ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

বিপন্ন সময়

গল্প

বিপন্ন সময়

শাশ্বত নিপ্পন

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০

সাকেন দারোগার হুংকারে আনন্দবাস গ্রামের সীমান্ত ফাঁড়ির চারপাশে অন্ধকারে চাপা পড়া নৈঃশব্দ্য কেঁপে উঠল। পাশের শিমুল গাছ থেকে ডানা ঝাপটে উড়ে গেল নিশাচর পাখি। জালালুদ্দিন মাঝি হাউমাউ করে কেঁদে বলল, “ছার, আমি কিছু জানিনে ...।”

“ওরে আমাগের পিতলা ঘুঘু; তুমার ঘরের টিন উইড়ে মাতা ফাটছে অন্য লোকের। আর শালা তুমি জানবা না? দুডো সিলাই পড়েছে! অ্যাটেম্‌প্ট টু মার্ডার” মোটা বেতের লাঠি দিয়ে জালালুদ্দিনকে আবার পেটাতে শুরু করে দারোগা। জালালুদ্দিন প্রথম দুটোতে চিৎকার করে ওঠে; তারপর যেন সব অবশ হয়ে যায়। একটা ঘোরের মাঝে সে দেখতে থাকে দেড় কেজি ওজনের জ্যান্ত শোল মাছ নিকানো উঠানে মেলে বেড়ায় … না খাওয়া শরীর নিয়ে বৃদ্ধ মা অন্য বাড়িতে যায় উনুনের ছাই ধার করতে ... একটা ধরন্ত লাউয়ের মাচার নিচে বিড়ালটা তার বাচ্চা নিয়ে খেলতে থাকে। ভৈরব নদে কলকলিয়ে বান ডাকে ... জালালুদ্দিন মাঝি বৈঠা হাতে বুক উঁচিয়ে দাঁড়ায়। তবে জালালুদ্দিন এমন মাঝি নয়– শুধু মাঝি তকমাটি রয়ে গেছে নামের শেষে। মাঝি ছিল তার দাদা; পরান মাঝি। বড় নৌকা ছিল তার। ভৈরব নদও ছিল বিশাল! কূলকিনারাহীন। আষাঢ়ের শুরুতেই কলকল করে বান ডাকত। কালো পানি সারাটা বর্ষা শাসন করত দশগ্রাম। গ্রীষ্মকালে সেই নৌকায় পরান দাদা ছই জুড়ত। ভিন্ন গ্রাম থেকে যাত্রী আনত। কখনও ওড়াত পাল। দীর্ঘ দিন বৈঠা বয়ে শরীরে জলশ্যাওলার গন্ধ নিয়ে গ্রীষ্মের এক কাঠফাটা দুপুরে কাশতে কাশতে ঘরের পেছনের বাঁশঝাড়ে শুয়ে পরান মাঝি আর উঠে নাই। ঘরের কোণে দীর্ঘদিন তার বৈঠাটা পড়ে ছিল। সাকেন দারোগা হাঁপিয়ে ওঠে; লাঠিটা ছুড়ে ফেলে চেয়ারে বসে হাঁপাতে থাকে। “হালার পো, তোর ঘরে টিন আলগা– হেইডা কি আমি আটকাব?” তিন কাঠার ওপর জালালুদ্দিনের ছোট্ট কুঁড়েঘর। উঠানের কোণে একটা সজনে গাছ তার নিচে লাউয়ের মাচা। যে টিনগুলো এতদিন সূর্যের তেজ ও বর্ষার দাপট ঠেকিয়ে এসেছে– সেগুলো এখন বেশ জীর্ণ। এ বছর গ্রীষ্মের তেজ প্রথম থেকেই। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে এল বৈশাখের প্রথম দমকা। দুপুর থেকেই গুমোট থাকা আকাশ বিকেল হতে না হতেই কালো মেঘের চাদর গায়ে জড়িয়ে অচেনা। শোঁ শোঁ শব্দ করে কোত্থেকে উড়ে এল ঝড়। মরা ভৈরবের বুকের মরা সাঁকোকে উল্টে নিরীহ আনন্দবাস গ্রামের ওপর আছড়ে পড়ল ঝড় বর্গি-দস্যুর মতো। কড়াৎ কড়াৎ করে নীল আলো ছড়িয়ে বাজ পড়ল নদের বিরান পাড়ে । মড়মড় করে ভাঙল পাকুড় গাছের ডাল। ছিটকে পড়ল পাখির বাসা আর চোখ না ফোটা পাখির ছানা। জালালুদ্দিনের উঠানে সজনে গাছের ডাল ভেঙে ধরন্ত লাউয়ের মাচানের খুঁটি দিল ভেঙে। আর টিনগুলো জীর্ণ ঘরের মায়া ছেড়ে টিনের নিচের মানুষগুলোর কথা না ভেবে স্বার্থপরের মতো শূন্যে উড়ে গেল। “ওরে আল্লা রে!” উড়ন্ত টিনের পিছু নিল কলমী। জালালুদ্দিন টিনহীন ঘরের খুঁটি ধরে বসে থাকল। চিকন মেদহীন ছিপছিপে শরীর বৃষ্টির জলে ভিজে লোহা কালো রঙে রঙিন হয়ে আরও চকচকে হয়ে উঠতে থাকল কলমীর। টিন তখন পাকুড়ের ডালে। দু’চোখে ক্ষোভ-কষ্ট আর হতাশা নিয়ে সেই প’ড়ো প’ড়ো টিনের দিকে তাকিয়ে থাকে কলমী। আকাশের বুক চৌচির করে বিদ্যুৎ ঝলক খেলায়। ফালি পটোলের মতো এক চিলতে সংসারে উথালপাথাল অভাব। মাঝির নাও নেই, ভৈরব নদে জল নেই, গ্রামে কাজ নেই– তাই জালালুদ্দিনের ঘরে খাবারও নেই। আছে কলমী। গ্রামের বিল-খাল যেমন আলো করে থাকে কলমিলতা ও তার বেগুনি-ফুল, ঠিক তেমনি মাঝির কুঁড়ে আলো করে আছে কলমী। খুঁজে আনে কচুশাক, আলতা পেটি আলু, জলে ভাসা শাপলা– সন্ধ্যা নামলে উঠানের কোণে উনুন জ্বালে। ঝরা পাতার আঁচে কালো কড়াইয়ে চুড়চুড় শব্দ তুলে সেদ্ধ হতে থাকে হলুদ মেশানো শাকের পাতা। উনুনের আঁচে কলমীর মুখের পাশটা রাঙা হয়ে ওঠে– আর চারপাশে জমে থাকা নিরেট অন্ধকারকে আরও ভৌতিক করে তোলে। জালালুদ্দিন হাঁটু মুড়ে বিড়ি টানে আর পিটপিট করে দেখতে থাকে কলমীর কাপড় সরে যাওয়া বুকের সাদা অংশ। চোখাচোখি হলে কলমী লজ্জা পায়। জালালুদ্দিন একটা হাসি বিড়ির ধোঁয়ার সাথে গিলে নেয়। ক্ষুদ্র সংসারের আকাশ ছোঁয়া অভাবকেও মহাশূন্যে উড়িয়ে দেয় এক ফুৎকারে। কাজহীন জীবন, জীর্ণ কুঁড়ে আরও হাজারো না পাওয়ার ক্ষোভ নিমেষেই উধাও। রাত গভীর হলে ওদের নিঃশ্বাসও ঘন হয়– ঘর্মাক্ত হয়; তারপর একসময় নিদ্রাদেবী আঁচল ধরে অপেক্ষা করে আরও এক দুঃসহ দিন আর মধুময় রাতের জন্য। সকালে যখন সাকেন দারোগা তার পেট মোটা মোটরসাইকেলটা ভটভটিয়ে ধুলো উড়িয়ে যাচ্ছিল জয়পুরে একটা চুরির তদন্তে, তখন কলমী তার বেড়াহীন বাড়ির উঠানে লাউয়ের মাচার তলে। দারোগার শকুনদৃষ্টি তাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করছিল। না দাঁড়িয়ে পারে না লোকটা। তারপর একসময় মোটা গলায় ডাক দেয়, “অই ছেড়ি, জয়পুর যাওনের রাস্তা কি এইডা?” মেয়েরা পুরুষের চোখের না বলা ভাষা হয়তো পড়তে পারে। কলমী কোনো উত্তর না দিয়ে যথাসাধ্য শরীর ঢেকে সজনে গাছটার আড়ালে নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করেছিল। ঐদিন সাকেন দারোগা আর ওখানে দাঁড়ায়নি বেশি সময়। আবার এসেছিল; তারপর আবার। একসময় বলল, “তুই আমার কুয়াটারে আসেবেনে– কাজ দিবানে; আর ও মাঝি শালা কি তুমাক পালবির পারে? শাড়ি, টাহা-পয়সা, গন্ধ সাবান দিবানে ... এশার নামাজের পর আসপা।” বলে হাতটা ধরতেই কলমী চিৎকার করে ওঠে। সাকেন দারোগার বুকে শ্মশানের চিতা জ্বলে। এর পরই আসে ঝড়। জালালুদ্দিনের টিনের পাত পাকুড় গাছ থেকে পড়ে খসে। আর সাথে সাথেই তৈরি হয় মামলা; তুলে আনা হয় জালালুদ্দিন মাঝিকে। এবার কলমী আসতে কতক্ষণ? সিগারেট জ্বালিয়ে দুটো কড়া দম দেয় সাকেন দারোগা। এরই মধ্যে জালালুদ্দিনের ঠোঁট ফুলে গেছে; পায়ের গিঁটে ফুলে গেছে– যন্ত্রণায় বেহুঁশ পড়ে আছে সে ফাঁড়ির প্লাস্টার চটা মেঝেতে। বাইরের অন্ধকারে তখন আনন্দ। ফুলের সুগন্ধে বাতাস বইছে নির্মল। অন্ধকারে ভেসে বেড়াচ্ছে জোনাকির দল। ঘোরের মাঝে জালালুদ্দিন দেখে তার আধাবেলা খাওয়া বৃদ্ধ মা; সাদা কাপড়ে শরীর ঢাকা; সাদা কাপড়ে ধুলো কাদার ছোপ– সে বলে, “মা তুই কুত্থেকি আলি? এভাবে তো আসতি ন্যায়; এখানে আলি ক্যানে- ওমা?” “মন মানে না বাপজি! বড় মায়া লাগে! ও জ্বালাল তুই শোল মাছ খাসনি কেন বাপ ...” জালালুদ্দিনের মনে পড়ে যায়, ভৈরবের পাঁক থেকে পাওয়া শোল মাছটার কথা। কালো, পেটের দিকে সাদা– দুধ সাদা। চোখ দুটো কালচে নীল! মাছটা নিকানো উঠানে এঁকেবেঁকে খেলছিল, বাঁচার পথ খুঁজছিল। জালালুদ্দিনের মা, দেওমন বেওয়া অসুস্থ শরীরে অন্য বাড়ি যায়, ছাই ধার করতে, মাছ কাটবে। অনেক দিন পর একটা বড় মাছ কাটবে সে। আল্লায় দিছে এই অসময়ে– “মা তুই আবার আলি ক্যানে?” “প্যাটে ভাত নেই শরীরে বল পাইচু না।” ছেলের কথার আমল দেয় না দেওমন বেওয়া। কাঁপতে কাঁপতে শোলটার পাশে বসে সে। জালালের চোখে কৌতূহল। লাফিয়ে ওঠে নিরীহ শোল; শুকনো উঠানে আপাল দিয়ে ওঠে জলের রাজ্যের মতো। সজোরে বাড়ি মারে দেওমন বেওয়ার কান ও চোয়ালের মাঝে। দেওমন কাত হয়ে পড়ে স্থির হয়ে যায়। জালালুদ্দিন চিৎকার করে ওঠে, “ মা, ও মা!” জালালুদ্দিনের কানে ভেসে আসে ক্ষীণ মায়াময় এক কণ্ঠস্বর। মনে হয় বহু যুগের ওপার থেকে কেউ তাকে ডেকে চলেছে; তার শরীরে ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পড়ে। “ছার তুমাকে ধরিচে ক্যানে? তুমি কি খুন করেচ?” “কলমী, তুই!” জালালুদ্দিন বলে। “আলি কখন? ক্যানে আলি?” “তুমাকে নিতি আলাম। খুব মেরিচে?” “নাহ। লাউয়ের মাচাটা ভেঙে গিয়েছে বোল? চাল পড়ে মানুষের মাতা ফেটিচে?” কলমী জালালুদ্দিনের শরীরে হাত বোলায়। ঠান্ডা হাত। বলে, “তুমি মাচার চিন্তা বাদ দ্যাও তো ; ফর্সা হলি আমরা বাড়ি যাব।” “এখন রাত কত?” “অনেক। তুমি এখানে থাকো। আমি ছারের সাথে কতা বুলি ” –কলমী উঠে যায়। জালালুদ্দিন আবার ঘোরের মধ্যে দেখতে থাকে শোল মাছ; স্থির হয়ে যাওয়া অসুস্থ মা; দাদাজানের নৌকা; কলমীর টইটম্বুর শরীর। সে দেখে, শোল মাছের ভয়াল চোখের সাথে অদ্ভুত মিল সাকেন দারোগার কুতকুতে চোখ দুটোর। সাকেন দারোগা চেনা গন্ধটা পায়। পাতলা, লোহা কালো নিটোল শরীর থেকে আসছে অভাব মেশানো এই গন্ধ। গোল্ডলিফ সিগারেটে একটা কড়া টান দিয়ে সে বলে, “কিডা?”, “আমি ছার”, “অঃ তর হাতে চুড়ি নাই; চুড়ি পরস না ?” “ছার, আপনার দুটা পায়ে পড়ি; মাঝিকে ছেড়ি দ্যান; আমরা খুবই গরিব! ছার আমি সব বুঝি– আমাকে কি করতি হবে বলেন।” অন্ধকারে কলমীর কণ্ঠস্বরটি কেমন অন্যরকম লাগে। সাকেন দারোগার চোখে অন্ধকার সহ্য হয়ে গেছে এরই মধ্যে। কলমীও এখন দেখতে পাচ্ছে অন্ধকারের কালো মানুষটাকে। সাকেন দারোগা বলে, “মার্ডার কেস– অ্যাটেম্‌প্ট টু মার্ডার।” “ছার, আমরা গরিব ছার; অত্ত বুজিনি।” খ্যাঁকখ্যাঁক শব্দে কুৎসিত হেসে ওঠে দারোগা। “তর ভারি দেমাগ।” হাতের সিগারেটের শেষটা পায়ের চাপে পিষে ফেলে দারোগা। কলমী যন্ত্রের মতো বলে, “আমাকে আপনি কুতাই নেবেন? চলেন। আর মাঝিরে ছাড়েন।” সাকেন দারোগা বলে, “দূরে না, ঐ ঘরে চল।” সেন্ট্রিকে বলে, “ঐ খলিল, বেকুবডার একডা টিপসই নিয়া ছাড়ি দ্যাও।” রাতজাগা পাখি ডানা ঝাপটে চলে অবিরাম। লাউয়ের কচি ডগাগুলো অশুভ ঝড়ের প্রবল দাপটে নেতিয়ে যায়। অসহায় চাঁদের কোণ থেকে একটা তারা খসে পড়ে নিঃশব্দে। জালালুদ্দিন মাঝি কলমীর ঘাড়ে হাত রেখে দাঁড়ায়। তারপর বলে, “কলমী তোর গা থেকি বিড়ির গন্ধ বেরুচ্চি; বিড়ি খেতি মন চাইচি। ঝড়ের দাপটে নাউয়ের কোচি ডগা ফুলান, সব নেতিয়ি গিচে বোল” ফাঁড়ির শিশির ভেজা ঘাসে পা রেখে জালালুদ্দিন আবার বলে, “আমাকে ধরলু ক্যানে, পেটালু ক্যানে আবার ছেড়ি দিলুই বা ক্যানে? ক্যানে রে কলমী?” কলমী উত্তর করে না। “দারোগা ছারডা ভালো লোক, বল কলমী?” চারদিকে গুমোট কাটিয়ে তখনই বয়ে যায় ঝিরঝির বাতাস। সেই বাতাসে চারপাশে জমাট অন্ধকার ওদের সারা গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। জালালুদ্দিন ফ্যাসফেসে গলায় বলে, “শালার ঝড় থামলু তো রাত নামলু; সবকিছু ওলটপালট হয়ি গেল, বল কলমী?” কলমী বলে, “ঝড় থেমিছে মাঝি, রাতের আঁধারও থাকবি না ... কেটি যাবে।” জালালুদ্দিনের মাথাটা কলমী নিজের কাছে টেনে নেয়। জালালুদ্দিন কুকুরের মতো দাঁত খিঁচিয়ে হিসহিস করে বলে, “ছাড়, আর সোহাগ দ্যাখাতি হবে না, আমাকে ছুবিনি ...।” কলমীর গলায় দলা পাকাতে থাকে এক জনমের কান্না... 

আরও পড়ুন

×