ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

সাইবার জগতে প্রতারণার ফাঁদ

সাইবার জগতে প্রতারণার ফাঁদ

চিত্রকর্ম : নাজমিন নিগ্রো

--

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ০৮:৪৫

বাংলাদেশে সাইবার পরিসরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ঘটছে হয়রানির ঘটনা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন। সে তুলনায় সাইবার জগৎ সম্পর্কে সুরক্ষা-সচেতনতা তৈরি হয়নি সেভাবে। 'সহজ টার্গেট' হিসেবে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন নারীরা। লিখেছেন বাসন্তী সাহা

বাংলাদেশে প্রতি ১২ সেকেন্ডে একটি সোশ্যাল মিডিয়া আইডি খোলা হয়। ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রামের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে এই আইডি খোলা হয়। বিটিআরসির তথ্য মতে, এখন দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১১ কোটি ২৭ লাখ ১৩ হাজার। মোবাইল সিম ব্যবহারের সংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের একটি বড় অংশ এখন হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

কয়েকদিন আগে ঘুরে এলাম নোয়াখালী জেলার কবিরহাট উপজেলার কয়েকটি চর এলাকা থেকে। সেখানে কথা বলেছিলাম কবিরহাট সরকারি কলেজের কয়েকজন ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে। সবার হাতে স্মার্টফোন। কী কর এই ফোন দিয়ে? ছাত্রীরা জানায়, কথা বলি, ছবি তুলি আর শেয়ার করি। ছাত্ররা জানায়, খেলার আপডেট পাই, কথা বলি। কখনও কোনো হয়রানির শিকার হয়েছে কিনা- জানতে চাইলে ওরা জানায়, এখনও বড় ধরনের হয়রান হয়নি। তবে তাদের ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে বন্ধু হতে চাওয়া, বাজে ছবি পাঠানো বা মোবাইলে বিকাশের পিন নম্বর চাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। সাইবার বুলিং বা হয়রানি ব্যাপারটা সম্পর্কে তারা ততটা জানে না। ঘটলে কী করতে হবে, তাও তারা জানে না।
এ প্রসঙ্গে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ নরোত্তম হালদার বলেন, 'ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে হয়রানি হয়, সেটিই সাইবার হয়রানি। এটি ফেসবুক, মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম, গেমিং প্ল্যাটফর্ম বা বিভিন্ন অ্যাডাল্ট সাইট থেকে হতে পারে।' নারীর ক্ষেত্রে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ থেকে ছবি নিয়ে এডিট করে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে অথবা বিব্রতকর ও অবমাননাকর ছবি তুলে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে হয়রানি করা হয় বেশি। ফেক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বন্ধু হওয়াও খুব অহরহ ঘটছে। সাইবার হয়রানির শিকার এক মা সুমি বিশ্বাস বলেন, 'আমার মেয়ের যখন জন্ম হয় তখন একটি ছবি ফেসবুকে শেয়ার করেছিলাম। এরপর আমার এক আত্মীয় এ ছবিটা পাবলিক করে। তারপর থেকে অন্তত দুবার শিশুটি মারা গেছে বলে কে বা কারা পোস্ট করে ভাইরাল করে দেয়। এটি আমাদের মা-বাবার জন্য ভীষণ কষ্টের একটা ব্যাপার।'
নারী উন্নয়ন কর্মী নাদিরা বেগম বলেন, 'কম লেখাপড়া জানা মেয়ে, যাঁদের স্বামী বিদেশে থাকেন বা ঢাকায় চাকরি করেন, তাঁরা গ্রামে একা থাকেন। তাঁদের অনেকেরই ফেসবুকে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। কারও কারও বন্ধুত্ব একটু বেশি ঘনিষ্ঠ হলে সেই কথোপকথন বা ছবি তাঁর সেই বন্ধু সেভ করে রাখে। পরে মেয়েটি যদি সম্পর্ক রাখতে বা কথা বলতে না চান, তখন এটা ফেসবুকে বা অন্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।'

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি নিয়ে যে হাইকোর্টের একটি আদেশ আছে, সে সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েরাও জানেন না। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে কী করবেন, কার কাছে যাবেন তা জানেন না। এখানে আইন, আইন প্রয়োগকারী বাহিনী ও গণমাধ্যমের একসূত্রে কাজ করতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগেই প্রতিরোধ সম্ভব বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের তথ্য মতে, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ৭ জন সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীসহ ফেসবুক ব্যবহারকারীর একটি বড় অংশ সাইবার বুলিংয়ের শিকার। তথ্য বলছে, ১৪ বছরের কিশোরী থেকে ৩৫ বছরের নারীরা রয়েছেন ভুক্তভোগীর তালিকায়। নারীরা সবচেয়ে বেশি হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ নিয়ে আসেন।

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মো. রফিকুল আলম বলেন, "সাইবার হয়রানি প্রতিরোধে ঢাকা পুলিশ হেডকোয়াটার্সে একটি ডেডিকেডেট সেল রয়েছে, যেখানে একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ ছাড়া 'সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন' নামে একটি ফেসবুক পেজ আছে। টোল ফ্রি একটি মোবাইল নাম্বার ও টিঅ্যান্ডটি নাম্বার রয়েছে, যেখানে ফোন করে বা লিখে ভিকটিম প্রতিকারের জন্য সাপোর্ট চাইতে পারেন। দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার অপরাধ দমনে একটি ইউনিট রয়েছে। যেখানে কেউ সাপোর্ট চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে বা সাত দিনের মধ্যে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর বাইরে দেশের প্রতিটি থানায় নারী ও শিশু, প্রতিবন্ধী ও সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য আলাদা হেল্প ডেস্ক রয়েছে, যেখানে ফোন করে বা সরাসরি গিয়ে কোনো নাগরিক যে কোনো সহায়তা চাইতে পারেন। সহায়তা চাইলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা করার ব্যাপারে পুলিশ সদস্যরা তৎপর রয়েছেন।"

অনলাইনে হয়রানি, অপব্যবহার ও ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং দ্রুত শাস্তির পরামর্শ দিয়েছেন উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ আর্টিক্যাল-১৯-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারুক ফয়সাল। তাঁর মতে, সাইবার জগতে নানারকম লোক ঘুরে বেড়ায়। তাই নিজের সুরক্ষা নিজেকেই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, 'অপরাধ তো হবেই, সেটা ঠেকানো যাবে না কিন্তু প্রতিকার করতে হবে। তাহলে অপরাধের ঘটনা কমে আসবে। অনেক সময় ব্যক্তিগত আক্রোশে কারও নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে গুজব ছড়ানো হয়। এগুলো নিয়ে যথাযথ তদন্ত হওয়া দরকার। শাস্তি হওয়া দরকার। আমাদের মিডিয়া ইনফরমেশন লিটারেসি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে।'
লেখক:সমন্বয়কারী (রিসার্চ ও ডকুমেন্টেশন), দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থা

আরও পড়ুন

×