লাকী আখান্দ কত বড় মাপের শিল্পী ও সংগীত স্রষ্টা- তা নিয়ে কথা শুরু করলে শেষ করা যাবে না। শ্রোতারা তার কাছে পেয়েছেন বেশ কিছু কালজয়ী গান। যুগের পর যুগ সে গানগুলো সংগীতপ্রেমীদের মনে অনুরণন তুলে যাবে। সংগীতে তার নিজস্ব একটা ছাপ ছিল, যা অন্য কারও সঙ্গে মেলানো যায় না। তার প্রতিটি সৃষ্টি নিয়েই আলাদাভাবে আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু সেই আলোচনার পরিধিও হয়ে যাবে মহাকাব্যের মতো। একইভাবে সংগীত ভুবনের বাইরে থেকে যে লাকীকে আমি দেখেছি, যে আমার বাল্যবন্ধু- সেই লাকীকে নিয়েও বলা যায় অনেক কথা।

কিন্তু আজ আমি সেই লাকীর কথাই বলতে চাই, যে নিজেই ছিল প্রথম সারির শ্রোতা, গানই ছিল যার প্রাণের স্পন্দন। অনেক ঘটনাই বলা যায়, তবে যেটা আমার মনকে বেশি নাড়া দিয়েছিল এবং যে দিনটির কথা কখনও ভুলতে পারি না, সেই দিনের কথাই বলি। লাকীর অসুস্থতার কথা আগেই কানে এসেছিল। কিন্তু যেদিন শুনলাম ও হাসাপাতালে ভর্তি, শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে খারাপ, সেদিন আর বসে থাকতে পারিনি। সব ব্যস্ততা ঝেড়ে ফেলে ওকে দেখতে ছুটে গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্যান্সারে আক্রান্ত লাকীকে দেখে বুকে একটা ধাক্কা লেগেছিল। অথচ আমাকে দেখার পর সেই লাকীর মুখে ফুটে উঠেছিল এক চিলতে হাসি। জানতে চেয়েছিল কেমন আছি? যে মানুষটা অমানুষিক কষ্টের মধ্যে প্রতিটি ক্ষণ পাড়ি দিচ্ছে, তার এ প্রশ্নের উত্তরে ভালো আছি বলা কঠিন? তাই নীরব থেকেই উত্তরটা জানিয়ে দিয়েছিলাম।

হাসপাতালে লাকীকে দেখে সেদিন বুঝতে অসুবিধা হয়নি, কী অসহনীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে কাটছে একেকটি মুহূর্ত। অথচ সেই লাকী আমাকে দেখে শারীরিক যন্ত্রণা তুচ্ছ করে মেতে উঠেছিল হাসি-গান-আড্ডায়। এ লাকী বলেই সম্ভব। ওকে যারা খুব কাছে থেকে দেখেছে, তারা জানেন, লাকী কতটা সংগীত অন্তপ্রাণ মানুষ। বাল্যবন্ধু বলেই ওর ভালো লাগা, মন্দা লাগা, সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা থেকে শুরু করে সংগীত ভুবনের পথ পরিক্রমার অনেক কিছুর সাক্ষী হতে পেরেছি। বুঝেছি, সংগীত ওর রক্তে মিশে গেছে। গানই ওর প্রাণ।

তারপরও হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে লাকী আমার কাছে গান শোনার আবদার করবে- এ ছিল আমার কাছে অকল্পনীয়। তবে বিস্মিত হইনি, কারণ লাকী এমনই। তাই লাকীর অনুরোধে সেদিন গেয়েছিলাম ওর অনবদ্য সৃষ্টি 'আগে যদি জানতাম' গানটি। আমাকে অবাক করে দিয়ে লাকী নিজেও গাওয়া শুরু করেছিল, 'আগে যদি জানতাম, তবে মন ফিরে চাইতাম, এই জ্বালা আর প্রাণে সহে না...।' ওর গাওয়া দেখে আমার কণ্ঠ কেঁপে উঠেছিল। বুক ভেঙে গিয়েছিল, একরাশ কষ্টে। তাই লাকীকে সেদিন বলেছিলাম, 'আমি ভাগ্যবান তোমার মতো সংগীতপ্রাণ বন্ধু পেয়ে। তুমি পাশে না থাকলে আমি ফেরদৌস ওয়াহিদ হয়ে উঠতাম না।' এটা লাকীকে খুশি করার জন্য বলা নয়, এটা আমার শিল্পীজীবনের এক জ্বলন্ত সত্য।