ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

জটিল কাজের কাজি শেওড়া

জটিল কাজের কাজি শেওড়া

জায়েদ ফরিদ

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

শেওড়া গাছকে আমরা সংক্ষেপে বলি শড়া গাছ। শড়া গাছে পেতনি থাকে–এই বিশ্বাসের কারণে গাছটির একটি আঞ্চলিক নাম পেতনিশড়া গাছ। ভূতের নিবাস কল্পনা করে সংস্কৃতে এর এক নাম হয়েছে ভূতাবাস। ভূত-পেতনির নিবাস কেন হলো, তা গাছটির স্বভাব বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়। শেওড়া গাছের পাতা এত ঘন সন্নিবিষ্ট থাকে যে, এর ভেতরে সহজে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না। ঝাঁকড়া পাতার মধ্যে মাঝে মধ্যে গরুর চোখের আকৃতি ছোটখাটো খোলা জায়গা দেখা যায় বলে এর এক নাম গবাক্ষী। এই গবাক্ষপথে কিছু সূর্যালোক ভেতরে ঢোকে ঠিকই কিন্তু তা যেন বিলীন হয়ে যায় ভেষজ ব্ল্যাকহোলের গভীরে। গাছের অভ্যন্তরে ভরদুপুরেও দেখা যায় নিবিড় অলৌকিক অন্ধকার। এমন অন্ধকার গাব আর তমাল গাছেও অনেকটা দেখা যায়। যে কারণে এসব গাছে ভূত-পেতনির অস্তিত্ব কল্পনায় আসে।

 স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা শেওড়া গাছের ওপরদিকের ডালপালা এমন ঠাসবুনট থাকে যে সেই ডালপালা অতিক্রম করে এর মুকুট বা ক্যানপিতে ওঠা রীতিমতো দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। সংস্কৃতে এ কারণে এই গাছের এক নাম শাখোটক। শাখার সঙ্গে ‘উটক’ যোগ হয়ে শাখোটক। প্রাচীন ‘উটক’ শব্দের অর্থ ছাদ। বেদ-আয়ুর্বেদে এই বৃক্ষ সমাদৃত হয়েছে। অথর্ববেদের সূক্ত থেকে এই গাছের একটি বিবরণ পাওয়া যায় এর মহোপকারী গুণাবলিসহ। এটি কফবিনাশী ও পিত্তভক্ষণকারী বৃক্ষ। দিবানিদ্রায় আসক্ত, কফ ও মেদবহুল শ্রমবিমুখ মানুষের জন্য, স্ক্রফুলা, গণ্ডমালা, বায়ুবিকার, অর্শ, আমাশয়, কুষ্ঠ, গোদ (filaria) ইত্যাদি রোগে একে ব্যবহার করা যায়। বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞান শেওড়া গাছ থেকে এলিফ্যান্টায়েসিস ও ক্যান্সার জাতীয় কঠিন রোগের নিরাময় নিয়ে গবেষণারত রয়েছে। এর বীজ থেকে এক ধরনের টনিক, লাকড়ি জ্বালানো ধোঁয়া থেকে নাকের পলিপের চিকিৎসা, ছাল থেকে সর্পবিষনাশক এবং শেকড় থেকে ডিপথেরিয়া ও দাঁতের ওষুধ তৈরি হতে পারে।

শেওড়া গাছের পাতা ডুমুর-পাতার মতো খসখসে কিন্তু বেশ শক্ত। রোমান ও মিসরীয় সভ্যতায় নানাবিধ ব্যবহারের সঙ্গে স্যান্ডপেপার বা শিরীষ কাগজ হিসেবেও এদের ব্যবহার ছিল। শক্ত কাঠ পালিশ করার জন্য এই পাতা তেমন উপযোগী না হলেও সূক্ষ্ম কিছু কাজের জন্য এর ব্যবহার রয়েছে। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে পিউটার নামে একটি সংকর ধাতুর ব্যবহার আছে; যা বানানো হয় শতকরা প্রায় ৯৭ ভাগ টিনের সঙ্গে তামা ও এন্টিমনি মিশিয়ে। এমন মিশ্রণের কারণে ধাতুটা নরম হয়ে বিভিন্ন কাজের উপযোগী হয়। চিনামাটির বাণিজ্যিক প্রসারের আগ পর্যন্ত বাসনকোসন, ছুরি-চামচ ইত্যাদি টেবিল-ওয়ার নির্মাণে যথেষ্ট পরিমাণে এই পিউটার ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে ব্যবহার কমে গেলেও পিউটার দিয়ে খুব সুন্দর কিছু ভাস্কর্য, ক্যান্ডল স্ট্যান্ড, তিমি-তেলের চেরাগ ইত্যাদি তৈরি হয়। কয়েকশ বছর ধরে শেওড়া পাতার একটি বড় রকমের ব্যবহার ছিল কাগজ উৎপাদনে, যা তৈরি করা ছিল কষ্টদায়ক ও সময়সাপেক্ষ। মাঝারি বয়সের গাছের বাকল আর ছোট ডাল চুনের পানিতে মেশানোর পর একটা বড় পাত্রে জ্বাল দেওয়া হতো অনবরত দুই দিন। এরপর কাঠের হাতুড়ি দিয়ে পরিমিত চাপে ছেঁচা হতো ৮ বার। এভাবে ফাইবার বের করতে সময় লেগে যেত প্রায় ১০ দিন। শেওড়া-বাকল দিয়ে নির্মিত কাগজ কখনও সাধারণ কাগজের মতো হলুদ হয়ে যায় না, আর্দ্রতায় টিকে থাকে। এতে পোকা ধরে না এবং আগুনেও সহজে নষ্ট হয় না। এসব কারণে এই কাগজ থাইল্যান্ডে, যার নাম খৈ-কাগজ, তা অনেকাংশে ব্যবহার করা হয়েছে বুদ্ধের বাণী এবং পারিবারিক দলিল সংরক্ষণ করার জন্য।

শেওড়া গাছে মটরদানার মতো ছোট হলুদ ফল ধরে; যার স্বাদ মন্দ নয়। এই ফল শুকিয়ে ঘানিতে পিষে এক ধরনের তেল তৈরি হয়, যা আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসার নানা কাজে লাগে। শ্বেতী রোগীর শরীরের আক্রান্ত অংশে নিয়মিত এই তেলের প্রলেপ লাগালে মাসখানেক পর থেকে জায়গাটার রং স্বাভাবিক হতে থাকে; তবে রোমবিহীন হাত-পায়ের তালুতে এটা কার্যকর হয় না। টুথব্রাশ হিসেবে শেওড়া গাছের ডাল খুব উপকারী। আমাদের দেশে আধুনিক প্লাস্টিক ব্রাশ এবং ‘আরাক’ গাছের মিসওয়াকের আগে শেওড়া-ডাল দিয়ে দাঁত মাজার ব্যাপক রেওয়াজ ছিল। এর রগড়ানো পাতা দিয়ে অনেক দেশেই দই জমানো হয়, আমাদের দেশে ভূত-পেতনিপ্রসূত কুসংস্কারের কারণে অনেকেই এ কাজ থেকে বিরত থাকেন। 

আরও পড়ুন

×