ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

আইনি পরামর্শ

বান্ধবীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে তালাকনামা পাঠায় স্বামী

বান্ধবীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে তালাকনামা পাঠায় স্বামী

সাদিয়া আরমান

ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০০:২৮ | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০১:৩২

প্রায় ৩ বছর আগে পারিবারিকভাবে আমার বিয়ে হয়। তখন আমি এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি মাত্র। স্বামী ঢাকায় একটি বেসরকারি চাকরি করেন। সেই সূত্রে আমরা নেত্রকোনা থেকে ঢাকায় চলে আসি। ঢাকায় আসার পর আমিও একটা অফিসে চাকরি নিই। এখানে সমবয়সী এক নারী সহকর্মীর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ওই মেয়ে প্রায়ই আমাদের বাসায় আসত। বিয়ের এক বছরের মধ্যে আমি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ি। তখন ওই বান্ধবীর অনেক সহযোগিতা পেয়েছি। সন্তান জন্মের পরও তাঁর সহযোগিতায় ঘাটতি ছিল না। কয়েক মাস আগে অন্য এক সহকর্মীর মাধ্যমে জানতে পারি, আমার ওই বান্ধবীর সঙ্গে আমার স্বামীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক চলছে। প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। আমার স্বামীকে এ বিষয়ে চাপ দিলে তিনি আমার কাছে ক্ষমা চান। কয়েকদিন আমাদের সবকিছু ঠিকই চলছিল। স্বামী হঠাৎ একদিন তাঁর ব্যবহারের জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে যান। আমার জন্য একটা চিঠি দিয়ে যান। আমি যেন তাঁকে ভুলে যাই। আমি বিভিন্ন জায়গায় তাঁর খোঁজ করি। দু’দিন পর ডাকযোগে আমার স্বামী তালাকনামা পাঠান। তিনি তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে মেসে উঠেছেন বলে জানতে পারি। আমি কি তাঁর (আমার স্বামী) বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি?

সাদিয়া আক্তার, ঢাকা
প্রিয় সাদিয়া
আপনার স্বামী আবেগী মেজাজে ঘর থেকে বের হয়ে মেসে থাকছেন। আইনগতভাবে, একজন লোক বিয়ে করার পর তাঁর ওপর স্ত্রীকে দেখাশোনা, সুরক্ষা এবং সাংসারিক খরচাদি বহন করার কিছু দায়িত্ব বর্তায়। বিয়ে বিচ্ছেদ হওয়ার আগেই একজন লোক এসব দায়িত্ব অস্বীকার করে হঠাৎ করে তাঁর সংসার ফেলে যেতে পারেন না। এমনটি করলে তিনি আইনের কাছে অপরাধ করবেন। শরিয়া এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, বিয়ে করার পর, শরিয়া অনুযায়ী বিয়ের চুক্তিকে সম্মান দেখাতে হবে। অতএব বিয়ে অবশিষ্ট থাকাকালীন স্ত্রী ও শিশু সন্তানের দায়িত্ব ফেলে দিলে চুক্তি ভঙ্গ এবং আইনের কাছে অপরাধ হবে। অদূর ভবিষ্যতে বিয়ে বিচ্ছেদ করতে চান– এই অজুহাত দেখিয়েও তিনি এমন কাজ করতে পারেন না। 

বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ালে শরিয়তে শাস্তির যে বিধান আছে, তা আমাদের দণ্ডবিধি বা অন্য রাষ্ট্রীয় আইনে পরিস্থাপিত হয়ে আসেনি; অন্যদিকে ব্যভিচারের যে সংজ্ঞা ব্রিটিশ আমলে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারায় রয়েছে, তা অনুযায়ী যে নারীর সঙ্গে বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কে যৌনকর্ম  করা হয়, সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে হলে দেখাতে হবে যে, সেই নারী আরেকজনের স্ত্রী ছিলেন। অবিবাহিত হলে আমাদের আইনে ব্যভিচার হবে না।  মধ্য উনিশ শতকে ব্রিটিশ সমাজের যৌন নৈতিকতা এবং খ্রিষ্টান ধর্মের বিধান অনুযায়ী এই আইন এসেছে। কাজেই আইনে একটা ফাঁক তো আছেই। বাস্তবে আইনের নানান ফাঁক-ফোকরের কারণে আর অন্যদিকে জবাবদিহির অভাবে অনেক আইনজীবী ইচ্ছাকৃতভাবে একে ভুল আইনি ধারায় সম্পৃক্ত করে ফেলেন; এভাবেই মিথ্যা মামলাগুলো হয়, যা একটি সুস্থ আইনি ব্যবস্থায় কাম্য নয়।
আপনার স্বামী আপনার বান্ধবীর প্রেমে আপ্লুত হয়ে এ কাজ করেছেন। প্রথমে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন– যে লোক আপনার সঙ্গে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, আপনি তাঁর সঙ্গে আবারও সম্পর্কে জড়াতে চান কিনা। যদি মনে হয় আপনি তাঁকে ক্ষমাও করবেন না আর বিশ্বাসও করতে পারবেন না, তাহলে এ পর্যায়ে তাঁর সঙ্গে পাতা সংসারের ইতি টেনে ফেলুন।

অন্যদিকে স্বামীর সঙ্গে সংসার করতে চাইলে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ধারা ৭(৪) অনুযায়ী আপনি স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনারকে একটি সালিশি পরিষদ গঠন করতে অনুরোধ করতে পারেন। আপনার স্বামী ওই সালিশি নোটিশে সাড়া দিলে এবং শুনানিতে উপস্থিত হলে আপনি আপনার শিশুসহ উপস্থিত হয়ে তাঁর মধ্যে একটা দরদ ও ভালোবাসা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করুন। তবে আপনাকে তালাক দিলেও আপনার শিশুর ভরণপোষণ ইত্যাদি ব্যাপারগুলো সালিশি পরিষদ মীমাংসা করে দেবে। v
thumbelina005@gmail.com

আরও পড়ুন

×