পশ্চিম ইউরোপের শান্তিপ্রিয় ও অভিবাসীবান্ধব রাষ্ট্র পর্তুগাল। বর্তমানে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় দেশটি ইউক্রেনের নাগরিকদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। ইউক্রেনকে আর্থিক, সামরিক ও মানবিক সাহায্য প্রদানের ব্যাপারে এরই মধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে পর্তুগাল। ইউক্রেনের নাগরিকদের স্বয়ংক্রিয় নিয়মিতকরণের মাধ্যমে তাদের আশ্রয় ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার ঘোষণা দিয়েছে পর্তুগালের শ্রম মন্ত্রণালয়। এজন্য তারা গড়ে তুলেছে একটি সরকারি প্ল্যাটফর্ম।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতেই পর্তুগাল ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়েছে। ইউক্রেন সরকারের অনুরোধে পর্তুগাল ইউক্রেনে সামরিক সাহায্য প্রদান করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ন্যাটো অঞ্চলের ইউক্রেন সীমান্তে ১৭৪ জন সেনা মোতায়েনের ব্যাপারে সম্মত হয়েছে পর্তুগাল। এরই মধ্যে ইউক্রেন সরকারকে আর্থিক সাহায্যের অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তহবিলে ১০ মিলিয়ন ইউরো সাহায্য প্রদান করেছে পর্তুগাল। অন্যদিকে রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবে পর্তুগাল তাদের আকাশসীমায় রাশিয়ান বিমান চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। সম্প্রতি রাশিয়ার একটি যাত্রীবাহী বিমান পর্তুগালের দ্বীপ শহর মাদেইরাতে অবতরণ করলেও বিমানটির যাত্রী নামতে দেওয়া হয়নি। ফলে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর বিমানটি আবার পর্তুগালের ভূমি ছেড়ে উড়াল দিতে বাধ্য হয়।

পশ্চিম ইউরোপের ন্যাটো অধিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পর্তুগাল অন্যতম। দেশটি ব্রিটেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, ইতালি, লুপেমবার্গসহ অধিকাংশ পশ্চিমা দেশের সঙ্গে মিলিত হয়ে ইউক্রেনকে সমর্থন জানাচ্ছে। তারা একত্রিত হয়ে ইউক্রেনকে সামরিক ও আর্থিক সাহায্য প্রদানের ব্যাপারে সম্মত ও অঙ্গীকারবদ্ধ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের এই পর্যায়ে ন্যাটো অধিভুক্ত উপর্যুক্ত দেশগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্নেষকগোষ্ঠী মনে করেন। ন্যাটো অধিভুক্ত দেশগুলোর মাঝে নিজেদের গুরুত্ব ও ভূমিকা-পরবর্তী পর্যায়ে নিয়ে যেতে এখনই উপযুক্ত সময় বলে মনে করছে পর্তুগাল। সে জন্য ইউক্রেনে চলমান মানবিক সংকটের সময়ে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে পর্তুগালের ভূমিকা দৃশ্যমান হচ্ছে।

যুদ্ধকালীন সময়ে ইউক্রেনীয়দের পাশে দাঁড়িয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) পশ্চিমা দেশগুলো। পর্তুগাল এদের মধ্যে অন্যতম অগ্রগামী ভূমিকা গ্রহণ করেছে। পর্তুগাল মনে করে, ইউক্রেনীয়রা এখন বিপদগ্রস্ত ও আশ্রয়প্রার্থী। অভিবাসীবান্ধব দেশ হিসেবে তাই তারা ইউক্রেনীয়দের পাশে দাঁড়াতে চায়। তারা মনে করে, ইউক্রেনীয়দের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে মানবিকতা প্রদর্শন করতে এটিই শ্রেষ্ঠ সময়। পর্তুগালের শ্রমবিষয়ক অধিদপ্তর 'ইনস্টিটুটো ডু ইমপ্রেগো ই ফরমাসাও প্রফিসিওনালে (আইইএফপি)' ইউক্রেনের শরণার্থী প্রবেশ ও কর্মসংস্থানের বিষয়ে কাজ করছে। ইতোমধ্যে তাদের ওখানে দুই হাজারেরও বেশি শূন্যপদ রয়েছে। পর্তুগিজ সরকারের ঘোষণা মতে এই পদগুলো শুধু ইউক্রেনীয়দের জন্য সংরক্ষিত। 

ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের পর্তুগালের প্রবেশে সহজ করার জন্য এরই মধ্যে বিশেষায়িত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ইউক্রেনের কোনো শরণার্থী পর্তুগালের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয় এটা প্রমাণের সাপেক্ষে তাদের বিশেষ আইডি কার্ড প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই আইডি কার্ড ব্যবহার করে তারা পর্তুগালের সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবে। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি পর্তুগালের ইমিগ্রেশন অধিদপ্তর 'এসইএফ' তদারক করবে। 

অভিবাসীবান্ধব দেশ হিসেবে সাধারণত পর্তুগালে বিদেশি নাগরিকদের কাজ করতে বাধা দেওয়া হয় না। ইউক্রেনীয়দের জন্যও একই ধারা প্রযোজ্য। কিন্তু এই মুহূর্তে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনে মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। এ জন্য ইউক্রেনের নাগরিকদের জন্য পর্তুগাল আরও উদার হয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। পর্তুগাল সরকার এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে ইউক্রেনীয় নাগরিকরা যে কোনো মূল্যে পর্তুগালে প্রবেশ করলে সেই মুহূর্ত থেকে তাদের পর্তুগালে নিয়মিত হওয়ার নিশ্চয়তা পাবেন। যার অংশ হিসেবে শুরুতেই তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্যাপ ও সামাজিক নিরাপত্তা শনাক্তকারী (সোশ্যাল) নম্বর পাবেন। 

পর্তুগালের শ্রমবিষয়ক অধিদপ্তর 'আইইএফপি' সে লক্ষ্যে কাজ করার জন্য এরই মধ্যে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। এই টাস্কফোর্স শুরুতেই ইউক্রেনীয় নাগরিকদের পর্তুগালে কর্মসংস্থান নিশ্চিতের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করেছে। বিভিন্ন পর্তুগিজ কোম্পানি এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শরণার্থী ইউক্রেনীয়দের কাজের জন্য আহ্বান জানিয়েছে। এই প্ল্যাটফর্ম খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের জন্য দুই হাজারেরও বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করেছে।

পর্তুগাল সরকার ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের বসবাসের জন্য এরই মধ্যে দেড় হাজার বেশি আবাসের ব্যবস্থা করেছে এবং দ্রুততর সময়ের মধ্যে এই আবাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করার ঘোষণা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্তনিয় কস্তার নেতৃত্বাধীন পর্তুগিজ সরকার। ফলে ইউক্রেনীয় শরণার্থীরা পর্তুগালে প্রবেশ করে শুরুতেই আশ্রয় সংকটে পড়বেন না। তাছাড়া সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি পর্তুগিজ সাধারণ নাগরিকরাও ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। এই কাজে পর্তুগালে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটিও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছে।

উল্লেখ্য, ইউক্রেনের রেসিডেন্ট কার্ডধারী বাংলাদেশি নাগরিকরাও পর্তুগিজ সরকারের ইউক্রেনীয় শরণার্থী সংশ্নিষ্ট এই উদ্যোগের সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। তারা যদি যে কোনোভাবে পর্তুগালে প্রবেশ করা সাপেক্ষে ইউক্রেনের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেন, তবে অন্যান্য ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের মতো পর্তুগালের ট্যাপ ও সামাজিক নিরাপত্তা শনাক্তকারী নম্বর পাবেন এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে পর্তুগালে বসবাস ও কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ করবেন। 

পর্তুগিজ সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের বাইরেও দেশটির নাগরিকরা সম্মিলিতভাবে ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়েছে। ইউক্রেনের চলমান রাশিয়ান আগ্রাসনবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে পর্তুগিজ দেশে ও দেশের বাইরে নাগরিকরা নানাবিধ মিছিল ও সমাবেশ করছেন। তারা আর্থিক ও মানবিক সাহায্য প্রদানের জন্য সাংগঠনিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। যাতে পর্তুগালে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকরাও অংশ নিয়েছেন। 

ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধকালীন ও মানবিক সংকটের সময়ে পর্তুগিজ সরকার ও দেশটির নাগরিকরা ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে যে মানবিকতা প্রদর্শন করেছেন তা বিশ্বে পর্তুগালের ভাবমূর্তি উন্নত করেছে। আমরা আশা করি, অচিরেই এই মানবিক সংকট থেকে পৃথিবী মুক্তি লাভ করবে এবং শান্তিকামী দেশ হিসেবে পর্তুগাল বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রগামী ভূমিকা পালনের মাধ্যমে মানবসভ্যতার ইতিহাসে জাতি হিসেবে নিজেদের নাম সুপ্রতিষ্ঠিত করবে।