ঢাকা বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

স্বপ্নের পথে বাবলিদের এগিয়ে চলা

স্বপ্নের পথে বাবলিদের এগিয়ে চলা

.

সাজিদা ইসলাম পারুল

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০০:৩৫ | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০১:৩৩

সিলেটের তরুণী বাবলি বেগম। ২০১৮ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর পুরো পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। কারণ তিনিই ছিলেন পরিবারের বড় সন্তান। এরপরই বন্ধ হয়ে যায় বাবলির পড়ালেখা। চাকরি নেন একটি এনজিও সংস্থায়। সেই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি এরপর কাপড়ের দোকান খুলে বসেন। এ ছাড়া বাড়ি বাড়ি গিয়ে পোশাক বিক্রিসহ নানাভাবে ক্যারিয়ার গড়ার চেষ্টা করেও সফল হননি অপর্যাপ্ত মূলধন ও যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবে। এ পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে অনেকটা ভেঙে পড়েন। এ সময়ে এক বন্ধুর সহায়তায় তিনি ব্র্যাকের স্কিলস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (এসডিপি) অধীনে খুচরা খাতে (রিটেইল সেক্টর) প্রশিক্ষণ নেন।
বাবলি বিশ্বাস করেন, এ প্রশিক্ষণই তাঁকে দক্ষ করে তুলেছে। এর ফলে একাধিক কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন নিজের একটি দোকান করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখতেও এখন নেই মানা। স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের স্বপ্ন পূরণের পথে আছেন বাবলি।

মা-বাবা, এক ভাই, এক বোন নিয়ে ছিল খুলনার বাসিন্দা রুমানা খাতুনের জীবন। শৈশব থেকেই দেখেছেন পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েন। রুমানার বাবা যখন তাদের ছেড়ে চলে যান, অর্থনৈতিকভাবে আরও অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় পরিবারটি। জীবনযাপনের খরচ নির্বাহে মায়ের সঙ্গে রুমানা একটি খাদ্যপ্রস্তুতকারী কারখানায় কাজ শুরু করেন। কিন্তু লেখাপড়া করার স্বপ্ন থেকে পিছপা হননি রুমানা। চালিয়ে যান পড়াশোনা। এসএসসি পরীক্ষার পর পরিবার থেকে যখন লেখাপড়া বন্ধ করার চাপ আসে, দমে যাননি রুমানা। বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে এবং শিক্ষকদের সহায়তায় পার হন উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি। এরপর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করতে শুরু করেন। অভিজ্ঞতা না থাকায় কোথাও চাকরি হচ্ছিল না। তখন একটি ফ্যাশন হাউসে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করলেও সেখানে থিতু হতে পারেননি রুমানা। হতাশার এই সময়ে আলোর দেখা মেলে ব্র্যাকের প্রশিক্ষণে। প্রতিষ্ঠানটির স্কিলস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (এসডিপি) অধীনে খুচরা খাত তথা রিটেইল সেক্টরের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি রুমানাকে। বর্তমানে তিনি প্রসাধনী ব্র্যান্ড ‘গোল্ডেন রোজ’-এ কাজ করছেন বিক্রয়কর্মী হিসেবে। এই প্রশিক্ষণ ও চাকরি তাঁর আর্থিক স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। একইভাবে খুচরা খাতে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন খাগড়াছড়ির মেয়ে শামীমা পারভীন। ঢাকায় এসে চাকরির খোঁজে সিভি জমা আর ইন্টারভিউ দিতে দিতে যখন হয়রান, তখন খোঁজ পান এই প্রশিক্ষণের। কালবিলম্ব না করে যোগ দেন। এখান থেকে বিক্রয়কর্মী হিসেবে দুই মাসের প্রশিক্ষণে শিখেছেন নানা বিষয়, যা তাঁকে করে তুলেছে দারুণ আত্মবিশ্বাসী। শামীমা বর্তমানে কাজ করছেন ‘আর্টিসান’ ফ্যাশন ব্র্যান্ডে।
বাবলি-রুমানার মতো অনেক তরুণ-তরুণী ব্র্যাকের প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। ২০২০ সাল থেকে খুচরা বিক্রয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করে ব্র্যাক। দুই মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে সাড়ে চার হাজারের বেশি বেকার বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর তরুণ-তরুণী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি চাকরি পেয়েছেন।

একইভাবে খুচরা খাতে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন আবিদা সুলতানা। তিনি এখন একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সিলেট শাখায় সেলস অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কর্মরত। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তবেই তিনি আজকের অবস্থানে এসেছেন। অন্যদিকে জুঁই আক্তার আছেন বহুজাতিক রিটেইল চেইন মিনিসোতে। তাঁর মতে, সুপারস্টাফ হিসেবে সাফল্যের পেছনেও রয়েছে ব্র্যাকের স্কিলস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের অধীনে (এসডিপি) খুচরা খাতে প্রশিক্ষণ।

এ প্রশিক্ষণ ও নিজের অদম্য সাহস ও একাগ্রতায় স্বাবলম্বী আবিদা সুলতানা, মনিকা আক্তার বন্যা, ইমন রানা, জুঁই আক্তারসহ হাজারো তরুণ-তরুণীর জীবনের গল্পগুলো প্রায় একই রকম। তাদের কর্মমুখী করে তোলার মাধ্যমে জীবনে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য এনে দেওয়ার পাশাপাশি স্বপ্নের পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য করছে ব্র্যাকের খুচরা খাতের এ প্রশিক্ষণ।

ব্র্যাকের স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর তাসমিয়া রহমান বলেন, ‘দেশের তরুণরা প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে কাজ পান না। আমাদের লক্ষ্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া। একটি প্রশিক্ষণ একাডেমি করারও চিন্তা রয়েছে আমাদের।’ 
 

আরও পড়ুন

×