ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

কেন তরুণরা ছুটছে দেশের বাইরে

কেন তরুণরা ছুটছে দেশের বাইরে

-মডেল : মৌরীন, তাশু ও মিশুক।। ছবি : সাহস

আশিক মুস্তাফা

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৩ | ০৪:৪৯

সম্প্রতি রাজধানীর একটি বেসরকারি ব্যাংকে গিয়ে দেখা যায় শিক্ষার্থীর দীর্ঘ লাইন। তাদের একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানা যায়, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি দিতে যাচ্ছেন এই তরুণ। এরই প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ব্যাংকে টাকা জমা দিতে এসেছেন। লাইনে দাঁড়ানো অন্য তরুণরা আলোচনা করছেন বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে কার কী পরিকল্পনা। কে আইইএলটিএসে কত স্কোর তুলেছেন, কার ক্লাস কবে শুরু– এসব। অমিয় নামে এক তরুণকে জিজ্ঞাসা করা হলো, পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে আসবেন কিনা? তাঁর উত্তর, ‘আগে তো একবার যাই, পরে দেখা যাবে।’ দেশের বাইরে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন এক সময় উচ্চবিত্তের দখলে থাকলেও বর্তমানে তা মহামারির মতো উচ্চ মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের হাত ধরে সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক মা-বাবাই নিজের সর্বস্ব দিয়ে সন্তানকে দেশের বাইরে স্থায়ী করতে উঠেপড়ে লেগেছেন।

কেন এভাবে দেশ ছাড়ছেন তারা?

তরুণরা এখন একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশ ছাড়ছেন। ডলার সংকট, ব্যাংকিং ব্যবস্থার ছন্দপতন– কিছুতেই ভাবার সময় নেই যেন তাদের! কেউ মেধাবৃত্তি নিয়ে, কেউবা যোগ্যতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতায় ভর করে বিশ্বের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিচ্ছেন। আবার অনেক তরুণ মা-বাবার শেষ সম্বল কিংবা ভিটেমাটি বিক্রি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় কিংবা সাঁতরে পাড়ি দিচ্ছেন ভূমধ্যসাগর। ব্রাজিলের আমাজন কিংবা বিস্তীর্ণ মরুভূমি পাড়ি দিয়েও অনেকে বিদেশে যাচ্ছেন কেবল রুটিরুজির নিশ্চয়তার স্বপ্নে। কিন্তু কেন এভাবে দেশ ছাড়ছেন তারা?

৮২ শতাংশ তরুণ ছাড়তে চান দেশ

২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম বা ডব্লিউইএফ তরুণদের নিয়ে এক জরিপ প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, ভালো জীবনযাপন ও পেশার উন্নতির জন্য বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৮২ শতাংশ তরুণ নিজের দেশ ছেড়ে চলে যেতে চান। এ ক্ষেত্রে তাদের পছন্দের দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়া। জরিপের ফলাফলে চোখ রাখলেই আঁচ করতে পারবেন, তরুণরা তেমন একটা ভালো নেই দেশে। তারা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। এসব তরুণের বেশির ভাগই দেশের বাইরে ভবিষ্যৎ গড়ার ইঙ্গিত দেন। ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থীই ‘এ’ লেভেল শেষে, আর বাংলা মাধ্যমে পড়ুয়ারা অনার্স শেষে বাইরে যেতে চান।

কোটায় মুখ ফিরিয়েছে বিসিএস থেকেও!

এই সেদিনও চাকরির ক্ষেত্রে তরুণ-তরুণীদের প্রথম পছন্দ ছিল বিসিএস। প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার জন্য একবুক স্বপ্ন নিয়ে অসংখ্য ছেলেমেয়ে বসতেন বিসিএস পরীক্ষায়। কিন্তু এখন অনেকে ক্যারিয়ার গড়তে বিসিএসের কথা ভাবেনই না! আবার যারা বিসিএস পরীক্ষা দিচ্ছেন, তাদেরও মেলাতে হচ্ছে কোটার জটিল সমীকরণ। যে দেশের সর্ববৃহৎ চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী কোটার ভিত্তিতে চাকরিতে নিয়োগ পান, সেখানে ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ না হয়ে উপায় কী মেধাবী তরুণদের! কেবল তা-ই নয়; বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের জরিপে ৪৭ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগের অসমতা তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। দেশের রাজনীতি নিয়ে তাদের মধ্যে নেই তেমন কোনো আগ্রহ বা সামনে নেই কোনো রোল মডেল। তরুণদের অর্ধেকের বেশি মনে করেন, তাদের স্বপ্ন আর প্রত্যাশা নিয়ে ভাবেন না দেশের নীতিনির্ধারকরা।

বিশেষজ্ঞ মত

কথাশিল্পী সেলিনা হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কেন দেশ ছাড়ছেন তরুণরা? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘তরুণদের আমরা দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছি। আবার যতটুকু দক্ষতা আছে, সে অনুযায়ী তাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারছি না। লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত বেকার যুবক কাজের আশায় পথে পথে ঘুরছে।

সেলিনা হোসেন । ছবি - উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া। 


এ ছাড়া চোখের সামনে লুটপাট, দুর্নীতি, সুবিধাবাদী আদর্শের অনুসারী রাজনীতির চর্চা, সামাজিক অবক্ষয়, ট্রাফিকে আটকা স্থবির নগরজীবনসহ নানা অরাজকতা তরুণ মনকে বিষিয়ে দিচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম বৈধ-অবৈধ উপায়ে দেশ ত্যাগ করছে কি কেবলই উন্নত জীবনের মোহে, নাকি দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করছে এমন সিদ্ধান্ত নিতে! ভয়াবহ সব অভিজ্ঞতা জানার পরও কেন তরুণরা এভাবে জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে বিদেশের পথে পা বাড়াচ্ছে? এই হিসাবগুলো মেলানো আজ খুব জরুরি।’

একই প্রশ্ন করা হয়েছে কথাশিল্পী ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে। তিনি বলেন, ‘তরুণদের দেশ ছাড়ার পেছনে অসংখ্য কারণ থাকতে পারে। তবে আমি মোটা দাগে তিনটি কারণ বলতে চাই। সেগুলো হচ্ছে– অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক। এ ছাড়া দেশে দিন দিন বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। শিক্ষিত বেকারের এই চাপ কিন্তু অনেক বড় একটা বিষয়। গ্রামে দেখা যায় সমবয়সীদের একটা চাপ থাকে। এই যেমন পাশের বাড়ির সমবয়সী একজন গিয়েছে, আমাকেও যেতে হবে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। ছবি উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া। 


আবার অনেকের মধ্যে বিদেশের প্রতি এক ধরনের মোহ কাজ করে। সেই মোহ থেকে যায়। আদতে বিদেশ গিয়ে সবাই ভালো থাকতে পারে না। বিদেশের মাটিতে এমন আক্ষেপের কথা অনেকেই বলেছেন আমাকে। তবে আমি তরুণদের বলব, দেশটাকে ভালোবাসতে হবে। বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত আমরা, তা ঠিক আছে, তাই বলে এসব ছেড়ে চলে গেলে কে করবে এসবের সমাধান? তরুণদেরই করতে হবে। এ জন্য দেশকে ভালোবেসে দেশেই থাকতে হবে।’

সময় এসেছে ভাবনার

বিভিন্ন সময় সাহস-এর প্রচ্ছদে উঠে এসেছে দেশের বাইরে থাকা অসংখ্য তরুণের সাফল্যের গল্প। কিন্তু এসব তরুণের মধ্যে যারা ফিরে আসছেন না, সেখানে চাকরি, ব্যবসা বা গবেষণা করছেন, তাদের দেশের কাজে কীভাবে ব্যবহার করা যায়– এ বিষয়ে ভাবনার সময় এসেছে। সময় এসেছে তাদের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ারও। প্রতিটি উন্নত দেশই কোনো এক প্রজন্মের মেধা, ত্যাগ, কঠোর পরিশ্রম ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশকে উন্নত কাতারে নিয়েছে। তরুণদের মেধা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে না পারলে দেশের উন্নয়ন টেকসই হবে না, প্রযুক্তিতে পরনির্ভরশীলতা ঘুচবে না, ভালো নেতৃত্ব আসবে না। তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগানোর উৎকৃষ্ট সময় পার করছে দেশ। অনেক দেশই যোগ্য লোকের অভাবে অর্থনীতির ভিত ধরে রাখতে পারছে না। এই সময়ে আমরা কি আমাদের এসব মেধাবীকে হেলায় হারাব? দেশের কাজে লাগাব না? তবে তাই বলে যে সবসময় দেশে এসেই কাজ করতে হবে এমনও নয়, বিদেশে বসেও দেশের জন্য কাজ করা যায়। 


তরুণদের আমরা দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছি। আবার যতটুকু দক্ষতা আছে, সে অনুযায়ী তাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারছি না...

সেলিনা হোসেন, কথাশিল্পী


দেশে দিন দিন বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। শিক্ষিত বেকারের এই চাপ কিন্তু অনেক বড় একটা বিষয়। গ্রামে দেখা যায় সমবয়সীদের একটা চাপ থাকে...

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কথাশিল্পী, শিক্ষাবিদ

আরও পড়ুন

×