ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

ভালোবাসা

রাসেলের কইতর

খালেক বিন জয়েনউদদীন-এর গদ্য

রাসেলের কইতর

খালেক বিন জয়েনউদদীন, প্রতিকৃতি এঁকেছেন তন্ময় শেখ

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৪ | ১৭:৩৯

ওপরের ছবির এই ভাবুকটা তোমাদের অনেক ভালোবাসতেন। তোমাদের জন্য লিখেছেন ছড়া-কবিতা, গদ্য, উপন্যাস ও জীবনী। নাম তাঁর খালেক বিন জয়েনউদদীন। প্রিয় এই লেখকের জন্ম ১৯৫৪ সালের ২৪ জানুয়ারি; গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার চিত্রাপাড়া গ্রামে। প্রিয় এই লেখক, প্রিয় এই ভাবুক ভাবতে ভাবতে আকাশের দেশে চলে গেলেন ১৪ জানুয়ারি ২০২৪। না ফেরার দেশে চলে যাওয়া এই ভাবুকটার প্রতি রইলো পৃথিবীর সব ফড়িংয়ের পক্ষ থেকে অশেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। চলো, লেখকের ‘নির্বাচিত শিশুকিশোর রচনা’ শিরোনামের গ্রন্থ থেকে একটি গদ্য নতুন করে পড়ি...

ওই ছোট্ট পাখিটার কত নাম। কেউ ডাকে পায়রা, কেউ ডাকে কবুতর। অভিধানে কপোত ও পারাবতও লেখা আছে। আমাদের কিশোর খোকার কাছে এর কোনোটাই পছন্দ নয়। তার প্রিয় নাম কইতর। খোকা কইতর পোষে। শালিক ও ময়নাপাখির ছানা, বানর এবং কুকুরও আছে তাঁর। ছোট বোন খোদেজাকে নিয়ে তাঁর জগৎ। পাখি ও জীবজন্তুর প্রতি ভীষণ মায়া। দূরে কোথাও গেলে খাওয়া-দাওয়া ও নাওয়ার ভার দিয়ে যেত খোদেজার ওপর। একটু ত্রুটি হলে বোনটিকে বকা দিত। অবহেলা হলে মায়ের কাছে বোনটির বিরুদ্ধে নালিশ করত। খোকার সেই শৈশব-কৈশোরের কাহিনি এখন ইতিহাসের আকর। 

কৈশোরে গোপালগঞ্জে বাবার সঙ্গে থাকা, মাদারীপুরে পড়াশোনা করা, চোখের অসুখ সারানোর জন্য কলকাতা গমন এবং মিশন ইশকুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করার কথা কে না জানে। আবার কলকাতায় গিয়ে কলেজে ভর্তি হওয়া, আন্দোলনে অংশ নেওয়া, দেশবিভাগের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া এবং মানুষের অধিকার আদায়ে পুরোপুরি শামিল হওয়ার কথা আমরাও জানি। এভাবেই দিন গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে অনেক বছর গত হলো। এক সময় খোকা তাঁর ছোট্ট সংসারটির সদস্যদের নিয়ে এলেন ঢাকায়। রাজনীতি করলে যা হয়, প্রায়ই জেলে থাকতে হয়। কেউ ছেলেমেয়েদের সহজে বাড়ি ভাড়া দিতে চায় না। কত কষ্ট তার পরিবারের।

ইতোমধ্যে খোকার নামডাক হয়েছে। দেশের কথা, মানুষের কথা এবং মানুষের অধিকার আদায়ের কথা বলে সুনাম অর্জন করেছেন। মানুষের প্রতি তাঁর ছিল গভীর টান ও বিশ্বাস। নির্যাতন-নিপীড়ন দেখলেই প্রতিবাদ, রুখে দাঁড়ানোর কর্মসূচি এবং মানুষের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে লড়াই করে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। সেবার দেশের সব বিরোধী দল মিলে একটা ফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে অংশ নিল। খোকাদের ফ্রন্ট জিতল এবং খোকা মন্ত্রী হয়ে বসলেন। কিন্তু উঁচু মহলের ষড়যন্ত্রে মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়া হলো। শুধু তাই নয়, খোকাকে পরের দিন বন্দি করা হলো। সরকারি বাসাও ছাড়তে হলো। খোকার পরিবারের সদস্যরা কোথায় দাঁড়াবে? সহজে কেউ বাসা ভাড়া দিতে চায় না। দিনেও আড়ালে-আবডালে থাকতে হয়।

এক পর্যায়ে ধানমন্ডির লেকের উত্তরপাড়ে এক টুকরো জমি মিলল খোকার। কিন্তু বাসা বাঁধার টাকা কই? কীভাবে ঘর উঠবে। দুই কামরা উঠল খোকার স্ত্রীর তদারকিতে। পর্যায়ক্রমে একতলা-দোতলা। এ সময় খোকার বড়ো ইচ্ছে হলো, কৈশোরে ফিরে যেতে। একদিন রেণুকে (খোকার স্ত্রীর নাম) ডেকে বললেন, টুঙ্গিপাড়ার বাড়ির মতো এ বাসায় গরুর আথাল থাকবে। দালানের একপাশে থাকবে বেতের ঝোপ, আর থাকবে কইতরের খোপ। এই খোপে কইতর বাকবাকুম ডাকবে। তাদের ছোট ছেলেটিও কইতর ভীষণ ভালোবাসে। খোকার কথামতো রাখাল এলো গাভিসমেত। বায়াত্তরটি খোপের কইতরের বড় বাসা দাঁড় করানো হলো উত্তরপাশে। বেতের কাঁটাযুক্ত কচি চারা লাগানো হলো দালানের পূর্ব পাশে। আর দক্ষিণ পাশে আছে বড় লেক, জল টলমলে ভরা। পাড়ে শিরীষ গাছ। বত্রিশ নম্বর সড়কের সেই ৬৭৭ নম্বর বাড়ি দেখলে মনে হবে টুঙ্গিপাড়ার গেরস্থ পরিবারের এক বাড়ি।

শহরে গ্রামবাংলার পরিবেশ গাছগাছালির ছায়ায় গড়া হয়েছে। মাঝেমধ্যে খোকার বুড়ো মা-বাবা বেড়াতে আসেন, ঘরের দক্ষিণ পাশে বেতের চেয়ারে বসে গাঁয়ের গল্প করেন। আবার চলে যান নিজ গাঁয়ে।
এরপর খোকার জীবনকাহিনি সংগ্রাম ও আন্দোলনের। শাসকগোষ্ঠী দেশ পৃথক করার অভিযোগে খোকাসহ অন্যদের জেলে পুরল। দেশের মানুষ খেপে উঠল। জেলের তালা ভাঙল। নির্বাচনেও জিতল খোকার দল। কিন্তু চুয়ান্ন-সাতান্নর মতো আবার কূটচাল। ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হলো না তাদের। খোকাকে বন্দি করা হলো। খোকার অনুসারীরা তখন যুদ্ধের মাঠে। যুদ্ধে বাঙালি জয়ী হলো। খোকা বীরের বেশে ফিরে এলেন দেশে। আবার ছশো সাতাত্তর নম্বর বাড়ি লোকে গমগম করে উঠল।

একাত্তরের হারিয়ে যাওয়া কইতরগুলো আবার ফিরে এলো খোপে, ঠিক খোকার মতো। বায়াত্তর খোপের কইতরি বাড়িটি তখন সকল কাজের কেন্দ্রবিন্দু। খোকা দেশের নায়ক ও সাধারণ মানুষের প্রিয়বন্ধু। রাজভবনে না থেকে নিজের বাড়িতে থেকেই সবকিছু করছেন। সময় পেলেই বাড়ির প্রতিটি প্রাণীর খবর নিচ্ছেন। সকাল-বিকাল নিজ হাতে কইতরকে খাবার দিচ্ছেন। খাবার ছেটানোর সময় তাঁর ছোট্ট ছেলেটি পাশে থাকে। ছোট্ট ছানা হাতে নিয়ে আদর করে। খোপের কাছে গিয়ে বাকবাকুম ডাক শোনে। আবার আকাশে ওড়ার সময় তাকিয়ে থাকে।

একদিন কী হলো, কাজের বুয়া ছোট ছেলেটিকে কইতরের মাংস খেতে দিলে সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। মা-বাবার কাছে জানতে চাইল, ক্যানো তাদের কইতর জবাই করা হয়েছে?

সেই থেকেই ছশো সাতাত্তর নম্বর বাড়িতে কইতরের মাংস খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। আর কোনোদিন সাহস করে কইতর জবাই করেনি কেউ। বেশ আনন্দ ও মুক্ত হাওয়ায় চলছিল কইতরের নাগরিক জীবন।

কিন্তু পঁচাত্তরে ওই বাড়িতে হানা দিল একদল মানুষরূপী হায়েনার দল। তারা বাড়ির সবাইকে গুলি করে মারল। মারা গেল কামানের গোলায় খোকা ও খোকার ছোট্ট প্রিয় সেই কইতরের অনেকগুলো। বাকি যারা থাকল, তারা একদিন পর উড়াল দিল খোকার লাশবাহী কপ্টারের পেছনে পেছনে। খোকাকে নিয়ে যাচ্ছিল নিজ বাড়িতে খুনিরা। সেখানেই তাঁকে মাটি দেওয়া হবে। 

আরও পড়ুন

×