ঢাকা বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

হাত ধোয়ার হাতেখড়ি

হাত ধোয়ার হাতেখড়ি

বরিশালের বরগুনার প্রত্যন্ত এলাকা বেতাগীর কাজীর হাটে হাত ধোয়া দিবস উপলক্ষে চলছে ক্যাম্পেইন

শৈলী ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৩ | ০৭:৫৮

বাংলা সাহিত্যের সুবিখ্যাত ছড়াকার সুকুমার রায় এ সময়ে যদি মানুষকে সচেতন করতে চাইতেন, হয়তো তিনি এমন করেই লিখতেন– ‘বাপুরাম সাপুড়ে, হাত কি ধুস বাপু রে?’ না লিখে উপায় আছে? দেশের পানিবাহিত ও ডায়রিয়াজনিত কারণে কত সংখ্যক মানুষ যে প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছেন এবং একমাত্র সঠিকভাবে হাত ধোয়ার নিয়মিত অভ্যাসেই যে বিপুল হারে এই জাতীয় রোগের ঝুঁকি ও প্রাদুর্ভাব দূর করা যায়, সে কথা ভেবে হলেও সুকুমার রায় এমন করেই লিখতেন হয়তো। আজ তিনি নেই। নেই তাঁর মতো কালজয়ী কবি, সাহিত্যিক, বচন বা দর্শন ছড়িয়ে দেওয়া অনেকেই। কিন্তু রয়ে গেছে তাদের সৃষ্টি, স্মৃতি আর আমাদের মূল্যবান এমন সব রত্ন।

২০২০ সাল। করোনার থাবায় গোটা বিশ্ব তখন স্তব্ধ। অজানা ভয় আর আতঙ্ক ঘিরে ছিল দেশজুড়ে। অদৃশ্য জীবাণু থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছিলেন বারবার হাত ধুতে। মৃত্যুভয়ে ভীত মানুষও বারবার সাবান আর হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুতো। অফিস-মার্কেট তো বটেই, অনেক মহল্লায়ও বেসিন বসিয়ে রাখা হতো হাত ধোয়ার ব্যবস্থা হিসেবে। ছোট শিশুরাও জানত করোনা থেকে বাঁচতে হাত পরিষ্কার রাখা কতটা জরুরি। হাত ধোয়া রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল সবার। করোনার সেই আতঙ্ক কেটে গেছে বেশ আগেই। মানুষের মধ্যেও কমে গেছে করোনা নিয়ে মৃত্যু আতঙ্ক। সেই সঙ্গে কমে গেছে ঘন ঘন হাত ধোয়ার সেই অভ্যাস। অথচ হাত ধোয়ার অভ্যাস বা হাত পরিষ্কার রাখলে যে শুধু করোনা নয়, অন্যান্য পানিবাহিত রোগ যেমন– ডায়রিয়া, আমাশয়, কৃমি, ভাইরাসবাহিত বিভিন্ন রোগ থেকেও মুক্তি মিলবে, সে বিষয়ে অনেকেই সচেতন নন। শুধু এ কারণেই সারাবিশ্বে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এ ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ গত বছর যৌথ এক প্রতিবেদনে বলেছে, হাত ধোয়ায় লাভ তিনটি। এটি জীবন বাঁচায়, অর্থের অপচয় কমায় ও ভবিষ্যতের সংক্রামক রোগ থেকে মানুষকে সুরক্ষা দেয়। রোগ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ, সস্তা ও সুলভ পদ্ধতি হচ্ছে হাত ধোয়া। এরপরও শুধু সচেতনতা, চর্চার অভাবে মানুষের মধ্যে অভ্যাসটি তৈরি হচ্ছে না। বিশেষ করে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হাত ধোয়ার বিষয়ে সচেতনতার অভাব বেশি দেখা যাচ্ছে।

সবার মধ্যে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে ও জীবাণুমুক্ত থাকার মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে প্রতিবছরের ১৫ অক্টোবর জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস’। জাতিসংঘের আহ্বানে ২০০৮ সাল থেকে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য ছিল ‘আপনার নাগালেই পরিচ্ছন্ন হাত’। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি আয়োজনে এ বছর সারাদেশে ‘বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস-২০২৩’ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়েছে।

বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস উপলক্ষে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজী এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেডের ব্র্যান্ড ‘সেফ হ্যান্ডস লিকুইড হ্যান্ড ওয়াশ’-এর সহায়তায় বরিশালের বরগুনার প্রত্যন্ত এলাকা বেতাগীর কাজীরহাটে ‘হাত ধোয়ার হাতেখড়ি’ শীর্ষক এক ক্যাম্পেইন চালানো হয়। জানা যায়, এত সুন্দর গ্রাম, এত অদ্ভুত প্রকৃতিতে মানুষ যখন নিজের হাতেই সুরক্ষার বিভিন্ন বলয়ে নিজেকে ও আপনজনকে বন্ধনে রাখতে পারে, তখন কেবল সচেতনতার অভাবে সুরক্ষার হাত হয়ে ওঠে নোংরা হাত। দেশের অন্যতম সুন্দর স্থান বরিশালের সৌন্দর্য আর মানুষের সরলতা এখানের ডায়রিয়া আর পানিবাহিত রোগের কাছে পরাজিত। সে কারণে আমাদের প্রচেষ্টা যেন জয়যাত্রা হিসেবে নতুন এক ইতিহাস রচনা করতে পারে, এ কারণে এ গ্রাম থেকেই ক্যাম্পেইন শুরু করছি আমরা।

মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে যাওয়া হাত ধোয়ার সঠিক অভ্যাস যেন থাকে হাতে হাতে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যারা থাকবে দুধেভাতে, নিজেদের সুরক্ষার দায়িত্ব যেন থাকে ওদেরই হাতে। যে ব্র্যান্ড তার বিজ্ঞাপনের হাজারটা কৌশল বাদ দিয়ে ভিন্ন এমন অনন্য উপায়ে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যাচ্ছে, সেই ব্র্যান্ড সেফ হ্যান্ডস লিকুইড হ্যান্ড ওয়াশ ব্র্যান্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেন, ‘মানুষের কাছে আমরা হয়তো বাজারের সেরা হ্যান্ডওয়াশ বলে আমাদের পণ্য বিক্রি করতে চেষ্টা করতাম, কিন্তু এসবের মধ্যেই কি একটি হ্যান্ডওয়াশ ব্র্যান্ডের দায়বদ্ধতা শেষ? সঠিকভাবে হাত ধোয়ার নিয়মিত অভ্যাস যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশসহ বিশ্বে মানুষ করোনাকালে ঢের টের পেয়েছে। সময়ের সঙ্গে এ দেশের মানুষের হাত ধোয়ার সেই সু-অভ্যাস এক রকম হারাতে বসেছে। যে দেশে অধিকাংশ মানুষ আজও শুধু হাত ধোয়ার অভাবে নানা রোগ-শোক থেকে মুক্তি পায় না, সে দেশে মানুষকে একসঙ্গে সচেতন করার আগ্রহটাই বা ছাড়ব কেন? এ জন্যই এ বছরের বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসকে বেছে নিই আমরা। পুঁজি করি বাংলা সাহিত্যে আর আমাদের মনে গেঁথে থাকা সেইসব উক্তি-বাণী-বচন-প্রবচন। সব বয়সের সবাই যেন একবারে মনে রাখে, খুব সহজে জরুরি কথাগুলো সব সময় মেনে চলতে পারে– সেই প্রচেষ্টা থেকেই এ পথে আমাদের এ উদ্যোগের বাস্তবায়ন। একই সঙ্গে আরেকটি কথা বলতে চাই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অ্যাক্টিভেশন আমরা রাজধানীকেন্দ্রিক বা শহর-নগর থেকে পরবর্তী সময়ে গ্রাম পর্যায়ে বিস্তৃতি নেয়। আমরা এ জায়গায়ও কিছুটা ভিন্ন হয়ে আসতে চেয়েছি। এ জন্যই এ গ্রাম বেছে নেওয়া। আমাদের এ উদ্যোগ যদি সঠিক ও সফলভাবে এগিয়ে নিতে পারি, তবে সারাদেশে ছড়িয়ে সেফ হ্যান্ডস থাকবে মানুষের সুরক্ষায় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে।’

উদ্যোগ ও বাস্তবায়নের প্রত্যেক মানুষ যে এ ক্যাম্পেইনকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিতে কতটা তৎপর, তা কাজীরহাটে ঘুরলেই বুঝতে পারা যায়। এরই মধ্যে গ্রামের বাচ্চাকাচ্চা থেকে আবালবৃদ্ধ সবাই এক উৎসবমুখর পরিবেশে গ্রহণ করেছে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কথাগুলো। আর লাইনগুলো বিকৃত বা নষ্ট নয়, চিরায়ত বাংলার অসম্ভব প্রিয় লাইনগুলো শুধু এক নতুন রূপে, নতুন প্রত্যয়ে যেন ছড়িয়ে যায় সব মানুষের মধ্যে, গ্রামের মানুষের কাছেও সে উদ্দেশ্য হয়েছে স্পষ্ট। সুদিনের বার্তা আসুক, তবে আসুক সেফ হ্যান্ডস লিকুইড হ্যান্ড ওয়াশের এই উদ্যোগের সঙ্গে। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে যাওয়া হাত ধোয়ার সঠিক অভ্যাস যেন থাকে হাতে হাতে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যারা থাকবে দুধেভাতে, নিজেদের সুরক্ষার দায়িত্ব যেন থাকে ওদেরই হাতে।

আরও পড়ুন

×