ঢাকা রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

জলবায়ু পরিবর্তন

বিশ্বজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ

বিশ্বজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ

মোশারফ হোসেন

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আবহাওয়া আরও চরমভাবাপন্ন ও তীব্র হয়ে উঠছে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ না কমালে বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বাড়ার বিরূপ প্রভাব চলতেই থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে দাবানল, তীব্র তাপদাহ, খরা ও অতিবৃষ্টির মতো বিষয়গুলো সম্পর্কযুক্ত। বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব ও সংকট নিয়ে লিখেছেন মোশারফ হোসেন

দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ুর উষ্ণায়নে আমাদের খুব একটা ভূমিকা নেই। তবে সবচেয়ে আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ার কারণে আগামী বছরগুলোয় ফুটন্ত অবস্থার সৃষ্টি হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্র স্রোতের পরিবর্তন হবে। আমাদের বাস্তুসংস্থান বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরনেও পরিবর্তন আসবে। জলবায়ুর পরিবর্তনে সমুদ্র স্রোতে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে মৌসুমি বায়ুতে পরিবর্তন দেখা দেবে। এ সময় দেখা যাবে কোনো কোনো এলাকায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে, কোনো কোনো এলাকায় প্রচুর খরা দেখা দিচ্ছে। আবার খরা এবং বৃষ্টিপাত দুটো একসঙ্গে হতে পারে।

ফলে জীববৈচিত্র্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকামাকড়ের আচরণে পরিবর্তন হবে। ফসল, ফল উৎপাদনে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে এবং উৎপাদন বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূল অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা বেড়ে যাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় উপকূলে নোনাপানির পরিমাণ বেড়ে যাবে। এতে সাধারণ মানুষসহ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। সব মিলিয়ে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য, জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়বে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় মানুষ শহরমুখী হবে। ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন শহরে উষ্ণতা বেড়ে যাবে। এতে শহরাঞ্চলে বিভিন্ন রকমের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। এ জন্য আমাদের দায়বদ্ধতার চেয়েও বৈশ্বিক উষ্ণতা বেশি দায়ী।

দাবানল বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় প্রাকৃতিকভাবে দাবানলের ঘটনা ঘটছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দাবানল ছড়াচ্ছে কিনা, তা বের করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে ভূমি ব্যবহারে পরিবর্তনের বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয় আছে। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দাবানল ছড়িয়ে পড়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। চরম ও দীর্ঘস্থায়ী তাপ গাছপালা ও মাটি থেকে অনেক বেশি আর্দ্রতা টেনে নেয়। আবহাওয়ার এই শুষ্ক অবস্থা দাবানলের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে যদি বাতাস খুব শক্তিশালী হয় তাহলে দাবানল খুব দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গত মাসের মাঝামাঝিতে গ্রিসের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় ধরনের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময়ের প্রচেষ্টার পর দাবানল নিয়ন্ত্রণে আসে। এ সময় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় রোডস আইল্যান্ড। তীব্র দাবানলের কারণে এক দিনে প্রায় ২০ হাজার পর্যটক এই দ্বীপ ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। দাবানলের কারণে অন্তত পাঁচজন মারা যান। পুড়ে গেছে ৫০ হাজার হেক্টরের বন ও গাছপালা। গ্রিসের দাবানলের ফলে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে বেড়েছে তাপমাত্রা। কানাডায় এই মৌসুমে ৩০ কোটি একর জমি দাবানলের আগুনে পুড়ে গেছে; যা দক্ষিণ কোরিয়া বা কিউবার মোট ভূমি থেকেও বেশি। দাবানলে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশ। এতে আগুন নেভাতে গিয়ে ৩ দমকল কর্মী ও একজন পাইলট নিহত হন। কানাডায় বর্তমানে সক্রিয় ৯৯০টি অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে ৬১৩টি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। গত জুনে আটলান্টিক উপকূলের নোভা স্কোটিয়ায় দমকলকর্মীরা প্রদেশের সবচেয়ে বড় দাবানলের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। এ ছাড়া এ বছরের শুরুতে চিলি এবং অস্ট্রেলিয়ায় দাবানলের ঘটনা ঘটে। গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমের বেশ কিছু অঞ্চলে দাবানলে পুড়ে যাওয়া জায়গার পরিমাণ বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, ভূমির ব্যবহার ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে দাবানল আরও ঘন ঘন ও তীব্র হবে।

গরম ও দীর্ঘ তাপপ্রবাহ গড় তাপমাত্রায় সামান্য বৃদ্ধি বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে ঠান্ডা অঞ্চল আরও উষ্ণ হতে থাকে। মনুষ্যসৃষ্ট উষ্ণায়নের কারণে বিরূপ আবহাওয়ার মতো ঘটনা ঘটার আশঙ্কা খতিয়ে দেখতে বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার সিমুলেশন ব্যবহার করেন।

ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক অনুসারে, ২০২৩ সালের জুলাই মাসে দক্ষিণ ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল ও মেক্সিকোয় তীব্র তাপপ্রবাহ মনুষ্যসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া কার্যত অসম্ভব ছিল। সতর্ক করে দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বলে, যদি বৈশ্বিক উষ্ণতা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে চলে যায়, তাহলে এ ধরনের ঘটনা প্রতি ২-৫ বছরের মধ্যে ঘটতেই থাকবে। এ বছরের জুলাইতে যুক্তরাজ্যে রেকর্ড ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয় ওঠে। জলবায়ু পরিবর্তন না হলে, এ রকম ঘটার আশঙ্কা ছিল না। অন্যদিকে গড় হিসেবে আর্কটিক অঞ্চল বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল থেকে চার গুণ দ্রুতগতিতে উষ্ণ হচ্ছে। শুধু গত বছরের গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহে ৬১ হাজার ৬৭২ জন মারা যায়। ইতালি, গ্রিস, স্পেন ও পর্তুগালে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি।

দীর্ঘ খরা
জলবায়ু পরিবর্তনকে খরার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করা কঠিন হতে পারে। পানির প্রাপ্যতা শুধু তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করে। তবে দীর্ঘ এবং তীব্র তাপপ্রবাহ মাটি শুকিয়ে ফেলে খরার সৃষ্টি করে। তারপর ওপরের বাতাস দ্রুত উষ্ণ হয় ও তীব্র তাপপ্রবাহের সৃষ্টি হয়। গরমে সাধারণ মানুষ এবং কৃষকের পানির চাহিদা বৃদ্ধি সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি করে। পূর্ব আফ্রিকার কিছু অংশে ২০২০-২৩ সাল পর্যন্ত পরপর ৫টি বর্ষার মৌসুম অতিবাহিত হয়েছে কোনোরকম বর্ষার চিহ্ন ছাড়াই। এতে ২ কোটিরও বেশি মানুষ তীব্র খাবার সংকটে ভুগছে।

অতিবৃষ্টি পৃথিবী যত উষ্ণ হবে, বায়ুমণ্ডল তত আর্দ্রতা ধরে রাখবে। এর ফলে খুব কম সময়ে ও ছোট এলাকায় তীব্র বৃষ্টিপাত হতে পারে।

পাকিস্তানে গত বছরের জুলাই এবং আগস্টে রেকর্ড বৃষ্টিপাতের ফলে তিন কোটিরও বেশি    মানুষ বন্যার কবলে পড়ে। জলবায়ু নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারণা অনুযায়ী, এতে জলবায়ু পরিবর্তন একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। বর্ষার মতো প্রাকৃতিক আবহাওয়ার ধরনও তীব্র বৃষ্টিপাতের কারণ হতে পারে। তীব্র বৃষ্টিপাত ও বন্যা পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে আঘাত হেনেছে। এদের মধ্যে ২০২২ সালের মে থেকে অক্টোবরে পশ্চিম আফ্রিকা ও ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউজিল্যান্ডের বন্যা উল্লেখযোগ্য। 

আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা বেশি। আমরা যে কোনো পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারি। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের বেশ কিছু পরিকল্পনা আছে। তবে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বাস্তবায়ন করা। উন্নত দেশগুলো আমাদের যে সাহায্য-সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছিল, তারা আসলে সেগুলো ঠিকভাবে করছে না। ফলে অর্থায়নের অভাবে আমাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছ। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য যেহেতু উন্নত দেশগুলো সবচেয়ে বেশি দায়ী, তাই তাদের সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষা করতে হবে। –আবু নাসের খান, চেয়ারম্যান, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) 

আরও পড়ুন

×