ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

আড়াই শ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘হুমগুটি’

আড়াই শ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘হুমগুটি’

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলায় ২৬৫ বছর ধরে চলে আসছে ঐতিহ্যবাহী খেলা ‘হুমগুটি’

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৪ | ০৭:৫৭

পৌষ মাসের শেষ দিনকে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলায় আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় ‘পুহুরা’। প্রতি বছর এই দিনে একই সময়ে একই স্থানে ২৬৫ বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয় খেলাটি। পিতলের মোড়কে তৈরি একটি ভারী বল নিয়ে কাড়াকাড়ি চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন। ময়মনসিংহ অঞ্চলের জনপ্রিয় এই খেলার নাম ‘হুমগুটি’। লিখেছেন ইমতিয়াজ আহমেদ

প্রকৃতিতে বিদায়ের ঘণ্টা পড়েছে পৌষের, রাত পোহালেই মাঘের লগ্ন। সপ্তাহজুড়ে দেখা নেই রোদের, সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কনকনে ঠান্ডা, হিমেল হাওয়ায় জবুথবু পরিবেশ-প্রতিবেশ। তবে গ্রামীণ জনপদে শীতটা যেন একটু বেশিই জেঁকে বসেছে। অন্যতম বাংলা মাস পৌষে বেশ মজা করে খাওয়া যায় খেজুরের রস, বিভিন্ন ধরনের পিঠা এবং টাটকা শাকসবজি। এ মাস অনেকেরই প্রিয় হয়ে থাকে। সেই মাস বিদায় নিয়েছে। কথায় আছে– ‘মাঘের শীতে বাঘ কান্দে’। সেই মাঘের আগমনকে জানান দিয়েই বিদায় নিয়েছে পৌষ। পৌষের শেষদিন মানে ‘পৌষসংক্রান্তি’।

দিনটি উৎসবের। কালের আবর্তে এখনও টিকে আছে হাজার বছরের গ্রামীণ সংস্কৃতি। বিভিন্ন বাসাবাড়িতে পিঠাপুলির আয়োজন করা হয়। ঘুড়ি ওড়ানো, আতশবাজি, পটকা ফোটানো এসব থাকে এ উৎসবে। আঞ্চলিক ভাষায় একে বলা হয় ‘পুহুরা’। ২৬৫ বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ‘হুমগুটি’ খেলা। পিতলের মোড়কে তৈরি ৪০ কেজির একটি ভারী বল নিয়ে চলতে থাকে কাড়াকাড়ি। যদিও কালের বিবর্তনে খেলার সুবিধার্থে গুটির ওজন কমিয়ে আনা হয়েছে ৩০ কেজিতে।

খেলা উপলক্ষে মেয়েরা আসে বাপের বাড়ি। দর্শক হিসেবে থাকার আনন্দ থেকে বাদ পড়তে চায় না তারাও। বাড়ি বাড়ি চলে পিঠাপুলির উৎসব। খেলাস্থলে জমে ওঠে গ্রামীণ ‘পহুরা’ মেলা। জবাই করা হয় গরু-ছাগল। উপজেলার লক্ষ্মীপুর, দেওখোলাসহ আশপাশের গ্রামগুলোয় দু’তিন দিনব্যাপী চলে উৎসব আমেজ। দেখা যায়, নতুন জামাকাপড় পরে সেজেগুজে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে বাচ্চারা। ঘরের নতুন বউ পুরোনো শাড়ি পাল্টে আজ পরেছে নতুন পাটভাঙা শাড়ি। চোখে হালকা কাজল মেখে ঠোঁটে পরেছে অল্প করে লিপস্টিক। ঘোমটা টেনে লাজুক লাজুক হাসিতে দৌড়ে দৌড়ে ঘরের কাজ সামলাচ্ছে। বাড়িভরা নাইওরিতে গমগম করছে। 

সময়ের আবর্তে গ্রামগঞ্জ থেকে খেলার প্রচলন অনেকটাই বিলীন হওয়ার পথে। সেই সঙ্গে খেলাকে কেন্দ্র করে মেলার সেই আমেজ আগের মতো নেই। তবুও এই হুমগুটি খেলাকে কেন্দ্র করে এখনও পুরোনো আমেজে সদর্পে টিকে আছে গ্রামীণ মেলা। ধান কেটে ফেলার পর খোলা মাঠে বসেছে ‘পৌষমেলা’। খেলা দেখার ফাঁকে বন্ধুবান্ধব-পরিবার নিয়ে অনেকেই ঘুরতে এসেছেন মেলায়। গরম গরম হালিম, চটপটি থেকে শুরু করে খুরমা, জিলাপি, বাহারি মিষ্টি, পাপড় ভাজা ছাড়াও মুখরোচক বিভিন্ন খাবারের পসরা চোখে পড়ে। বাচ্চাদের খেলনার দোকান, কসমেটিকস, নাগরদোলাসহ জমজমাট বেচাকেনার কথা জানান ব্যবসায়ীরা। পুরো এলাকায় যেন এক সাজ সাজ আমেজ।

ময়মনসিংহ সদর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে ময়মনসিংহ-ফুলবাড়িয়া সড়কের লক্ষ্মীপুর ও দশমাইলের মাঝামাঝি ‘বড়ইআটা বন্দ’ (পতিত জমি) খেলার কেন্দ্রস্থল। প্রচারবিহীন এ খেলায় সকাল থেকেই ফুলবাড়িয়া ছাড়াও ত্রিশাল ও মুক্তাগাছা উপজেলার হাজারো মানুষ জমায়েত হতে থাকে লক্ষ্মীপুর বড়ইআটা বন্দে। কণ্ঠে কণ্ঠে উচ্চারিত হয় ‘জিতই আবা দিয়া গুটি ধররে... হেইও’।

ফুলবাড়িয়া উপজেলা সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে লক্ষ্মীপুরের বড়ইআটা বন্দ। খেলা শুরুর আগে ময়মনসিংহ-ফুলবাড়িয়া সড়কের অদূরে ভাটিপাড়া, বালাশ্বর, তেলিগ্রামের সংযোগ সড়কে নামে মানুষের ঢল।

জানা যায়, মুক্তাগাছার জমিদার রাজা শশীকান্তের সঙ্গে ত্রিশাল উপজেলার বৈলরের হেমচন্দ্র রায় জমিদারের জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। জমিদার আমলের শুরু থেকেই তালুকের প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল ১০ শতাংশে, পরগনার প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল সাড়ে ছয় শতাংশে। একই জমিদারের ভূখণ্ডে দুই নীতির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে প্রতিবাদী আন্দোলন। 

জমির পরিমাপ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসা করতে লক্ষ্মীপুর গ্রামের বড়ইআটা নামক স্থানে ‘তালুক-পরগনার সীমানায়’ এ গুটি খেলার আয়োজন করা হয়। গুটি খেলার শর্ত ছিল গুটি গুমকারী এলাকাকে ‘তালুক’ এবং পরাজিত অংশের নাম হবে ‘পরগনা’।

জমিদার আমলের সেই গুটি খেলায় মুক্তাগাছা জমিদারের প্রজারা বিজয়ী হয়। এভাবেই তালুক পরগনার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে ব্রিটিশ আমলে জমিদারি এই খেলার গোড়াপত্তন, আড়াইশ বছরের পর আজও চলছে। এখন ৩০ কেজি ওজনের পিতলের গুটি ঢাকঢোলের তালে তালে নেচে-গেয়ে তালুক পরগনার সীমানায় নিয়ে আসা হয়।

প্রতি বছর পৌষের শেষ বিকেলে এই খেলাকে ঘিরে অতি প্রাচীনকাল থেকেই লক্ষ্মীপুর, বড়ইআটা, ভাটিপাড়া বালাশ্বর, শুভরিয়া, কালীবাজাইল, তেলিগ্রাম, সারুটিয়া, গড়বাজাইল, বাসনা, দেওখোলা, কুকরাইল, বরুকা, ফুলবাড়িয়া পৌর সদর, আন্ধারিয়াপাড়া, জোরবাড়িয়া, চৌধার, দাসবাড়ী, কাতলাসেনসহ আশপাশের ১৪ থেকে ১৫টি গ্রামে শুরু হয় উৎসবের আমেজ। 

এ খেলায় কোনো রেফারি থাকে না। একেক এলাকার একেকটি নিশানা থাকে। ওই নিশানা দেখে বোঝা যায় কারা কোন পক্ষের লোক। ‘গুটি’ কোন দিকে যাচ্ছে, তা মূলত চিহ্নিত করা হয় নিশানা দেখেই। নিজেদের দখলে নিতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয় খেলায়। এভাবে গুটি ‘গুম’ না হওয়া পর্যন্ত চলে খেলা। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে খেলা। কখনও দু’তিন দিন পর্যন্ত খেলা চলার রেকর্ড আছে। এ বছর ‘হুমগুটি’ গেছে ত্রিশালের ধানিখোলা ইউনিয়নের পালোয়ানদের দখলে। 

ঢাকঢোল ও বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সকাল থেকে দল বেঁধে শত শত খেলোয়াড় খেলার কেন্দ্রস্থল তেলিগ্রাম বড়ইআটা গ্রামে আসে। সন্ধ্যায় খেলায় লাখো মানুষের ঢল নামে। গত ১৪ জানুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় খেলাটি চলছিল পাশের দশমাইল গ্রামে। রোববার দুপুরে ঐতিহ্যবাহী ‘হুমগুটি’ খেলার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন জাতীয় সংসদ সদস্য মো. আব্দুল মালেক সরকার। এ সময় বালিয়ান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মিজানুর রহমান পলাশ, খেলার আয়োজক মো. আবু বক্কর সিদ্দিক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধন শেষে শত শত মানুষের উপস্থিতিতে প্রায় ৩০ কেজি ওজনের হুমগুটি মুক্তাগাছা জমিদার শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী ও বৈলরের জমিদার হেমচন্দ্র রায়ের সীমানা তেলিগ্রাম বড়ইআটা গ্রামে ধানের পতিত জমিতে হাজার হাজার খেলোয়াড়ের মধ্যে ছেড়ে দিলে ‘হুমগুটি’ নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হয়।

‘হুমগুটি’ স্মৃতি সংসদের পরিচালক এবি সিদ্দিক আরও বলেন, ‘হুমগুটি খেলার মাধ্যমে দুই জমিদারের জমির পরিমাপ বিরোধ সমাধান হয়েছিল। পূর্বজরা প্রতি বছর পৌষ মাসের শেষ দিন খেলাটি আয়োজন করেছে, তারই ধারাবাহিকতায় আমরা যুগ যুগ ধরে খেলাটির আয়োজন করে আসছি।’

আরও পড়ুন

×