ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

শাপলার রাজ্য সাতলা গ্রাম

শাপলার রাজ্য সাতলা গ্রাম

রুবেল মিয়া নাহিদ

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

বরিশাল সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের উত্তর সাতলা গ্রাম। গ্রামের নামেই বিলের নাম, সাতলা বিল। তবে শাপলার রাজত্বের কারণে সেটি এখন ‘শাপলা বিল’ নামেই বেশি পরিচিত। শাপলা বিলের রঙিন হাসিতে উজ্জ্বল গ্রামটি। টলটলে পানিতে ভরা সেই বিল। বছরের একটা সময়ে কয়েক একর এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে লাল টুকটুকে শাপলা। সন্ধ্যা নদীর প্লাবন ভূমিটি এখন সবার কাছে শাপলারাজ্য। গ্রামের নিম্নাঞ্চল বর্ষার পানিতে ডুবে গেলে জুলাই থেকে শাপলা ফোটা শুরু হয় এবং নভেম্বর পর্যন্ত ফুল ফুটতে থাকে।

এক পলকে মনে হবে, লাল শাপলার কোনো চাদর। বিলজুড়ে বিছানো শাপলা। বিলের মাঝে যাদের বাড়ি, যাতায়াতে নৌকাই তাদের একমাত্র বাহন। এ বিলে ভ্রমণের জন্য রয়েছে ছোট আকারের নৌকা। এই নৌকায় করে পুরো বিল বেড়ানো, পানির কলকল ধ্বনি আর তাজা ফুলের দৃশ্য মনে ভিন্ন এক অনুভূতির জোগান দেয়। নয়নাভিরাম দৃশ্যের মাঝেই সাদা বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, ফিঙে, শালিক, দোয়েল, চড়ুই, কাঠঠোকরাসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির পাখির কলকাকলিও থাকছে। এখানে কবে থেকে শাপলা ফোটা শুরু হয়েছে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত করে কেউ জানাতে পারেননি। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা জানান, জন্মের পর থেকেই তারা এই বিলে শাপলা ফুটতে দেখছেন। তিন ধরনের শাপলার দেখা মিলে এই বিলে– লাল, সাদা ও বেগুনি। লাল শাপলাই বেশি দেখা যায়। সাতলার প্রায় ১০ হাজার একর জলাভূমিতে শাপলার দেখা মেলে।

এ সময়টায় কৃষিকাজ না থাকায় কৃষিজীবী পরিবারগুলোর কাছে শাপলা যেন আশীর্বাদ হয়ে ধরা দেয়। শাপলা বিল শুধু সৌন্দর্য নয়, এই বিলের ওপর এলাকার অসংখ্য পরিবার জীবিকা নির্বাহ করছে। এদের কেউ শাপলা তুলে, কেউবা বিল থেকে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বছরের এই সময় বিল ভরা শাপলা থাকায় সাতলার জনপদজুড়ে আসে আনন্দ।

সৌন্দর্যের সঙ্গে এখানকার দরিদ্র মানুষগুলো শাপলানির্ভর কর্মযজ্ঞ করে আর্থিকভাবে টিকে থাকে। কেউ হয়তো বিলের পানিতে বৈঠা চালান, নৌকায় বসে তাঁর ছেলে বা মেয়েটি টেনে টেনে নৌকায় তোলে শাপলা। সকালের আলোর তীব্রতা বাড়ার আগেই শাপলাগুলো নিয়ে হাটে যেতে হয়। তাই খুব সকাল থেকে শুরু হয় পারিবারিক কর্মযজ্ঞ। স্থানীয় বাজারে প্রতিটি শাপলার আঁটি বিক্রি হয় ৮ থেকে ১০ টাকা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরের এই সময় জল্লা ইউনিয়নের হারতা, বাগদা, কারফা, সাতলা, পশ্চিম কালবিলাসহ ৭ থেকে ৮টি গ্রামের অনেক পরিবারের জীবিকা চলে শাপলা সংগ্রহ ও বিক্রির মাধ্যমে। এ অঞ্চলে বড়-ছোট প্রায় ২০টি বিল রয়েছে, ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিকে শীতের মৌসুমে যখন পানি কমে যায়, তখন সব শাপলা মরে যায়। ওই সময় কৃষকরা এখানে ধান চাষ করেন। কৃষিসংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত মোট ছয় মাস এই সাতলা বিলে পানি জমে থাকে। পানি জমে থাকার কারণে বিলটি এক ফসলা জমিতে পরিণত হয়েছে।

প্রতি বছর ধানের মৌসুমে জমিতে চাষ দেওয়া হলেও মাটির সঙ্গে মিশে থাকছে শাপলা-শালুকের বীজ। ফলে পরের বছর বিলে পানি আগমনের সঙ্গে সঙ্গে এই বীজ থেকেই আবার শাপলার জন্ম হচ্ছে। ধানের মৌসুমে এই বিলেই অনেকে দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। পানি এলে জমির মালিকরা মাছ ছাড়েন, তখন তারা সেখানে কাজ করেন। আবার শাপলার বিলে দর্শনার্থীদের নৌকায় ঘুরিয়েও এই মৌসুমে ভালো আয় হয় বলে জানান স্থানীয়রা। সব মিলিয়ে সারা বছর সাতলা বিলের ওপর নির্ভরশীল থাকেন স্থানীয় লোকজন। v

আরও পড়ুন

×