ঢাকা রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

ডাচ রূপকথা

অহংকারী টি-পট

অহংকারী টি-পট

লিখেছেন হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন। বাংলা করেছেন রানাকুমার সিংহ। এঁকেছেন ফাইয়াজ হোসেন

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২২ | ১২:০০

সে অনেক অনেক দিন আগের কথা। তখন অহংকারী এক টি-পট ছিলো। সে ছিলো চীনামাটির তৈরি। তাই গর্বে যেন মাটিতে তার পা পড়ে না! কেবল চীনামাটির জন্যই না, সে তার বড় হাতলের জন্যও গর্ব করতো। তার গায়ে ছিলো কারুকাজ। এই নিয়েও গর্বের শেষ নেই। সামনে নল এবং পেছনে হাতল। তবে তার ঢাকনাটি ছিলো ফাটা এবং বল্টু দিয়ে আটকানো। তাই সে তার এই খুঁত নিয়ে কোনো কথাই বলতো না। তবে সে এটি জানতো যে, অন্যরা তার এই খুঁতের কথা দিব্যি বলে বেড়ায়। এমনকি চায়ের কাপ, পিরিচ এবং চিনির বাটিও টি-পটের ঢাকনার এই খুঁত নিয়ে নানা কথা বলতো। তখন টি-পট একটু নমনীয় হতো। সে তখন মনে মনে বলতো, 'আমি আমার অপূর্ণতা জানি এবং আমার অপূর্ণতার মধ্যেই আমার নম্রতা ও বিনয় লুকিয়ে আছে। আমাদের সকলেরই অপূর্ণতা আছে, কিন্তু আমাদের শক্তিও আছে। কাপের একটি হাতল আছে, চিনির বাটিতে একটি ঢাকনা আছে, আমার কাছে দুটোই আছে। আর সামনে একটি নলও আছে; যেটি ওদের নেই। আমাকে কেন্দ্র করে একটি দল আছে। দলটি আমাকে চায়ের টেবিলের রানী করে তোলে। আমি তৃষ্ণার্ত মানুষের জন্য আশীর্বাদের মতো। কারণ, আমার মধ্যে থাকা স্বাদহীন জল চা পাতার সংযোগে সুপেয় পানীয় হিসেবে পরিবেশিত হয়।'
নিজেকে সে এসব বলে ফের অহংকারী করে তোলে! একদিন পরিবেশনের আগে চায়ের টেবিলে অন্য পাত্রসহ টি-পটটি সাজানো ছিলো। হঠাৎ একজন পাত্রটি তুলতে গিয়ে ফেলে দেয়। নিচে পড়ে চায়ের পাত্রটির থুতনি ছিঁড়ে যায় এবং হাতলটিও ভেঙে যায়। ঢাকনাটিও লুটিয়ে পড়ে।
টি-পট মেঝেতে কাতর হয়ে শুয়ে থাকে। তার ভেতর থেকে গরম জল বেরিয়ে যায়। টি-পটটির জন্য এটি একটি ভয়ংকর লজ্জার বিষয়ই বটে! তবে তার সবচেয়ে খারাপ লাগলো- যখন সবাই তাকে নিয়ে ঠাট্টা করছিলো। তারা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে অথচ যে তাকে ফেলেছে তাকে কিছুই বলছে না।
এই ঘটনার পর ঘরের মালিক টি-পটটিকে বাতিল করে ঘরের এক কোণে ফেলে রাখে। একদিন এক ভিক্ষুককে বাতিল পাত্রটি দিয়ে দেয় মালিক। দরিদ্র পরিবারে গিয়েও টি-পটটি অকেজো হয়ে পড়ে থাকে। উন্নত আর আয়েশি জীবন কাটানো অহংকারী পাত্রটি উঠোনের এক কোণে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। সে তার সুন্দর অতীতের কথা ভেবে ভেবেই দিন কাটায়!
একদিন কেউ একজন টি-পটে ফুলের গাছ রোপণ করে। তাকে ঘরের কোণ থেকে তুলে এনে বারান্দায় স্থান দেয়। এতে টি-পটের মন ভালো হয়ে যায়। গরম জল বহন করা টি-পট এখন জীবন্ত ফুলগাছ ধারণ করছে তার মধ্যে। আগে কখনও তার এমন অভিজ্ঞতা হয়নি। সে এখনও কাজের; ভাবতেই গর্বে বুক ভরে ওঠে তার। টি-পটের জন্য এটি ছিলো নতুন অভিজ্ঞতা।
এরই মধ্যে গাছটিতে ফুল আসে। সবাই ফুলগাছের প্রশংসা করে। অথচ টি-পটের খোঁজ কেউ নেয় না। এমনকি ফুল গাছও টি-পটকে কোনো ধন্যবাদ দেয় না। এর মধ্যে একদিন একজন বললো, ফুল গাছটি আরো ভালো পাত্রের যোগ্য। এ কথা শুনে টি-পট খুব কষ্ট পেলো। কিন্তু তার কষ্টে কারও কিছু যায় আসে না। ঠিকই ফুলগাছটি আরও ভালো পাত্রে নিয়ে রাখা হলো। আর অহংকারী টি-পটকে ফের উঠোনের এক কোণে অকেজো জিনিসপত্রের সঙ্গে ফেলে রাখলো। সে নেতিয়ে পড়ে থাকলো। আর ভাবতে থাকলো তার ফেলে আসা দিনের সুন্দর স্মৃতিগুলোর কথা!

আরও পড়ুন

×