ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

মানসিক উত্তেজনা থেকে হার্ট অ্যাটাক

মানসিক উত্তেজনা থেকে হার্ট অ্যাটাক

ডা. শাহরিয়ার ফারুক

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৩ ডিসেম্বর ২০২২ | ২২:৩৭

মানসিক চাপ বা স্ট্রেস শরীরের বিভিন্ন অংশকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষত হৃদযন্ত্র ও সংবহনতন্ত্রের ওপর এর প্রভাব হতে পারে মারাত্মক। মানুষের হৃদযন্ত্র এবং এর রক্তপ্রবাহ কীভাবে শারীরিক ও মানসিক চাপ দ্বারা প্রভাবিত হয়, তা জানতে ২০২১ সালে ৯০০ মানুষের ওপর একটি পরীক্ষা করা হয়। তাতে দেখা যায়, অতিরিক্ত মানসিক চাপ হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ও কার্যকারিতার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, পাঁচ বছর সময়ের মধ্যে মানসিক চাপে ভোগা মানুষদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় দ্বিগুণ।রোগের আজ আর কোনো বয়স নেই। ছোটদের শরীরের হাই ব্লাড সুগার কিংবা প্রেশার খুবই সাধারণ ব্যাপার। তেমনই অল্পবয়সীদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা বাড়ছে ক্রমাগত। এর নির্দিষ্ট কিছু কারণের মধ্যে অনেকেই জীবনযাত্রাকে দায়ী করেন। প্রাচীনকাল থেকেই হূৎপিণ্ডের সঙ্গে মনের সম্পর্কের কথা বলা হচ্ছে। মানসিক উৎকণ্ঠা বা উত্তেজনার সময় দ্রুত হূৎস্পন্দন, বুক ধড়ফড় করা বা বুকে ব্যথা অনুভূত হয়। অনুভূতির সঙ্গে হূৎপিণ্ডের নিবিড় সম্পর্কের কথা জানা যায়। জীবনের কোনো উত্তেজনাকর বা সংঘাতময় পরিস্থিতিতে কোনো কোনো মানুষ হঠাৎ হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারেন।

মানসিক উৎকণ্ঠা-উত্তেজনা বা স্ট্রেসের সময় দ্রুত হূৎস্পন্দন অনুভূত হয়। বুক ধড়ফড় করা বা বুকে ব্যথাও দেখা দিতে পারে। এ অবস্থাকে আমরা বিজ্ঞানের পরিভাষায় সিম্প্যাথেটিক ওভার অ্যাকটিভিটি বা স্নায়ুর অতিরিক্ত তাড়নাকে বোঝায়। অনুভূতির সঙ্গে হূৎপিণ্ডের নিবিড় সম্পর্কের কথা জানা যায়। জীবনের কোনো উত্তেজনাকর বা সংঘাতময় পরিস্থিতিতে কোনো কোনো মানুষ হঠাৎ হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারেন।হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা থেকে বাঁচতে হলে আগে এর ঝুঁকির কারণ সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।

সাময়িক মানসিক উত্তেজনা শরীর সহজেই মেনে নেয়। একটানা মানসিক উত্তেজনা ও দুশ্চিন্তা হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাকের একটি ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান। অনেক সময় দেখা যায়, হার্ট অ্যাটাকের আগে রোগী কোনো না কোনো ধরনের দুশ্চিন্তা বা উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়েন। মানসিক উত্তেজনা বলতে আমরা বুঝি উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, অসংলগ্ন কথা বলা বা অসুখকর পারিপার্শ্বিক অবস্থা। এই মানসিক উত্তেজিত ব্যক্তি নানা রকম অভিযোগ নিয়ে আসতে পারেন। যেমন- মনের অস্থিরতা, বুক ধড়ফড়, মাথাব্যথা, নিদ্রাহীনতা ও হতাশা।

রোগী যখন দীর্ঘদিন ওই উপসর্গ নিয়ে থাকেন, তখন হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপের সৃষ্টি হয়। এতে হূৎস্পন্দন ও হৃদযন্ত্রের ভেতর রক্ত সঞ্চালনের হার ও হূৎপিণ্ডে অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে যায়। মানুষের চিন্তাভাবনা, উত্তেজনা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে সিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম। টেনশন বা উত্তেজনার ফলে সিম্প্যাথেটিক নার্ভতন্ত্রের কাজ বহু গুণ বেড়ে যায়। এ অতিরিক্ত সিম্প্যাথেটিক ক্রিয়ার ফলে এড্রেনালিন নিঃসরণ বাড়ে, হূৎস্পন্দন বাড়ে, উচ্চ রক্তচাপ হয় ও ধমনিতে চর্বির আস্তরণ পড়ার গতি বেড়ে যায়। যাঁরা সব সময় অর্থ-সম্পদের কথা ভাবেন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী, তাঁরা সহজে স্থ্থির থাকতে পারেন না। প্রায় সময়ই টেনশনে ভোগেন এবং সব কাজে তাড়াহুড়া করেন। এদের টাইপ 'এ' পারসোনালিটি বলা হয়। এই টাইপ 'এ' পারসোনালিটির মানুষের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা বেশি। কারণ মানসিক চাপের ফলে শুধুই যে রক্তে চর্বি জমাট বাঁধা বেড়ে যায়, তা নয়। হূৎপিণ্ডের স্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়তে থাকে। ধমনির সংকোচনের প্রবণতাও এদের বেশি। এ অবস্থ্থা নিয়মিত চলতে থাকলে হূৎপিণ্ডের রক্ত চলাচল বাধা পায়। ফলে প্রথম এনজাইনা ও পরে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা বহু গুণ বেড়ে যায়।

মানসিক উত্তেজনার প্রতিকার

একজন ব্যক্তিকে মানসিক উত্তেজনা থেকে মুক্তি পেতে হলে তার পরিপূর্ণ মানসিক প্রস্তুতি দরকার। নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, নিজেকে কোনো আনন্দমুখর কাজে নিয়োজিত রাখা, আত্মসম্মোহন পদ্ধতি দ্বারা নিজেকে টেনশন থেকে মুক্ত রাখা যায়। অনেকের টেনশনের সঙ্গে ধূমপান, মদ্যপান ইত্যাদি গ্রহণের পরিমাণও বেড়ে যায়, যা হার্ট অ্যাটাককে আরও ত্বরান্বিত করে। মানসিক চাপও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।, মানসিক চাপ অত্যধিক বেড়ে গেলে অবশ্যই চিকিৎসা করানো দরকার। সেই সময় কাউন্সেলিং সাপোর্টের দরকার হয়। এতে মানসিক চাপের সঙ্গে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়।

- হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে হলে মানসিক চাপ সৃষ্টি করে বা করতে পারে এমন অবস্থ্থা থেকে বিরত থাকতে হবে।

- নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

- টেনশন কমাতে সব সময় কাজের কথা না ভেবে ছুটি উপভোগ করুন।

- বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজ করুন।

- শখের কাজ যেমন বই পড়া, বাগান করা, পরিবারের সবাইকে নিয়ে বেড়াতে যাওয়া।

[বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক]

আরও পড়ুন

×