ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ই-বর্জ্য থেকে স্বর্ণের গহনা

ই-বর্জ্য থেকে স্বর্ণের গহনা

ই-বর্জ্য থেকে মূল্যবান ধাতু উদ্ধারের প্রক্রিয়া বের করেছেন বিজ্ঞানীরা

মোশারফ হোসেন

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৪ | ০৭:৫৩ | আপডেট: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ১১:১৭

বিশ্বে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এ বর্জ্যগুলো পুনরায় ব্যবহারের খুব একটা উদ্যোগ দেখা যায় না। তবে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মিন্ট কোম্পানি নষ্ট হয়ে যাওয়া ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন থেকে মূল্যবান ধাতু বের করে পুনরায় ব্যবহারের পথ খুঁজে পেয়েছে।

দক্ষিণ ওয়েলসের কার্ডিফ শহরে রয়্যাল মিন্টের অবস্থান। কোম্পানিটি মূলত যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি ৩০টির বেশি দেশের জন্য শত শত কোটি কয়েন তৈরি করে। সম্প্রতি ই-বর্জ্য থেকে মূল্যবান ধাতু উদ্ধার করতে নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে রয়্যাল মিন্ট। সূত্র: বিবিসি

এক দল রসায়নবিদ ও রাসায়নিক বিশ্লেষক নষ্ট হয়ে যাওয়া ল্যাপটপ ও পুরোনো ফোনের সার্কিট বোর্ড থেকে ৯৯ শতাংশ স্বর্ণ সংগ্রহ করতে সমর্থ হন। সেই ধারাবাহিকতায় গত বছরের শেষদিকে রয়্যাল মিন্ট একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করে। যেখানে সপ্তাহে ৯০ টন সার্কিট বোর্ড থেকে মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ করা যাবে। বছর শেষে পাওয়া যাবে শত শত কেজি স্বর্ণ।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি অনুসারে, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় পাঁচ কোটি টন ই-বর্জ্য উৎপাদিত হয়। মাত্র ২০ শতাংশ পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হয়। বেশির ভাগই ফেলে বা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। গত বছরের একটি সমীক্ষা বলছে, নেদারল্যান্ডস জনপ্রতি সবচেয়ে বেশি ই-বর্জ্য উৎপাদন করে, দ্বিতীয় অবস্থানে আছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে আটে।

বহনযোগ্য ডিভাইস ও ইলেকট্রনিক পণ্যের চাহিদা প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। সঙ্গে ই-বর্জ্যের পরিমাণও বাড়ছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ই-বর্জ্যের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ১২ কোটি টনের বেশি। 

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের মতো স্বর্ণের পরিমাণ খুবই সীমিত। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, বিশ্বের প্রায় ৭ শতাংশ স্বর্ণ অব্যবহৃত ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ভেতর পড়ে আছে। স্বর্ণ বের করতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা এশিয়ার দেশগুলোতে পুরোনো ডিভাইস পাঠানো হয়। সেখানে উচ্চ তাপমাত্রায় ই-বর্জ্য গলানো হয়। 

রয়্যাল মিন্ট চাইছে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সব ই-বর্জ্য দেশের মধ্যে পরিশোধন করতে। বৈশ্বিকভাবে এ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতেও কাজ করছে তারা।

রয়্যাল মিন্ট যেভাবে স্বর্ণ তৈরি করে 

কর্মীরা প্রথমে ল্যাব কোট বদল করে কমলা রঙের শক্ত টুপি, একটি কালো জ্যাকেট এবং এক জোড়া উন্নত মানের বুট পরে নতুন প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় যান। সেখানে বড় ময়লার ব্যাগ রঙিন সার্কিট বোর্ডে ভর্তি থাকে। এগুলো ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন থেকে খুলে ৫০টির বেশি ই-বর্জ্য ডেলিভারি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কারখানায় আসে।

কারখানায় আসার পর সার্কিট বোর্ডগুলোকে ভালোভাবে পরীক্ষা করে একটি ফানেলে রাখা হয়। তারপর যান্ত্রিকভাবে এগুলোকে ভেঙে আলাদা করা হয়। সার্কিট বোর্ড থেকে সংগ্রহ করা দ্রবীভূত মিশ্রণটি ঢাকনা দিয়ে একটি ফ্লাস্কে রাখা হয়। তারপর ফ্লাস্কটি নাড়াচাড়ার জন্য একটি মেশিনে নেওয়া হয়। ৪ মিনিটের মধ্যে স্বর্ণ তরল হয়ে বেরিয়ে আসে। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাসায়নিক মিশ্রণটি ২০ বারের মতো ব্যবহার করা হয়, যাতে স্বর্ণের ঘনত্ব বাড়ে। শুরুতেই অন্যান্য ধাতু সরিয়ে ফেলার কারণে রাসায়নিক দ্রবণগুলো শুধু স্বর্ণতেই ব্যবহার করা হয়।

রয়্যাল মিন্ট পুরো ল্যাপটপ বা মোবাইল ফোনের পরিবর্তে শুধু সার্কিট বোর্ড সরবরাহ করে। স্বর্ণ ছাড়া অন্য যেসব ধাতু পাওয়া যায়, সেগুলোকে এক পাশে রাখার ব্যবস্থাও করেছে কোম্পানিটি। অন্যদিকে সার্কিটের যে অংশে স্বর্ণ থাকে, তা ডিজিটাল মাধ্যমে চিহ্নত করে ৫০০ লিটারের রিঅ্যাক্টরে ফেলা হয়। এরপর অতি গোপন একটি দ্রবণ এতে মেশালে তরল স্বর্ণ পাউডারে রূপান্তর হয়। সেখান থেকে আবার চুল্লিতে গলিয়ে নেকলেস, কানের দুল ও বিভিন্ন ধরনের গহনা তৈরি করা হয়। স্বর্ণ বের করে আনার পর অন্যান্য ধাতু পুনরায় ব্যবহারের জন্য সরবরাহ চেইনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ফলে কোনো কিছু নষ্ট হয় না।

আরও পড়ুন

×