ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

দিন কেটেছে অনেক, বদলায়নি

দিন কেটেছে অনেক, বদলায়নি

অলংকরণ :: তন্ময় শেখ

--

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০

বাংলাদেশের সংবিধানে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। অথচ এখনও যথাযথ সুযোগ-সুবিধার অভাবে বাংলাদেশের দলিত, হরিজন জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। স্কুলেও দলিত সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা নিগ্রহের শিকার হয়। লিখেছেন বাসন্তি সাহা

কেবল জাতপাতের কারণে সমাজে এখনও কিছু মানুষ অস্পৃশ্য রয়ে গেছে! অদৃশ্য রয়ে গেছে। হয় আমরা চোখ বুজে আছি, না হয় আমরা দেখেও না দেখার ভান করছি। এখনও একটি শিশুকে কেবল দলিত সম্প্রদায়ের বলে স্কুলে আলাদা করে রাখা হয়। যাদের পড়ালেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে, অচলায়তন ভেঙে উচ্চশিক্ষিত হয়েছে, তাদেরও কাজের সুযোগ কম। ফলে উচ্চশিক্ষিতরাও পরিচ্ছন্নতা কর্মী পদে আবেদন করছেন। আবার সেখানে তাদের যে সংরক্ষিত কোটা সেটিও পুরোপুরি তাদের দেওয়া হয় না। সুযোগের অভাবে লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে এ সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা। এমনটাই জানান, ঝালকাঠির দলিত কলোনির বাসিন্দা প্রদীপ ভক্ত। তিনি নিজে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন। সরকারি চাকরি করছেন। তাঁর প্রচেষ্টায় দলিত কলোনিতে বেশ পরিবর্তনও এসেছে; কিন্তু এতদিনেও কলোনির বাইরে তাদের অস্পৃশ্যতা কাটেনি। দিন বদলায়নি। দলিত কারা? সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপমতে, বাংলাদেশে প্রায় ৪৩.৫৮ লাখ দলিত জনগোষ্ঠী, ১২.৮৫ লাখ হরিজন জনগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে– বাঁশফোর, ডোমার, রাউত, তেলেগু, হেলা, হাড়ি, লালবেগী, বাল্মিগী, ডোম ইত্যাদি হরিজন সম্প্রদায়। বাংলাদেশে দুই ধরনের দলিত জনগোষ্ঠী রয়েছে– বাঙালি দলিত ও অবাঙালি দলিত।

বাঙালি দলিত বলতে সমাজে যারা অস্পৃশ্য তাদের বোঝায়। যেমন– চর্মকার, মালাকার, কামার, কুমার, জেলে, পাটনী, কায়পুত্র, কৈবর্ত, কলু, কোল, কাহার, ক্ষৌরকার, নিকারী, পাত্র, বাউলিয়া, ভগবানীয়া, মানতা, মালো, মৌয়াল, মাহাতো, রজদাস, রাজবংশী, রানা কর্মকার, রায়, শব্দকর, শবর, সন্ন্যাসী, কর্তাভজা, হাজরা প্রভৃতি সম্প্রদায় সমাজে অস্পৃশ্যতার শিকার। অবাঙালি দলিত বলতে আমরা বুঝি ব্রিটিশ শাসনামলের বিভিন্ন সময়ে পূর্ববঙ্গে পরিচ্ছন্নতা কর্মী, চা-বাগানের শ্রমিক (১৮৫৩-৫৪), জঙ্গল কাটা, পয়ঃনিষ্কাশন প্রভৃতি কাজের জন্য ভারতের উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, বিহার, উড়িষ্যা, কুচবিহার, রাঁচি, মাদ্রাজ ও আসাম থেকে লোকজনকে নিয়ে আসা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছে– হেলা, মুচি, ডোম, বাল্মিকী, রবিদাস, ডোমার, ডালু, মালা, মাদিগা, চাকালি, সাচ্চারি, কাপুলু, নায়েক, নুনিয়া, পরাধন, পাহান, বাউরি, বীন, বোনাজ, বাঁশফোর, ভূঁইয়া, ভূমিজ, লালবেগী জনগোষ্ঠী। তারা তেলেগু, ভোজপুরি, জোবালপুরি, হিন্দি, সাচ্চারী ও দেশওয়ালী ভাষায় কথা বলেন। এ সম্প্রদায়গুলোই মূলত অবাঙালি দলিত শ্রেণি। কৈলাশ রবিদাস রিপন বলেন, সরকার নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে ‘কাউকে বাদ নিয়ে নয়’ নীতি অনুসরণ করছে; কিন্তু আমরা বাদই থেকে যাই। আমাদের আইনি ও কাঠামোগত সুরক্ষা দরকার। বাংলাদেশের সংবিধানের ধারা-২৮ (১)-এ বলা হয়েছে, ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্যপূর্ণ হবে না। বাস্তবে এর প্রয়োগ খুব কমই রয়েছে। তাই বৈষম্যবিরোধী আইন দরকার। যে আইনটি খসরা আকারে আছে, তাতে বৈষম্য খুব বেশি কমবে না। কয়েকটি জায়গায় সংশোধন আনতে হবে। যেমন ১৯৩৫ সালে মহাত্মা গান্ধী ও বাবাসাহেব আম্বেদকরের মধ্যে যে পুনা চুক্তি হয়েছিল, সে চুক্তির ভিত্তিতে শিডিউল কাস্টের জন্য কোটা সংরক্ষণ করা হয়েছিল। পৃথক নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচনে সংরক্ষিত আসন ছিল। এমনকি পাকিস্তান আমলেও এই শিডিউল কাস্টের জন্য সংরক্ষিত আসন ছিল; কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতীয় সংবিধানে সবাইকে সমান অধিকার দিয়ে সমমর্যাদার নাগরিক ঘোষণা করা হয়। এর ফলে বঞ্চনা বেড়ে যায়। সংরক্ষণ না থাকার ফলে যেটুকু অধিকার পাওয়া যেত, তাও উঠে যায়। দলিত সম্প্রদায় অদৃশ্য হয়ে যায় বলতে গেলে। তাই দলিত সম্প্রদায়ের এখন আইনি ও কাঠামোগত দুটোরই সুরক্ষা দরকার।

প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালে ড. কামাল হোসেনের উপস্থিতিতে সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় একটি গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে দলিত সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি ছিল। এখান থেকে বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন, শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে পৃথক বরাদ্দসহ ১৫ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল। পরে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনসহ অন্যদের সহযোগিতায় আইনের একটি খসড়া প্রণয়ন করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়। আইনটি এখনও হয়নি। বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলন (বিডিইআরএম) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক শিপন রবিদাস বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ সরকার দলিতদের অধিকারের সুরক্ষার কথা উল্লেখ করেছিল। তার কিছু কিছু বাস্তবায়ন হচ্ছে। যেমন সিটি করপোরেশন দলিত কলোনিগুলোয় পানি ও আবাসনের ব্যবস্থা করেছে। দলিত কলোনিগুলোয় আবাসন বরাদ্দ দেওয়ার ব্যাপারে বলা হয়েছে, সিটি করপোরেশনের স্থায়ী কর্মীরা এই আবাসন বরাদ্দ পাবেন কিন্তু বঞ্চনাটা হচ্ছে প্রায় সব দলিত পরিচ্ছন্নতাকর্মী সিটি করপোরেশনে অস্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত। আবার যারা সিটি করপোরেশনে কাজ করেন না, তারা কোথায় থাকবেন। দলিতরা মূল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোথাও রেলওয়ে বা সিটি করপোরেশনের জমিতে, সরকারি অফিস লাগোয়া জায়গায়, কোথাও জঙ্গলের একাংশে তারা থাকে। তাদের ৫৫ শতাংশ জানিয়েছেন উচ্ছেদ-আতঙ্কের কথা। অভিযোগ রয়েছে, খসড়া বৈষম্যবিরোধী আইনে কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে তার প্রতিকার পাওয়ার যে প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে সেটি সময়সাপেক্ষ, তাতে নির্যাতিত পরিবারগুলো নিরুৎসাহিত হতে পারে।

দলিত নারী

দলিত সমাজের একজন মেয়েশিশুকে দু’ভাবে যুদ্ধ করতে হয়। পরিবার থেকে পড়ালেখার সুযোগ পাওয়া যেমন সহজ নয়; তেমনি মূলস্রোতের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়াও কঠিন। ঢাকার একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন পূজা। তিনি বলেন, ‘মেয়েরা কলেজে উঠলেই প্রতিবেশীরা মা-বাবাকে বলতে থাকেন, মেয়েদের এত পড়ালে বিয়ের পাত্র পাওয়া যাবে না। আমাদের তো সেই একই পেশায় থাকতে হবে। তাহলে এত পড়ে কী হবে! নতুন প্রজন্মের মধ্যে জড়তা কাটলেও পরিবারগুলোয় এখনও কাটেনি। আমি আমার বন্ধুর বাড়িতে যেতাম, যখন তার বাবা বাসায় না থাকেন। কারণ তার বাবা আমার সঙ্গে মেয়ের বন্ধুত্ব পছন্দ করেন না। এটা আমরা লুকাতেও পারি না। কারণ আমাদের সঙ্গে কথা বললেও বুঝে যায়। আমাদের বাংলা বলা অন্যরকম। সমাজের মূলস্রোতের মানুষের মতো নয়। আমাদের কলোনিগুলোয় এখনও সবাই হিন্দি ও তেলেগু ভাষায় কথা বলে।’ নারায়ণগঞ্জের টানবাজারের দলিত সম্প্রদায়ের সুইপার কলোনিতে জন্মেছিলেন সোনু রানী দাস। এই পল্লির প্রথম নারী হিসেবে তিনি স্নাতকোত্তর করেন। বড় ভাই ও স্বামীর সহযোগিতায় লেখাপড়া চালিয়েছেন। শিক্ষিত হয়ে নিজ গোষ্ঠীর মানুষের অধিকারের জন্য কাজ করছেন তিনি। সোনু বলেন, ‘কতটা স্বাধীনভাবে নিজের এলাকার মেয়েদের উন্নয়নের কাজ করতে পারছি, সেটা নিয়ে হিসাব কষতে বসাও খুব সুখকর নয়। তবুও আশার কোনো সীমানা হয় না। আশা করছি, একদিন সমাজে সমতা ও সভ্যতার সুদিন আসবে।’ দলিত নারী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মনি রানী দাস বলেন, ‘সংবিধানে সব মানুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে; বাস্তবে এর চর্চা সীমিত। বৈষম্য বিলোপ করতে হলে কিছু পরিপূরক আইনের দরকার। তাই বৈষম্য বিলোপ আইনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি ভালো আইন সমাজ থেকে কেবল অপরাধ দূর করে তা নয়, সমাজে একটি মূল্যবোধও প্রতিষ্ঠা করে। আইনের প্রয়োগ নিয়ে অনেকেই সংশয়ের কথা বলছেন। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যরা পরিচয় জেনে গেলে সে অপমানের শিকার হতে পারে অথবা তার উদ্দেশ্য অর্জন নাও হতে পারে। একজন মানুষ সারাক্ষণ নিজেকে লুকিয়ে রাখে। এ অবস্থায় তার সামাজিক অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? সমাজের মূলস্রোতের মানুষের পাশাপাশি প্রতিটি দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ যেন মাথা উঁচু করে তার আত্মপরিচয় দিতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই বৈষম্যহীন সমাজের পথে আমরা এগোতে সক্ষম হবো।’  লেখক: সমন্বয়কারী (রিসার্চ ও ডকুমেন্টেশন), দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থা

আরও পড়ুন

×