ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

অভিব্যক্তি ও উপাখ্যানের শক্তি

খেরোখাতা

অভিব্যক্তি ও উপাখ্যানের শক্তি

নিজের স্টুডিওতে শিল্পী তরুণ ঘোষ [জন্ম : ২০ আগস্ট ১৯৫৩] ছবি :: ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য

হামিম কামাল

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৪ | ১২:৩২

তরুণ ঘোষ চিত্রশিল্পী হিসেবে যেমন স্বনামধন্য, তেমনি তাঁর উজ্জ্বল পরিচিতি রয়েছে শিল্প নির্দেশক হিসেবেও। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষকদের তিনিও একজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের শিষ্যত্বের পাট শেষের পর, বৃত্তি নিয়ে ভারতের বরোদায় বিখ্যাত মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পান খ্যাতিমান শিল্পী কে জি সুব্রহ্মণ্যনের সান্নিধ্য। ক্রমশ সম্পূর্ণ দেশীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির গড়ে দেওয়া ধাঁচে তৈরি তাঁর শিল্পশৈলী। বিচিত্র তাঁর কর্মপরিসর।

দেশে আবু সাইয়ীদ পরিচালিত ‘কিত্তনখোলা’ চলচ্চিত্রের শিল্প নির্দেশনার জন্য পান শ্রেষ্ঠ শিল্প নির্দেশকের রাষ্ট্রীয় সম্মান। কাজী রকিব, সিলভেইন নাহমিয়াসের সঙ্গে শিল্প নির্দেশনা দিয়েছেন তারেক মাসুদ পরিচালিত বিখ্যাত ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রেও। দর্শনগত দিক থেকে তরুণ ঘোষ লৌকিক পুরাণঘেঁষা শিল্পী। মূলত মানুষই তাঁর শিল্পের উপজীব্য। ধারাবাহিক চিত্র ‘বেহুলা’কে তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজগুলোর একটি হিসেবে গণ্য। এ ছাড়া ‘১৯৭১’ ধারাচিত্র সৃষ্টি করেছেন; যা বোদ্ধামহলে প্রশংসিত হয়েছে। মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, ১৯৮৯ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রায় জাতীয় প্রতীক বাঘের পোস্টারটি শিল্পী তরুণ ঘোষের আঁকা।   

সম্প্রতি তাঁর শিল্পভুবনের সঙ্গে পরিচিত হতে সরাসরি উপস্থিত হলাম হাতিরপুলে তাঁর বাড়িতে। ঢাকার আঁটিবাজারে মূল স্টুডিও থাকলেও ঘর তাঁর সমৃদ্ধ দ্বিতীয় স্টুডিও। তরুণ ঘোষের আবাসস্থলটিকে তাঁর শিল্পভুবনের মতোই রহস্যঘেরা বলতে হয়। দেয়ালে শোভা পাচ্ছে নিজের আঁকা চিত্রকর্মসহ নানান শিল্পীর চিত্রকর্ম, বৃহদায়তন মুখোশ, ছাদ থেকে নেমে এসেছে দীর্ঘ শিকা, তাতে রাখা মাটির হাঁড়িতে লৌকিক শিল্পকর্ম, অভ্যাগতদের স্বাগত জানাচ্ছে বড় আকারের রাজস্থানি পুতুল। শিল্পীর নিজ হাতে তৈরি চায়ে চুমুক দিতে দিতে আলাপ হলো তাঁর শৈশব, তরুণবেলার স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ, কাজের ভুবন। কথা বললেন তাঁর চারুজাগতিক শিল্পভাবনা ও শিল্পশৈলী তৈরি হওয়ার রহস্যময় মুহূর্ত নিয়ে। সংগতভাবেই বাদ পড়েনি যেভাবে ধারাচিত্র বেহুলা আঁকা শুরু হলো তার গল্পটিও।     

“একটা ফনিক্স সাইকেল ছিল আমার। যখন-তখন অজানার খোঁজে বের হয়ে পড়ার বাহন ছিল আমার শৈশবের প্রায় সার্বক্ষণিক সঙ্গী,” বললেন তরুণ ঘোষ। আদিবাড়ি নারায়ণগঞ্জে হলেও বেড়ে উঠেছেন রাজবাড়ী জেলায়। বাবাকে হারিয়েছেন মাত্র এক বছর বয়সে। তারপর মায়ের কাছেই মানুষ। দুরন্ত এই কিশোরকে নিয়ে মাকে স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিন্তা পোহাতে হয়েছে। 

“বন্ধুদের কাছে শুনলাম লক্ষ্মীকুল বলে এক জায়গায় রয়েছে এক পরিত্যক্ত রাজবাড়ী, সেখানে বাড়ির পেছনে ঘন জঙ্গলে কিছু মন্দির রয়েছে। ঘন গাছপালায় ঢাকা এলাকা, বটের ঝুরি নেমে এসেছে, সেখানে মন্দিরের গায়ে আঁকা আছে বিচিত্র সব ছবি। ব্যস, সাইকেল নিয়ে ছুটলাম,” বলছিলেন তরুণ ঘোষ। “রাজবাড়ী, পরিত্যক্ত। দোতলায় ওঠার সিঁড়ি বেয়ে একা একা উঠতাম। ঘরের ছাদ ভেদ করে ঝুরি, লতা নেমে এসেছে, কোনোটা সাপের মতো, কোনো যেন দড়ি, কোনোটা আবার সুতোর মতো। বাড়ির মাঝখানে উঠান। ভাবতাম এখানে একসময় কত মানুষের আনাগোনা ছিল। এক পর্যায়ে আমি কল্পনায় মানুষগুলোও দেখতে থাকলাম। এই কল্পনার জগৎটাই ছিল আমার প্রকৃত জগৎ। আরেকটা জায়গা আমাকে ভীষণ টানত, জায়গাটাকে আমরা বলতাম লোকোসেট। বিহারি অধ্যুষিত এলাকা। রাজবাড়ীতে একটা রেলওয়ে জংশন ছিল, রেলঘটিত অনেক বিষয়-আশয় ছিল। বিরাট জায়গা নিয়ে সেই লোকোসেট, মূলত রেল-ওয়ার্কশপ। ভেতর দিয়ে রেললাইন চলে গেছে। ট্রেনের যন্ত্রাংশ, ইঞ্জিন এসব জমা থাকত। কোনোটা ধোলাই হচ্ছে, কোনোটা মেরামত করা হচ্ছে, মানুষের শোরগোল, হুইসেল, ইঞ্জিনের শব্দ! আমাকে ভীষণ আকর্ষণ করত তাদের দানবীয় আকৃতি, সেখানকার আলোছায়া।” 

তরুণ ঘোষ বলছিলেন তাঁর পঞ্চম-ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়কার কথা। একটু বড় হতেই বন্ধুদের সঙ্গে সঙ্গে তিনিও যুক্ত হলেন ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে। একসঙ্গে সংগঠন করেছেন, গান, নাটক, দেয়ালিকা করেছেন। স্কুলে দেয়ালিকারও পেছনের নায়ক ছিলেন তরুণ ঘোষ। এলো মুক্তিযুদ্ধ। তরুণ ঘোষ তখন ক্লাস নাইন বা টেনে পড়েন। মানুষের ভেতর ঘনিয়ে উঠতে থাকা রোষ, প্রতিরোধ কাছ থেকে দেখেছেন। একবার খবর এলো গোয়ালন্দে আর্মির গানবোট আসছে, ওরা হেলিকপ্টার দিয়ে রেইড দিয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাইলেন স্থানীয়রা। সাধারণ মানুষ থেকে ইপিআর সদস্য প্রত্যেকে আক্ষরিক অর্থেই যার যা আছে তাই নিয়েই গোয়ালন্দগামী ট্রেনে উঠে পড়লেন। স্থানীয়রা সঙ্গে দিয়ে দিলেন, রুটি, পানি, যা পেরেছেন। কিশোর তরুণ কুমার ঘোষ ছুটে গেলেন ট্রেনে উঠবেন, কিন্তু তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো। ট্রেনটা যখন চালু হলো, তিনি দৌড়ে উঠে গেলেন স্টেশনের ওভারব্রিজের ওপর। রেল চলতে শুরু করেছে, কালো ধোঁয়া উড়ছে ... “সেই ছবিটা চিরদিনের মতো আমার মনে আঁকা হয়ে রইল,” বললেন তরুণ ঘোষ। 

কথা শুনতে শুনতে চা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। আলোকশিল্পী ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য মুহূর্ত বুঝে ছবি তুলে নিচ্ছেন। কথা মোড় নিল তাঁর শিল্পী হয়ে ওঠার গল্পে। 

“পটচিত্রের নকশার মতো বিষয়গুলো আমি ছোটবেলা থেকেই করেছি, কিন্তু এর মূল্যটা বুঝেছি আবেদিন স্যারের সান্নিধ্যে আসার পর। আমাদের সৌভাগ্য যে আমরা তাঁকে পেয়েছি।” তরুণ ঘোষের প্রথম বর্ষে (১৯৭১-৭২) শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন একবার অভিমান করে ক্যাম্পাসে আসা বন্ধ করেছিলেন। তরুণ ঘোষ ও তাঁর বন্ধুরা উদ্যোগ নিয়ে বাড়িতে গিয়ে অভিমান ভাঙিয়ে শিল্পাচার্যকে আবার ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেন। আনন্দঘন মুহূর্ত ছিল ওটা। যাহোক, কথা হচ্ছিল, শিল্পী সৃষ্টির বোধ বা জ্ঞান কীভাবে জন্ম নেয়। “শিল্পজ্ঞান কীভাবে হয়? জীবন দিয়ে হয়। জীবনকে যদি সুন্দর চোখে দেখার ইচ্ছে, প্রবণতা থাকে; জীবন খোঁজার তাড়না অনুভব যারা করেন, তারা শিল্পকে চিনতে পারেন।”  

তরুণ ঘোষ মনে করেন, একাডেমিক শিক্ষার আওতায় এসে শিল্পী তুলি ধরতে শেখে, সজ্জা তৈরি করতে শেখে; কিন্তু শিল্প সৃষ্টির রসদ আসে নিজস্ব জগৎ থেকে। প্রত্যেকেরই আলাদা জগৎ রয়েছে, তাই প্রত্যেকেরই মৌলিক শিল্পভুবন তৈরি করা সম্ভব। সেই ভুবনটিকে আবিষ্কারের মুহূর্তটি তার শিল্পজ্ঞান সৃষ্টির সূচনাবিন্দু। এরপর এর এগিয়ে যাওয়াটা শিল্পীর ইচ্ছানির্ভর, প্রবণতানির্ভর। শিল্পীকে তাঁর ভালোবাসার জায়গাটা আবিষ্কার করতে হয়। কীভাবে সে তুলি ধরতে পছন্দ করছে, কীভাবে রেখা টানতে পছন্দ করছে– এখান থেকে শুরু করে, একটা ছবি পেন্সিলে কীভাবে দেখতে চাই, তুলিতে কীভাবে দেখতে চাই অথবা অন্য মাধ্যমে, এমন ভিন্নতার বোধ শিল্পীকে নিজের ভাষার সঙ্গে পরিচিত করে তোলে। শিল্পী নিজেকে আবিষ্কার করে এবং ক্রমশ শিল্পকে আবিষ্কার করে। 

শিল্পকে আবিষ্কারে শিক্ষকের ভূমিকা নিয়ে আলাপ হলো। বললেন, “মানুষের শিক্ষক কেবল একটা গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না। আমি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, মোহাম্মদ কিবরিয়া স্যারের কাছে শিখেছি, শিখেছি চারুকলার সমস্ত শিক্ষকের কাছে। আমার অগ্রজদের কাছে শিখেছি। ছোটবেলায় বন্ধু দিলীপ পালের সঙ্গে পালপাড়ায় যেতাম, ওর বাবা, তাঁর নাম আমার স্মরণে নেই, তিনিও আমার শিক্ষক; একইভাবে বরোদায় অতি অল্প দিনের শিক্ষক সুব্রহ্মণ্যন, দীর্ঘদিনের শিক্ষক গোলাম মোহাম্মদ শেখ, দেশে আমার শিল্প নির্দেশনার গুরু ও স্বপ্নদ্রষ্টা মুহম্মদ খসরু– প্রত্যেকেই। শিল্পগুরু একজন হন না। যে নিতে পারে, সে সবার কাছ থেকে নেয়, তার অনেক গুরু থাকে।” 

মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিক ও এর পৌরাণিক প্রকাশ প্রাধান্য পেয়েছে তাঁর আঁকায়। মানুষের মন ধরা থাকে চোখে, ধরা থাকে মুখের অভিব্যক্তিতে। অভিব্যক্তিপূর্ণ মুখ অমূল্য। মুখকে শিল্পরূপ দেওয়ার প্রবণতা থেকে তাঁর ক্যানভাসে, বেহুলায়, সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে মুখের ছবি; চেনা-অচেনা মুখ, স্বপ্নে দেখা মুখ। 

একটু ব্যক্তিগত মোড়। শিল্পী তরুণ ঘোষের শিল্পের প্রেরণাদায়িনী, জীবনসঙ্গিনী মিথুন সরকার জয়া। তাদের বিয়েটা হয়েছিল ১৯৯৭ সালে, কাছের বন্ধুদের উৎসাহ-আয়োজনে। একমাত্র সন্তান মিথ উৎস ঘোষ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলায় পড়ছেন।  

আরও পড়ুন

×