শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মপরিবেশের উন্নতি ঘটছে দিন দিন। নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থানেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বড় আকারের শিল্পকারখানায় পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় এখন নারী শ্রমিকের সংখ্যাই বেশি। এ ধরনের কারখানার শ্রমিকদের প্রায় ৫৫ শতাংশ নারী। অন্যদিকে পুরুষ শ্রমিকের হার ৪৫ শতাংশ। পাশাপাশি শিল্পকারখানার স্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যাতেও নারীরা পুরুষের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। মোট স্থায়ী শ্রমিকের মধ্যে ৬৩ শতাংশেরও বেশি নারী।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। 'সার্ভে অব ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রিজ (এসএমআই)' নামের জরিপ প্রতিবেদনটি শনিবার সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। ২০১৯ সালে সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

বিবিএসের জরিপ বলছে, বড় শিল্পে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হলেও অন্যান্য শিল্পকারখানায় এ হার বেশ কম। মাঝারি আকারের কারখানায় নারী শ্রমিক ২৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ক্ষুদ্র কারখানায় ১৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। অতিক্ষুদ্র কারখানায় আরও কম। সেখানে ১৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ নারী শ্রমিক কাজ করছেন। এ ছাড়া শ্রমিকদের ৫৯ শতাংশ স্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করে। বাকি ৪১ শতাংশ অস্থায়ী ভিত্তিক। আর স্থায়ী শ্রমিকের ৬৩ দশমিক ২৪ শতাংশই নারী।

বড় শিল্পে এবং স্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যায় নারীরা এগিয়ে থাকার বিষয়টিকে অত্যন্ত ইতিবাচক বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) শ্রম বিশেষজ্ঞ সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ। গতকাল সমকালকে তিনি বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারীর এ অগ্রগতিকে টেকসই করতে হবে। কর্মপরিবেশ আরও নিরাপদ করতে হবে। সেসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে সমমজুরি। তার মতে, কর্মপরিবেশ আগের তুলনায় কিছুটা অনুকূল বলেই নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। এ ছাড়া শিক্ষায় নারীর অগ্রগতি এবং নগরায়ণের একটা ভূমিকা এতে থাকতে পারে।

জরিপের তথ্যমতে, শিল্পকারখানাগুলোর মধ্যে ৩৬.৩৮ শতাংশ অতিক্ষুদ্র, ৫০.৫৪ শতাংশ ক্ষুদ্র, ৬.৮৯ শতাংশ মাঝারি এবং ৬.১৯ শতাংশ বড় আকারের প্রতিষ্ঠান। ২০১০ সালের শিল্পনীতির ভিত্তিতে কারখানার শ্রেণিবিন্যাস অনুসরণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী নূ্যনতম ১০ থেকে সর্বোচ্চ ২৪ জন শ্রমিক কাজ করেন এ রকম কারখানা ক্ষুদ্রশিল্প। ২৫ থেকে ৯৯ শ্রমিকের প্রতিষ্ঠান ছোট কারখানা। আর ১০০ থেকে ২৫০ পর্যন্ত শ্রমিকের কারখানাকে মাঝারি ও ২৫০ জনের বেশি শ্রমিকের কারখানাকে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে শিল্পকারখানাগুলোতে ৫৪ লাখ ৬৫ হাজার ১৬২ শ্রমিক কাজ করেন। এদের ৫৬ শতাংশের কিছু বেশি পুরুষ এবং প্রায় ৪৪ শতাংশ নারী। বিবিএসের জরিপ প্রতিবেদন বলছে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় বস্ত্র খাতে। যা মোট উৎপাদনের প্রায় ২৮ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে খাদ্যপণ্য। এ খাতের উৎপাদন ২০ শতাংশের কিছু বেশি। তৈরি পোশাক রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে। মোট উৎপাদনের প্রায় ১৭ শতাংশ হয় এ খাতে।

মজুরি এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা সবচেয়ে বেশি দিয়ে থাকে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠাগুলো। সরকারে রাজস্ব জোগানেও বড় শিল্পগুলোর অবদান সবচেয়ে বেশি। শিল্প খাতে মোট পরোক্ষ করের প্রায় ৯০ শতাংশ দেয় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। আবগারি শুল্কের ৭৫ শতাংশ দেয় তারা।

তবে পণ্য উৎপাদনে স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহারে বড় শিল্পের তুলনায় অন্যান্য শিল্প এগিয়ে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে অতিক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো। ব্যবহূত কাঁচামালের ৯৩ শতাংশই স্থানীয় উৎস থেকে সংগ্রহ করে থাকে এরা। ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার হার প্রায় ৮৩ শতাংশ। আর মাঝারিতে এটি প্রায় ৬৩ শতাংশ। বৃহৎ শিল্পে স্থানীয় উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের হার সবচেয়ে কম। এসব প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহারের হার ৪৪ শতাংশের মতো। বড় শিল্পকারখানাগুলোর পণ্য উৎপাদনে আমদানি করা কাঁচামাল বেশি ব্যবহার করে থাকে বলে পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে উঠে এসেছে।