছি, শূন্য ভাবনায় পৌঁছাতে। যেখানে পৌঁছালে মানুষ অমর হয়। মানুষের জন্ম আর মৃত্যু- দুটোই এখানে চুপ হয়ে যায়। তবে কতক্ষণ চুপ থাকে, সেটা বলা যায় না। আমার ধারণা হতে থাকে, হয়তো আমি পেন্ডুলামের মতো দুলছি কিন্তু স্থির হতে পারছি না। এটা আমাকে শূন্য ভাবনার বোধে আচ্ছন্ন করছে। মনে হচ্ছে, শূন্য ভাবনায় পৌঁছাতে পারলে সমাধান মিলবে। কিন্তু সমস্যা যে কী, সে ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না।
আমার ঘনিষ্ঠ একজন বন্ধু পরামর্শ দিয়েছে, আমি যেন ডাক্তার দেখাই। আমি ডাক্তারিতে বিশ্বাসী না। আমি ঠিক কী বিশ্বাস করি আর করি না- সেটা জানি না। যা যেমন আছে, তেমন দেখতে চাই, কিন্তু কখনও তা দেখতে পাই না। যেমন- সেদিন দোকানে কলা কিনতে গিয়েছিলাম। কলা অনেকটা ঈদের চাঁদের মতো শরীর বাঁকিয়ে ঝুলছে। কিন্তু আমার মনে হতে থাকে, আমি হাসপাতালে একজন মানুষকে কুঁকড়ে থাকতে দেখছি, শরীরের রং ক্রমশ, এক্ষুনি ঝরে পড়বে- এমন হলুদ পাতার মতো হয়ে যাচ্ছে। তার পাশে কোনো ডাক্তার ভিজিটে নেই, তার পাশে তাকে সঙ্গ দেওয়া সবচেয়ে কাছের অ্যান্ড্রয়েড ফোন নেই। তিনি হাঁসফাঁস করছেন, এবং তিনি মারা যাবেন, ঠিক আমি যখন এই কলাটি খেয়ে ফেলব তখন।
আমার নিশ্চয়ই এই কলা খাওয়া উচিত নয়। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এই কলা না খেলে আমার পাকস্থলীতে যে গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ হচ্ছে, তা থামাতে পারব না। এবং আমি কলাটি খেয়ে ফেললাম। আমার চোখ দিয়ে ঘামের মতো নোনতা পানি গড়াচ্ছে, যেন এই মাত্র কাউকে খুন করেছি, এমন। এই মানুষটি ঠিক কোন হাসপাতালে আছে, তা বলতে পারব না। খুব অস্বস্তিকর।
সমস্যা কিন্তু এটাও না, সমস্যা অন্য জায়গায়। সমস্যা হচ্ছে, আমার চেহারা চুরি হয়ে গেছে। মানে আমার যে শারীরিক আদল ছিল, সেটা আর নেই। তাই অনেকেই আমাকে ঠিক চিনতে পারছে না। মুখটা কিছুদিন আগেও লম্বা ছিল। আচমকা গোল গোল লাগছে। একবার আয়না, ফোন, সেই সাথে পাসপোর্টের সাথে মিলিয়ে দেখছি, কিছুতে মিলছে না।
অবাক হচ্ছি ভেবে, আমি দেখতে কোনো নায়কের মতো না যে, আমার চেহারা কারোর দরকার। নিতান্ত সাধারণ, আটপৌরে চেহারার মানুষ। এ রকম চেহারা চুরি করে কার কী লাভ, সেটাই প্রধান সমস্যা। হাত পায়ের রং, আর গড়নে পরিবর্তন আসছে।
প্রতিদিন এত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছি, হয়তো সাত দিন পর আমাকে কেউ চিনতে পারবে না।

ক'দিন বাইরে বের হচ্ছি না। লেজার আয়নায় নিজের কঙ্কাল দেখছি। ভেতর থেকে সে হাসছে। মৃত্যু কখনও কঙ্কালের হাসি থামাতে পারেনি। জীবনকে নিয়ে তাদের হাসি থামে না। হতে পারে, আমরা এই হাসি থামিয়ে রাখার জন্য শরীর ধারণ করি। হতে পারে, চেহারা একটা পোশাক; যা চুরি হতে পারে।
নিজের সাথে নিজের এ বোঝাপড়ায় পেরে উঠছিলাম না। একে ওকে জিজ্ঞেস করছি, 'আমি ঠিক আছি তো, মানে দেখতে আগের মতো।'
অনেকে অবাক হচ্ছে, অনেকে খেয়াল করছে না কাজের চাপে।
কিন্তু আমার চেহারা আগের মতো নেই। সে জায়গায় অন্য একজনের চেহারা দেখতে পাচ্ছি, যে আমি না, যাকে স্বপ্নেও কখনও দেখিনি।
এমন সময় কল এলো, অচেনা নাম্বার, রিসিভ করলাম-
'হ্যালো?'
হ্যালো বলার সাথে সাথে চিনতে পারলাম আমার শেষ প্রেমিকা কল দিয়েছে, যার সাথে যোগাযোগ নেই বছর তিনেক।
এতদিন পর ফোন করলেও নিজের ভেতর অনুভূতির কোনো পরিবর্তন টের পেলাম না। যেমন সেতু ভেঙে গেলে নদীর ওপর তার ছায়ার অস্তিত্বও থাকে না, তেমন আমার কিছু মনে হচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবেই কুশলাদি বিনিময় হলো।
'কেমন আছো?'
ওপাশ থেকে আওয়াজ নেই।
কিছুক্ষণ পর আচমকা চেঁচিয়ে উঠল সে, আর বলল-
'তুমি হয়তো চাও না, আমার সন্তান হোক।'
আমি মুহূর্তে আকাশ থেকে পড়লাম। ভীষণ অস্বস্তি হলো। যার সাথে যোগাযোগ নেই, কেবল গল্পে পড়া চরিত্রের মতো আবছা ভাবনা হয়ে আছে, তার সন্তান না হবার জন্য আমি কেন, কীভাবে দায়ী?
'কী সব বলছ?'
বুঝতে পারি, প্রচণ্ড ক্রোধ সামলে সে বলতে থাকে তার জীবনের সকল সমস্যার কারণ আমি।
নির্বিকার ভঙ্গিতে ফোন কানে নিয়ে বসে থাকলাম।
এবার মেয়েটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে এবং বলে তার সংসার বাঁচবে না, যদি বাচ্চা না হয়।
বললাম-
'বাচ্চা তো সংসার বাঁচানোর উপকরণ না।'
একবার মনে হলো, যা হয়েছে ভালো হয়েছে। যারা বাচ্চাকে হাতিয়ার ভাবে, তাদের বাচ্চা না হওয়াই ভালো।
আচমকা খেয়াল হলো, আমি আর তাকে প্রেমিকা ভাবতে পারছি না, এর অর্থ হতে পারে, আমি একেবারেই ভুলে গেছি। এই ফোন আসার আগেও সে হয়তো আমার প্রেমিকা ছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, একজন বাইপোলার ডিজিজে আক্রান্ত মেয়ে আমাকে কল দিয়েছে।
এবার মেয়েটির সম্পর্কে কিছু বলা যাক। ওর নাম মলি। এই তিন বছরের ভেতর ওর জীবনে কী হয়েছে- আমার জানা নেই। যখন ওর সাথে আমার প্রেম-আলাপন ছিল, সে বলত- আমাকে তার ভালো লাগে, অনুভূতিও তীব্র কিন্তু সে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে না, তার মনে হতে থাকে আমি অনাবিস্কৃত গুহার মতো যেখানে মশাল ছাড়া ঢোকা যায় না।
সারাক্ষণ তার মনে হতো- একটা মিসিং লিঙ্ক ছিল আমাদের মধ্যে, যা সে ধরতে পারত না। অনেকটা অঘোষিতভাবে সম্পর্কের ইতি টেনে দেয় সে। আমিও তাকে আটকে ধরার চেষ্টা করিনি। আসলে আমার নিজেকে কখনও অসম্পূর্ণ মনে হয়নি আর অসম্পূর্ণতা ছাড়া সম্পর্ক হয় না।
কেন জানি ওর সাথে কথা বলার পর আরও বিরক্ত হই। মনে হতে থাকে, অভিযোগও এত আজব হয়? কয়েক ঘণ্টা এভাবে কেটে যায়। ধীরে ধীরে কেমন ভয় করতে থাকে। মনে হয়, আমি কি পরোক্ষভাবে দায়ী।
পরদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি, চেহারাটা একেবারে অন্য কারও হয়ে গেছে। নিজের এই নতুন চেহারার সাথে মানিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব ঠেকছে।
আচ্ছা, থানায় গিয়ে জিডি করে এলে কেমন হয় অথবা বিজ্ঞাপন দিই যদি।
একবার মনে হলো, মলির কোনো ঘটনার সাথে এই চেহারা বদলের ঘটনার যোগ আছে কী?
দ্রুত মলির ফেসবুক আইডিতে ঢুকলাম। ওর হাজব্যান্ডের ছবি দেখলাম। না, আমার পরিবর্তিত চেহারার সাথে কোনো মিল নেই।
মলিকে ফের কল দিই। একবার কল বাজতে সে রিসিভ করে এবং আগের রাগত স্বর ধরে রেখে জিজ্ঞেস করে-
'কেন কল দিয়েছ?'
'আমি জানতে চাইছি এমন আজব অভিযোগের কারণ কী?'
কারণ, তুমি চাও না, তুমি প্রায়ই বলতে, পৃথিবী সংকটের দিকে যাচ্ছে, একটা শিশুর বাসভূমি পৃথিবী না। কেবল সেটাই না, আমি দেখেছি নতুন কোনো প্রাণ, বিশেষ করে মানুষের বাচ্চার দিকে তুমি অদ্ভুত করে তাকাতে, যেন ওদের তোমার কখনও নিষ্পাপ মনে হতো না।
'হুঁ, তা এখনও ভাবি। কিন্তু এর সাথে এই অভিযোগের যোগ কী?'
'যোগ আছে, তুমি আজ সকালে আয়নায় দাঁড়িয়ে আমার কথা ভেবেছিলে, তাই না? তুমি আমাকে নিয়ে কখন কী ভাবো আমি তা শুনতে পাই, টের পাই।'
চমকে উঠি আমি। নিজের অবাক হওয়াকে সামলে, কিছু বুঝতে না দিয়ে বলি-
'আমার আরও কত জনের কথাই মনে পড়ে। তাতে কিইবা আসে যায়।'
মলি বিরক্ত হয়ে বলে-
'তুমি একবার একটা গল্প বলেছিলে, এক জাতের প্রজাপতি আছে, যারা তার সঙ্গিনীর সাথে সংগমের পর যোনিতে একধরনের গাম লাগিয়ে দেয় অথবা এমন একটা সিক্রেট স্মেল তার চারপাশে তৈরি করে রাখে যেন অন্য কেউ তার সাথে মিলতে না পারে। মনে পড়েছে?'
'মলি, আমাদের প্রেমটা প্লেটোনিক ছিল।'

২.
এর মধ্যে দুই বছর পেরিয়ে গেছে, মলির সাথে যোগাযোগ নেই। কেবল মলি কেন, কোনো মানুষের সাথে যোগাযোগ নেই তেমন। আর এর মধ্যে আমার চেহারা পুরোপুরি পাল্টে গেছে। প্রথম প্রথম কেউ লক্ষ্য না করলেও পরবর্তী সময়ে সবাই আমাকে সন্দেহ করতে থাকে। ভাবে, কোন অপরাধের সাথে জড়িত হয়ে প্লাস্টিক সার্জারি করে চেহারা পাল্টেছি? অনেকেই ডাক্তার দেখাতে বলে। ব্যাপারটা যদি এমন হতো- এই চেহারা পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরিত হয়েছে, সবাই তা প্রাকৃতিক মনে করত। কিন্তু একজন পুরুষ রূপান্তরিত হয়ে আরেকজন পুরুষ হয়েছে। এটা কারও পক্ষে মেনে নেওয়া একরকম অসম্ভব। কিন্তু এটাই সত্যি। আমার চেহারা চুরি হয়ে গেছে। যেন চেহারা রোদে শুকাতে দেওয়া একটা শার্ট, চুরি হয়ে যেতে পারে। পাসপোর্ট, এনআইডি কার্ডের ছবি পরিবর্তন করা সম্ভব হয়েছে, কিন্তু সামাজিকভাবে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে এখনও পারিনি।
কেবল তাই না, আয়নায় দাঁড়ালে নিজের আগের চেহারা মিস করি। এই চেহারা অনেকের মতে আগের চেয়ে সুন্দর, কিন্তু আমার আপন আপন লাগে না। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আগের ছবিগুলো দেখি।
আহা, আমি! ছোট থেকে বড় হওয়া আমি! তারুণ্য থেকে যৌবন! সবকিছু এক মুহূর্তে নাই হয়ে গেল।
এই নাই হয়ে যাওয়াটা একরকম মৃত্যু। কিন্তু কেউ তা বুঝতে পারছে না।
একজন ডক্টর প্রেসক্রাইব করলেন-
অতীত না, বর্তমান নিয়ে বাঁচুন।
আমি 'আচ্ছা' বলে ঘাড় নাড়িয়ে চুপচাপ চলে এলাম। নিজের নতুন চেহারার সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করছি। সেলুনে যাচ্ছি, নতুন রূপকে গ্রহণ করার চেষ্টা করছি। সেই সাথে ভয় পাচ্ছি, ফের না আমার চেহারা চুরি হয়ে যায়।
এতদিন ফেসবুক ডি-অ্যাক্টিভেট করে রেখেছিলাম যেন কারোর কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে না হয়। আগের ফটোগুলো ডিলিট করে দিয়েছিলাম। নিজের নতুন কিছু ছবি তুলেছিলাম কিন্তু পোস্ট করার ইচ্ছা হলো না। মলির ফেসবুকে ঢুকলাম।
আগের চেয়ে মোটা হয়েছে, বিশেষ করে ওর কাঠির মতো চিকন নাক ফুলে ঢ্যাঁড়শের মতো হয়ে আছে। আর কোলে ফুটফুটে একটা বাচ্চা। স্ট্ক্রল করে নিচে নামতে দেখি, সব ছবি তার বাচ্চার।
বাচ্চা হাঁটছে, হামাগুড়ি দিচ্ছে, খাচ্ছে, হাঁ করে তাকিয়ে আছে- এইসব।
মনে হতে থাকে, এই নতুন মানবশিশুর অতি স্বাভাবিক আচরণকেও মলির নতুন মনে হচ্ছে, এতে সে বুঁদ হয়ে আছে। যদিও আমার কাছে নিতান্ত একটা বাচ্চা, মলির কাছে মুহুর্মুহু আবিস্কার। মলি হয়তো এখন তার নিজের শরীরের চেয়ে গুরুত্ব দেয় এই বাচ্চার শরীরের দিকে। আমাদের সময় ফটোসেশনের যুগ ছিল না, তাই আমার ঐ সময়ের কোনো ছবি ছিল না। কিন্তু এখন বাচ্চা, মায়ের পেটের ভেতর দিকে শুনতে পায়, ক্লিক ক্লিক আওয়াজ। আর তার সেকেন্ডে সেকেন্ডে ফটোশুট তাকে জানিয়ে দেয়, পৃথিবীতে যেদিকে তাকাও আর যার দিকে তাকাও, কেবল তোমার মুখ ভাসছে, হাসছে, খেলছে।

নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
সেই সাথে ১২ বছর বয়সের 'আমি'কেও একপলক দেখে নিলাম। কারণ ১৬ বছর বয়সের আগে আমার কোনো ফটো ছিল না।
একবার মনে হলো মলিকে ফোন করে বলি-
আমার নিখোঁজ চেহারার মালিক পাওয়া গেছে, আমি খুশি। খুব খুশি। মনে হচ্ছে মলিকে আর ওর বাচ্চাকে একবার জড়িয়ে ধরি।
পাঁচ দিন আগে আচমকা অদ্ভুত এক খেয়াল জন্মেছিল। ফেসবুক থেকে মলির বাচ্চাটার একটা ছবি নামিয়ে সোজা একজন প্রফেশনাল আর্টিস্টের কাছে গেলাম। যার কাছে গেলাম প্রফেশনে সে কেবল আর্টিস্ট নয়, এখন অ্যানথ্রোপোলজিস্টও। তাকে গিয়ে বাচ্চার ছবি দেখিয়ে বললাম-
এই বাচ্চার ১২, ২৪, ৩৬ আর ৪৮ বছর বয়সে দেখতে কেমন হবে, তার ক্রমিক স্কেচ করতে।
তিনি আগ্রহী চোখে তাকিয়ে বললেন-
'এমন ইচ্ছার কারণ?'
'না, এমনিই ইচ্ছে হলো। তাছাড়া আমরা কেউ তো জানি না কে কতদিন বাঁচি, দেখার সাধ আরকি।
তিনি আর কথা বাড়ালেন না।
পাঁচ দিন পর পোর্ট্রেটগুলো হাতে পেলাম। ঘরে নিয়ে এলাম। ডিনার শেষ করে প্যাকেট খুলে আমার চক্ষু চড়কগাছ।
এ যে হারিয়ে যাওয়া আমি! ২৪ বছরের আমি, ৩৬ বছরের আমি। আমার চোখ আটকে গেল মলির বাচ্চার ৪৮ বছর বয়সী ছবির দিকে। আর মাত্র ৩ বছর পর, ৪৮ বছর বয়সে আমি নিশ্চয়ই এই চেহারা পেতাম। কিন্তু এই মুখ আমি হারিয়ে ফেলেছি।
আমি লাইট নিভিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতে থাকলাম। আর প্রায় রাতেই আমি অনুভব করি, বালিশের ভেতর থেকে আমার হূৎপিণ্ডের আওয়াজ। মাথার বালিশে আওয়াজ মিলছে, আমার হূৎপিণ্ডের পাল্‌স রেট বাড়ছে। আর আমার ইচ্ছা করছে, চিন্তাশূন্য হয়ে পড়তে।
কিন্তু যে চিন্তাটা আমাকে আরও অস্থির করে তুলছে, তা হলো- মলির বাচ্চা আমার চেহারা নিয়েছে, তাহলে আমি এই যে নতুন মুখ নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছি, এ কার মুখ?

আরও পড়ুন

×